দলীয় সাংসদ ইমরানকে এবার বিধানসভা ভোটের প্রচারে তেমনভাবে সামনে আনেনি তৃণমূল। অথচ পেশায় ইমরান সাংবাদিক। আবার একটি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হিসেবেই তৃণমূল তাকে রাজ্যসভার টিকিট দিয়েছিল। যে সম্প্রদায়ের মানুষের অধিকাংশ তৃণমূলের ভোটব্যাংক হিসেবে স্বীকৃত।
এই ইমরান সাংসদ হওয়ার পর পরই ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক মহলে তোলপাড় শুরু হয়েছিল। বাংলাদেশে ভারতের দূতাবাস থেকে নয়াদিল্লিতে একটি বিশেষ বার্তা পৌঁছায় এবং তাতে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশের সন্ত্রাসীরা পশ্চিমবঙ্গের কোনও কোনও প্রভাবশালী ব্যক্তির কাছ থেকে আর্থিক ও অন্যান্য মদদ পাচ্ছে এবং এমন এক জনকে তৃণমূল এবার রাজ্যসভার সাংসদ করেছে। ইঙ্গিতটা কার দিকে, সেটা বুঝতে অনেকেরই অসুবিধা হয়নি। তৃণমূল সাংসদ ইমরানের নাম সারদা চিটফান্ড কেলেঙ্কারিতে জড়িয়েছিল। ওই মামলায় সিবিআই, ইডির মতো কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা তাকে ডেকে পাঠিয়ে জিজ্ঞাসাবাদও করে। বাংলাদেশের কোনও কোনও মহল থেকে তখন দাবিও করা হয়, বেআইনি আর্থিক সংস্থা সারদায় গচ্ছিত রাখা আমানতকারীদের টাকার একটা বড় অংশ এক সাংসদ মারফত বাংলাদেশের সন্ত্রাসীদের কাছে পৌঁছে।
আহমেদ হাসান ইমরান যে বছর সাংসদ হন, সেই ২০১৪ সালের ২ অক্টোবর পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার খাগড়াগড়ে বিস্ফোরণের সূত্রে ভারতে জামাতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)-এর ঘাঁটি ও কার্যকলাপের কথা বেরিয়ে পড়ে। পশ্চিমবঙ্গের এক প্রবীণ গোয়েন্দা-কর্মকর্তা সে সময় বলেছিলেন, ‘কোনও রাজনৈতিক দল সব কিছু জেনেশুনে প্রতিবেশী দেশে নাশকতা ঘটানোর লক্ষ্যে কাজ করা সন্ত্রাসীদের সাহায্য করছে, এটা বলা যাবে না। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে এমন দু’-এক জনশাসক দলের সাংসদ হয়ে গেলেন, যাদের দেখে সন্ত্রাসীরা অবশ্যই উৎসাহ পাচ্ছে।’
পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলগুলিও সেই সময়ে তৃণমূল সাংসদ ইমরানের বিরুদ্ধে সরব হয়েছিল। কিন্তু সম্প্রতি ইমরানকে তৃণমূলও ব্যাকফুটে ঠেলে দিয়েছে বলে দলের একটি সূত্রের খবর।
রাজ্য স্বরাষ্ট্র দফতরের এক কর্মকর্তার কথায়, ‘শাসক দলের শীর্ষ নেতৃত্ব ও সরকারের একেবারে উঁচুতলায় এই বার্তা পৌঁছে দেওয়া গেছে যে, কোনও অবস্থাতেই যাতে সন্ত্রাসীরা উৎসাহ না পায়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। এমন কোনও পদক্ষেপও নেওয়া চলবে না, যাতে জঙ্গিরা পরোক্ষভাবে উৎসাহিত হয়।’
ওই কর্মকর্তা জানান, নরেন্দ্র মোদির সরকার বিশেষ করে খাগড়াগড় বিস্ফোরণের কিছু দিন পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারকে এটা বোঝাতে পেরেছে যে, প্রতিবেশী বাংলাদেশে নাশকতা ঘটানোর জন্য পশ্চিমবঙ্গের মাটিকে সন্ত্রাসীরা ব্যবহার করার (খাগড়াগড় নিয়ে এনআইএর তদন্তে যা বেরিয়ে এসেছে) তথ্য শুধু একটি রাজ্য নয়, গোটা দেশের ভাবমূর্তির পক্ষেই ক্ষতিকর।’
আরও পড়ুন: ব্রিটেনে প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নারী মেয়র হলেন নাদিয়া শাহ
গোটা দুনিয়া যেখানে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে, জঙ্গিদের উৎখাত করার ডাক দিয়েছে, সেখানে পশ্চিমবঙ্গ বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো থাকতে পারে না। বিশেষ করে, যখন জঙ্গি সংগঠনগুলির মধ্যে বর্তমানে সব চেয়ে বিপজ্জনক ইসলামিক স্টেট (আইএস)-এর সঙ্গে জড়িত সন্দেহে এই রাজ্যের দুই যুবক, মেহেদি মসরুর বিশ্বাস ও আসিক আহমদেকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
আর ঠিক সাত দিন পর, পশ্চিমবঙ্গে যারাই ক্ষমতাই আসুক, সেই নতুন সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হবে সন্ত্রাসবাদীদের দমন করা। তৃণমূলের যেমন অবস্থান ইদানিং কিছুটা পাল্টেছে বলে মনে হচ্ছে, তেমনই বিরোধী দলগুলো গোড়া থেকেই খাগড়াগড় কাণ্ড নিয়ে শাসক দলকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছিল। তবে এনআইএর তদন্তে এটাও বেরিয়েছে, তৃণমূল ক্ষমতায় আসার বহু আগে, বামফ্রন্ট আমলে ২০০৫ সালে জেএমবির বীজ পশ্চিমবঙ্গে পোঁতা হয়েছিল। জেএমবি সেই সময়ে বাংলাদেশে প্রবল প্রতিরোধের মুখে পড়তে শুরু করে। আর নেতৃত্বের একাংশ গোপনে সীমান্ত পেরিয়ে এ পার বাংলায় ঢুকে জল মেপে বোঝেন, পরিস্থিতি অনুকূল। তার পর ক্রমশ জেএমবির বাড়বাড়ন্ত শুরু। অথচ ২০০৭ সালে এই জেএমবির অস্তিত্ব টের পাওয়া গেলেও তখন ধামাচাপা দেওয়া হয়েছিল। সিপিএম তথা বামফ্রন্ট নেতাদের একাংশ সেই ত্রুটি পরোক্ষভাবে স্বীকারও করে নিয়েছেন।
কাজেই, রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদল হোক বা না হোক, সন্ত্রাসীদের পক্ষে নতুন করে মাথা তুলে দাঁড়ানো কঠিন। আর এতে সব চেয়ে বেশি লাভ হবে প্রতিবেশী বাংলাদেশের।
/এজে/