নতুন বাড়ি। নতুন স্বপ্ন। চলচ্চিত্রে তখনও বড় সাফল্যের অপেক্ষায় তরুণ অভিনেত্রী রানি পদ্মিনী। মায়ের সঙ্গে কয়েক মাস আগে ভাড়া নিয়েছিলেন আন্না নগরের একটি বাংলো। বাড়িটি এতটাই পছন্দ হয়েছিল যে সেটি কিনে নেওয়ার প্রস্তুতিও চলছিল। কিন্তু সেই বাড়িতেই ঘটে যায় ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড। মাত্র ২২ বছর বয়সী মালায়ালাম অভিনেত্রী রানি পদ্মিনী ও তার ৪৬ বছর বয়সী মা ইন্দিরাকুমারিকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। চার দিন পর বাড়ির বাথরুম থেকে উদ্ধার করা হয় তাদের মরদেহ।
সবচেয়ে চমকে দেওয়ার মতো বিষয় ছিল, হত্যাকারীরা বাইরে থেকে আসেনি। পরিবারের কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদেরই সন্দেহের কেন্দ্রে আনা হয়। আর সেই কারণেই ঘটনাটি আজও দক্ষিণ ভারতের চলচ্চিত্রজগতের আলোচিত হত্যাকাণ্ডগুলোর একটি।
চার দিন পর মেলে মরদেহ
১৯৮৬ সালের ১৯ অক্টোবর বিকেলে রানি পদ্মিনীর বাংলোয় যান এক রিয়েল এস্টেট এজেন্ট ও তার এক বন্ধু। পদ্মিনী ও তার মা বাড়িটি কেনার বিষয়ে আলোচনা করছিলেন। কিন্তু সেদিন বাড়ির দরজায় গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি।
সামনের দরজা ভেতর থেকে আটকানো ছিল। বাড়ির পেছনে গিয়ে একটি দরজা খোলা দেখতে পান তারা। রান্নাঘর দিয়ে ভেতরে ঢুকে দেখতে পান, শোবার ঘর তছনছ। দামি শাড়ি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে, স্টিলের আলমারিও তল্লাশি করা হয়েছে।
সন্দেহ হওয়ায় তারা পুলিশে খবর দেন। পুলিশ এসে পাশের একটি বাথরুমে মা-মেয়ের মরদেহ দেখতে পায়। মরদেহে তখন পচন ধরেছিল। তদন্তকারীদের ধারণা, প্রায় চার দিন আগেই তাদের হত্যা করা হয়েছিল।
বাড়ির সামনে ১৬ অক্টোবর থেকে পরের কয়েক দিনের সংবাদপত্র জমে ছিল। ১৫ অক্টোবরের সংবাদপত্র পাওয়া যায় শোবার ঘরের ভেতর। এসব দেখে তদন্তকারীরা ধারণা করেন, ১৫ অক্টোবরের পরই বাড়িতে স্বাভাবিক জীবন থেমে যায়।
অভিনেত্রীর গাড়িও উধাও
রানি পদ্মিনীর আমদানি করা নিসান গাড়িটিও বাড়িতে ছিল না। সঙ্গে নিখোঁজ ছিলেন তার গাড়িচালক জি জেবারাজ। পুলিশের সন্দেহের তালিকায় দ্রুত উঠে আসে তার নাম। ৪ অক্টোবর একটি তামিল সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দেখে জেবারাজ পদ্মিনীদের পরিবারের কাজে যোগ দিয়েছিলেন। হত্যাকাণ্ডের মাত্র ১১ দিন আগে তিনি চাকরিতে ঢুকেছিলেন।
তদন্তে জানা যায়, পদ্মিনী ও তার মাকে নিয়মিত শপিং সেন্টার ও জুয়েলারির দোকানে নিয়ে যেতেন তিনি। ফলে পরিবারের চলাফেরা ও দৈনন্দিন রুটিন তার জানা ছিল।
পুলিশের রেকর্ড অনুযায়ী, গাড়ি চুরির সঙ্গে জেবারাজের আগেরও সংশ্লিষ্টতা ছিল। ৩০টির বেশি ঘটনায় তার নাম উঠে এসেছিল বলে তদন্তে জানা যায়। এক বছরের সাজা ভোগ করে কারাগার থেকে বের হওয়ার এক মাস পর তিনি পদ্মিনীদের বাড়িতে কাজে যোগ দিয়েছিলেন।
হত্যাকাণ্ডের সময় পরিবারের আরও দুই কর্মী—প্রহরী লক্ষ্মী নরসিমহন ওরফে কুট্টি এবং রাঁধুনী গণেশন; তারা নিখোঁজ ছিলেন। তারা দুজনই হত্যার মাত্র দুই দিন আগে কাজে যোগ দিয়েছিলেন।
একটি চড়, ৫ লাখ রুপি ও হত্যার অভিযোগ
