ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ব্যঙ্গ করে পিবডি পুরস্কার জিতলেন জিমি কিমেল!

রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা আর বিতর্কের জন্ম দিয়ে মার্কিন জনপ্রিয় টক-শো হোস্ট জিমি কিমেল জয় করে নিলেন সম্মানজনক পিবডি পুরস্কার। তবে পুরস্কারের মঞ্চে উঠেও নিজের চেনা রূপ বদলাননি কিমেল; ডোনাল্ড ট্রাম্পকে একের পর এক ব্যঙ্গাত্মক নামে ধুয়ে দিয়ে পুরো অনুষ্ঠান মাতিয়ে রাখলেন এই কমেডিয়ান।

গত ৩১ মে, ২০২৬ (রবিবার রাতে) যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার ঐতিহ্যবাহী বেভারলি উইলসায়ার হোটেলে জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে ৮৬তম পিবডি অ্যাওয়ার্ডসের মূল অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে “জিমি কিমেল লাইভ!” অনুষ্ঠানের জন্য সশরীরে উপস্থিত হয়ে এই ট্রফি গ্রহণ করেন তিনি। জুরি বোর্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়, রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝেও কৌতুকের মাধ্যমে সত্যকে তুলে ধরার যে সাহস ও দায়িত্ব কিমেল দেখিয়েছেন, তারই সম্মানার্থে এই পুরস্কার।

ট্রাম্পকে দেওয়া কিমেলের সেই অদ্ভুত নামগুলো!
পুরস্কারের ট্রফি হাতে নিয়ে কিমেল মঞ্চে তাঁর স্বভাবসুলভ কৌতুক দিয়ে শুরু করেন। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে তাঁর করা অতীতেরই কিছু তীব্র ব্যঙ্গাত্মক নাম মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন:

"আমি আমাদের প্রেসিডেন্টকে ‘ফ্যাটিশ্যাক’, ‘অরেঞ্জ জুলিয়াস সিজার’, ‘কমান্ডার-ইন-থিফ’ (চোরদের প্রধান), ‘মার-এ-লার্ডো’, ‘হাংরি হাংরি হিপোক্রিট’ (মহাপাতক ভণ্ড) এবং ‘নস্ট্রা-ডাম্বাস’ (ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বোকা) বলে ডেকেছিলাম। আর তাতেই কীভাবে যেন আমরা একটা পিবডি পুরস্কার পেয়ে গেলাম!"

তিনি রসিকতা করে আরও বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এই ‘অপূর্ব’ নামগুলো দেওয়ার সুযোগের জন্যই মূলত তিনি আজ এই মঞ্চে দাঁড়াতে পেরেছেন!


বাক-স্বাধীনতা বনাম সরকারের হুমকি

কৌতুকের পাশাপাশি কিমেলের কণ্ঠে ফুটে ওঠে মার্কিন সংবিধান ও বাক-স্বাধীনতার লড়াইয়ের চিত্র। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে সরকারের ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশনের হুমকির মুখে পড়ার পর এবিসি চ্যানেল কর্তৃপক্ষ কিমেলকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছিল।

সেই কঠিন দিনগুলোর কথা স্মরণ করে কিমেল বলেন, "আমেরিকায় বসে দেশের প্রেসিডেন্টের সমালোচনা বা ব্যঙ্গ করার অধিকার সংবিধানে নিশ্চিত করা হয়েছে। এটি এমন একটি অধিকার যা আমি আমার জীবনের প্রথম ৫৭ বছর খুব স্বাভাবিক বলেই ধরে নিয়েছিলাম—যতক্ষণ না গত সেপ্টেম্বরে সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের একটি অপ্রীতিকর চমক উপহার দেওয়া হয়।"

তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন সেই লাখ লাখ সাধারণ মানুষের প্রতি, যারা তাঁর ওপর এই সেন্সরশিপের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছিলেন এবং বিনোদন প্ল্যাটফর্মের গ্রাহক সেবা বাতিল করে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।

"ক্ষমতার মুখে সত্য বলার আসল কারিগর"
হলিউড তারকা বেন অ্যাফ্লেক মঞ্চে এসে কিমেলের হাতে এই সম্মাননা ট্রফি তুলে দেন। কিমেলের সাহসিকতার প্রশংসা করে অ্যাফ্লেক বলেন, "জিমি আমাদের দেখিয়েছেন ক্ষমতার মুখে সরাসরি সত্য বলার আসল অর্থ কী। বছরের পর বছর ধরে তিনি রাতের পর রাত কর্তাব্যক্তিদের এবং স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাবকে চ্যালেঞ্জ করতে তাঁর অনুষ্ঠান ব্যবহার করেছেন।"

