নিজামীর ফাঁসির ‘টাইমিং’ ও ভারতের ভূমিকা

নিজামী বাংলাদেশে জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসির সাজা কার্যকর করার সঙ্গে প্রতিবেশী ভারতের কোনও ‘গোপন সম্পর্ক’ আছে কি না, তা নিয়ে নানা অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলছে জামায়াত। মূলত যুক্তরাজ্য থেকে জামায়াতের নেতাকর্মীরা এ নিয়ে কিছু কিছু ‘প্রোপাগান্ডা’ চালাচ্ছেন, যা ভারতকে কিছুটা হলেও বিব্রত করছে। দিল্লিতে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তার জামায়াতের এই সব অপপ্রচারের দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখছেন।
নিজামীর ফাঁসিতে ভারতের যেসব ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে জামায়াত
প্রথমত, ৫ মে নিজামীর রিভিউ পিটিশন বাতিল করেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, ঠিক তার আগের দিন বিকেলে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রীংলা সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন।
জামায়াতের পক্ষ থেকে সোশ্যাল মিডিয়াতে, বিশেষ করে ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ ওই রায়ের আগে জরুরি কোন শলাপরামর্শ করতে রাষ্ট্রদূত শ্রীংলা বিচারপতি সিনহার কাছে ছুটে গিয়েছিলেন? তিনি তো ঢাকায় দায়িত্ব নিয়েছেন বেশ কিছুদিন হলো, সে দিনই কী এমন দরকার পড়ল যে তখনই তাকে সুপ্রিম কোর্টে যেতে হলো? না কি, এই রায় নিয়ে ভারত ঠিক কী চায় সেটা বিচারপতিদের কাছে স্পষ্ট করা দরকার ছিল?
আরও পড়ুন: নিজামীর ফাঁসিতে পাকিস্তানের কান্না
দ্বিতীয়ত, নিজামীর ফাঁসির মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ঢাকায় পদার্পণ করলেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব এস জয়শঙ্কর। যদিও এই সফরের দিনক্ষণ বেশ কিছুদিন আগেই চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল– তার পরও জামায়াত বলছে, এই সফরের ঠিক আগেই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করাটা বেশ সন্দেহজনক। ফাঁসির ‘টাইমিং’ দেখে মনে করার কারণ আছে, ভারতের স্বরাষ্ট্রসচিবের সফরের ঠিক আগে তাদের সন্তুষ্ট করার চেষ্টা হয়েছে। জামায়াত নেতারা সোশ্যাল মিডিয়াতে এমন নানা মন্তব্যও করেছেন।

এখানে আরও একটা তুলনা টানা হচ্ছে– আর সেটা আর এক জামায়াত নেতা আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসির সঙ্গে। কাকতালীয় হতে পারে, কিন্তু ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে যখন কাদের মোল্লাকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়, ঠিক তার এক সপ্তাহ আগেও ঢাকায় এক সফরে এসেছিলেন তদানীন্তন ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং।

সুজাতা সিংয়ের সেই ‘বিতর্কিত’ সফরে মূলত চেষ্টা করা হয়েছিল- তখন থেকে এক মাস পরের সাধারণ নির্বাচনে যাতে দেশের সব দল অংশ নেয়, সেটা নিশ্চিত করার। সফরের এই উদ্দেশ্যটা নিয়ে তখন বহু তর্কবিতর্ক হয়েছিল – কিন্তু জামায়াতের সন্দেহ আবদুল কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড যাতে মসৃণভাবে কার্যকর করা যায় সুজাতা সিং সে ব্যাপারেও বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কথা বলতে এসেছিলেন।

এতদিন পর নিজামীর ফাঁসির পটভূমিতে জামায়াত সেই প্রসঙ্গকেও টেনে আনছে এবং দাবি করছে যুদ্ধাপরাধের মিথ্যা অভিযোগে তাদের একের পর এক শীর্ষ নেতাকে ফাঁসিতে ঝোলানোটা ভারতেরই নীল নকশার অংশ। আর কে না জানে, যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল নিয়ে একমাত্র ভারতই দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বাংলাদেশকে আগাগোড়া সমর্থন করে আসছে। ব্রিটেন-ইউরোপ-আমেরিকাতে বহু জামায়াত সমর্থক বা নেতাকর্মী সোশ্যাল মিডিয়াতে এই জাতীয় পোস্ট করছেন, অনেকে তা শেয়ারও করছেন।

জামাতের এই সব কৌশলী প্রোপাগান্ডা যথারীতি ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোরও নজরে এসেছে।
দিল্লিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেন, ‘দেখুন, জামায়াত কী বলল সেটা শুনতে গেলে আমাদের চলবে না। আমরা তো অস্বীকার করছি না আমাদের রাষ্ট্রদূত বিচারপতি সিনহার সঙ্গে দেখা করেছেন কিংবা আমাদের পররাষ্ট্র সচিব অমুক তারিখে ঢাকায় যাচ্ছেন। বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক যেমন চলছিল তেমনই চলবে। তবে হ্যাঁ, এই ঘটনাগুলো ফাঁসির আগেপরে না হলেই হয়তো ভালো হতো। কিন্তু সে কী আর করা যাবে?’

ফলে জামায়াতের প্রচারণা কিছুটা হলেও যে ভারতকে ব্যাকফুটে ঠেলে দিয়েছে, এই মন্তব্য তারই প্রমাণ!

আরও পড়ুন: ‘উই আর নিজামী’

/এজে/