পরে রাষ্ট্রপক্ষের মামলায় বলা হয়, ইন্দিরাকুমারি একবার জেবারাজকে চড় মেরে কাজে আর না আসতে বলেছিলেন। এতে তার মনে ক্ষোভ তৈরি হয়। এ ছাড়া পদ্মিনী ও তার মা হত্যার দিন ব্যাংক থেকে টাকা তুলেছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ অনুযায়ী, বাড়িতে প্রায় ৫ লাখ রুপি নগদ, গয়না ও অন্যান্য মূল্যবান জিনিস ছিল।
পুলিশের অভিযোগ ছিল, এসব অর্থ ও মূল্যবান জিনিস লুটের পরিকল্পনা করেন জেবারাজ। পরে দুই নারীকে হত্যা করা হয়, যাতে তারা কাউকে শনাক্ত করতে না পারেন। এই পরিকল্পনায় লক্ষ্মী নরসিমহন ও গণেশনও যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়।
১৫ অক্টোবর সকালে প্রথমে রান্নাঘরে ইন্দিরাকুমারির ওপর হামলা চালানো হয়। তার চিৎকার শুনে ছুটে আসেন পদ্মিনী। এরপর তাকেও ছুরিকাঘাত করা হয়।
পদ্মিনীর শরীরে ১২টি এবং তার মায়ের শরীরে ১৪টি ছুরিকাঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। হত্যার পর বাড়ি থেকে নগদ অর্থ ও মূল্যবান জিনিস নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। জেবারাজ পদ্মিনীর নিসান গাড়ি নিয়ে চলে যান।
হত্যার পরও কি বাড়িতে ফিরেছিলেন জেবারাজ?
তদন্তে এক নারীকে গ্রেফতার করার পর নতুন সূত্র পাওয়া যায়। ওই নারী পুলিশকে জানান, হত্যাকাণ্ডের পরদিন জেবারাজ তাকে পদ্মিনীর বাংলোয় নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে তারা প্রায় ছয় ঘণ্টা ছিলেন। পরে জেবারাজ তাকে নিসান গাড়িতে করে নিয়ে যান।
এই তথ্য সত্য হলে, মা-মেয়ের মরদেহ বাড়ির ভেতরে থাকা অবস্থাতেই জেবারাজ আবার সেখানে ফিরেছিলেন।
পরে জেবারাজকে গ্রেফতার করে পুলিশ। লক্ষ্মী নরসিমহন ও গণেশনকেও গ্রেফতার করা হয়।
কে ছিলেন রানি পদ্মিনী
আন্না নগরে জন্ম নেওয়া রানি পদ্মিনী ছিলেন চৌধুরী ও ইন্দিরাকুমারির একমাত্র সন্তান। ‘সংঘর্ষম’ সিনেমার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে তার অভিষেক। এরপর ‘পরাঙ্কিমালা’, ‘শারম’, ‘বন্ধম’ ও ‘কিলিকোঞ্চল’-এর মতো সিনেমায় অভিনয় করেন তিনি।
মূলত মালয়ালম সিনেমায় কাজ করলেও তামিল, তেলুগু, কন্নড় এবং কয়েকটি হিন্দি সিনেমাতেও অভিনয় করেছিলেন পদ্মিনী। পরিচিত মুখ হয়ে উঠলেও তখনও বড় তারকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। কিন্তু মাত্র ২২ বছর বয়সেই থেমে যায় তার জীবন।
তিনজনের মৃত্যুদণ্ড, পরে বদলে যায় রায়
১৯৮৯ সালের মার্চে জেলা দায়রা আদালত জেবারাজ, লক্ষ্মী নরসিমহন ও গণেশনকে হত্যা-সহ একাধিক অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে তিনজনকেই মৃত্যুদণ্ড দেন।
পরে মাদ্রাজ হাইকোর্ট লক্ষ্মী নরসিমহন ও গণেশনকে খালাস দেন। জেবারাজের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
পরে সুপ্রিম কোর্ট লক্ষ্মী নরসিমহনের বিরুদ্ধে হত্যার দণ্ড পুনর্বহাল করে তাকেও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। আর হাইকোর্ট থেকে খালাস পাওয়ার পর গণেশন নিখোঁজ হয়ে যান।
তবে আদালতের বাইরেও এই হত্যাকাণ্ড ঘিরে নানা গুঞ্জন ছিল। তিন কর্মীকে ব্যবহার করে অন্য কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তিকে আড়াল করা হয়েছিল; এমন কথাও ছড়িয়েছিল। যদিও পুলিশি তদন্ত ও আদালতের কার্যক্রম মূলত তিন কর্মীকে ঘিরেই ছিল।