বোকা বনে যাওয়ার অনুভূতি!
পিবডি পুরস্কার সাধারণত দেওয়া হয় গভীর জীবনমুখী প্রামাণ্যচিত্র, যুদ্ধক্ষেত্রের সংবাদ এবং সামাজিক অবিচারের গল্প ফুটিয়ে তোলার জন্য। এবারও গাজা যুদ্ধ বা কারাগারের নির্যাতন নিয়ে তৈরি কাজের পাশে নিজের কৌতুক অনুষ্ঠানের পুরস্কার পাওয়া নিয়ে কিমেল রসিকতা করতে ছাড়েননি। তিনি বলেন, "অভিবাসন কর্তৃপক্ষের ভয়াবহতা কিংবা পুতিনের মুখোমুখি হওয়া এক শিক্ষকের গল্প নিয়ে তৈরি করা সব অসাধারণ সংবাদচিত্রের পাশে পুরস্কৃত হয়ে আমি নিজেকে ইতিহাসের সবচেয়ে বোকা মনে করছি!"

তবে ৩১ মে-এর সেই রাতে উপস্থিত দর্শকদের করতালিতে মুখরিত হলরুম এটাই প্রমাণ করল—কঠিন রাজনৈতিক বাস্তবতায় সমাজকে হাসানোর পাশাপাশি ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কৌতুকও হতে পারে একটি অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার।

ট্রাম্প ও মেলেনিয়া
ফলো-আপ: সম্প্রতি কেন ক্ষেপেছিলেন ট্রাম্প ও মেলানিয়া?

এই পিবডি পুরস্কার পাওয়ার মাত্র এক মাস আগেই, অর্থাৎ ২০২৬ সালের এপ্রিলের শেষে, ট্রাম্প দম্পতির সাথে জিমি কিমেলের এক নতুন তুমুল সংঘাত তৈরি হয়।

হোয়াইট হাউসের এক নৈশভোজের আগে জিমি কিমেল তাঁর অনুষ্ঠানে ট্রাম্প ও মেলানিয়ার বয়সের ব্যবধান নিয়ে একটি কৌতুক করেন। সেখানে মেলানিয়া ট্রাম্পের চমৎকার রূপের প্রশংসা করতে গিয়ে কিমেল রসিকতা করে বলেন, "মিসেস ট্রাম্প, আপনাকে দেখতে একজন 'আসন্ন বিধবার' (expectant widow) মতো উজ্জ্বল লাগছে।"

কিমেলের এই 'বিধবা' মন্তব্যটিকে একেবারেই ভালোভাবে নেননি ট্রাম্প পরিবার। মেলানিয়া ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখেন, "কিমেলের কথাগুলো অত্যন্ত ক্ষতিকর এবং এগুলো আমেরিকার রাজনৈতিক অসুস্থতাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। কিমেলের মতো মানুষের প্রতিদিন আমাদের ড্রয়িংরুমে এসে ঘৃণা ছড়ানোর কোনো অধিকার নেই।"

এরপরই ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজে ময়দানে নামেন। তিনি কিমেলের এই কৌতুককে "সহিংসতার উসকানি" বলে আখ্যা দেন এবং এবিসি ও ডিজনির কাছে দাবি জানান যেন কিমেলকে চাকরি থেকে অবিলম্বে বরখাস্ত করা হয়। এমনকি ট্রাম্পের অনুগত সরকারি সংস্থাগুলো এবিসি চ্যানেলের লাইসেন্স আগেভাগে পুনর্মূল্যায়ন করার হুমকি পর্যন্ত দেয়।

তবে কিমেল এই চাপের মুখেও নতি স্বীকার করেননি। তিনি পাল্টা জবাবে বলেন, এটি ছিল কেবলই ৭৯ বছর বয়সী ট্রাম্প এবং তাঁর চেয়ে অনেক কম বয়সী স্ত্রীর মধ্যকার বয়সের ব্যবধান নিয়ে একটি সাধারণ কৌতুক, কোনো সহিংসতার ডাক নয়।

সূত্র: ভ্যারাইটি