সীমান্ত বন্ধের দিনক্ষণ ঘোষণা ভারতের, সংখ্যালঘুদের আশ্রয় দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু

নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পূরণের অংশ হিসেবে বিধানসভায় বিজয়ী হওয়ার পরপরই আসাম-বাংলাদেশ সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক খবরে বলা হয়েছে, আসছে বছর জুন মাসের মধ্যে সীমান্ত বন্ধের প্রক্রিয়া শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।  বিপরীতে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সংখ্যালঘুদের নাগরিকতা দিতে ভারতের নাগরিকতা আইন পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে চূড়ান্ত করা হয়েছে আইনের খসড়া সংশোধনী। সীমান্ত বন্ধের বিপরীতে নাগরিকতা দেওয়ার সিদ্ধান্তের এই বৈপরীত্যকে রাজনৈতিক বিবেচনা করছেন সমালোচকরা।

বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপি নেতৃত্বের প্রতিশ্রুতি ছিলো চোরাচালান ও অনুপ্রবেশ আটকাতে আসামে ভারত-বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সীমান্ত বন্ধ করা।  জানুয়ারিতে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং আসামের করিমগঞ্জ জেলার সীমান্ত পরিদর্শনে গিয়ে বলেছিলেন, চলতি বছরের মধ্যেই বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত বন্ধ করা হবে। আর বিধানসভা নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর আসামের মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সনোওয়াল মে মাসে পিটিআইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ভারত আগামী দুই বছরের মধ্যে বাংলাদেশের সঙ্গে থাকা আসাম রাজ্যের সীমান্ত বন্ধ করে দেবে। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং দুই বছরের মধ্যে সীমান্ত স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়ার সময় বেঁধে দিয়েছেন। আমরা ওই সময়ের মধ্যে সীমান্ত স্থায়ীভাবে বন্ধের কার্যক্রম সম্পন্ন করার চেষ্টা করব। নদী-সীমান্তও এর বাইরে থাকবে না।’ সেই ধারাবাহিকতায় এবার কাজ শেষ করার নির্দিষ্ট দিনক্ষণ বেধে দেওয়া হলো।

টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবরে বলা হয়েছে, গত বিধানসভা নির্বাচনে পদ্ম শিবিরকে (বিজেপির নির্বাচনী প্রতীক পদ্ম) নিরাশ করেনি আসামবাসী। সেই কারণে ক্ষমতায় ফিরতেই প্রতিশ্রুতি পালনের প্রথম ধাপ সেরে ফেলল ভারতীয় জনতা পার্টি।

উল্লেখ্য, ভারতের সাথে বাংলাদেশের মোট সীমানা ৪০৯৬ কিলোমিটার। এর মধ্যে আসামের সাথে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সীমানা রয়েছে প্রায় ২৮৪ কিলোমিটার। যার ২২৩.৭ কিলোমিটারে এইরমধ্যে কাটাতারের বেড়া দেওয়া আছে। বাকি রয়েছে ৬০.৭ কিলোমিটার সীমান্ত। টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবরে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, সেই সম্পূর্ণ অংশটি ২০১৭ সালের জুন মাসের মধ্যে পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হবে।  ওই ৬০.৭ কিলোমিটারের মধ্যে ১১. ৯ ভাগে বেড়া দেওয়া হবে। বাকী ৪৮.৮ শতাংশ অঞ্চল নদী সংলগ্ন হওয়ায় তাতে সরাসরি বেড়া দেওয়া সম্ভব নয়। ওই অঞ্চলগুলো লেজার ওয়ালের মতো প্রযুক্তির মাধ্যমে পরোক্ষভাবে বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।  এই বিষয়ে সেনা কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং।

টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, এক সরকারি বিবৃতি জারি করে সীমান্ত ‘সিল’ করে দেয়ার বিষয়ে যাবতীয় সিদ্ধান্ত নেয়া হয়ে গেছে। সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে বেশ কিছু সময় লাগবে। এক বছর সময়ের মধ্যে সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে।

এদিকে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সংখ্যালঘুদের নাগরিকতা দিতে ভারতের নাগরিকতা আইন পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরুর খবরও দিয়েছে টাইমস অব ইন্ডিয়া। তারা বলছে, এর পেছনে মানবিক বিবেচনার চেয়ে বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকারের রাজনৈতিক বিবেচনা বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবরে বলা হয়েছে, ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এরইমধ্যে নাগরিকতা আইনের খসড়া সংশোধনী তৈরী করা হয়েছে। খসড়া অনুযায়ী ধর্মীয় কারণে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে সংখ্যালঘুরা ভারতে গেলে তাদের ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ বিবেচনা করা হবে না। তাদের ভারতে থাকার নিশ্চয়তা বিধান করা হবে।

১৯৯৫ সালের নাগরিকতা আইনে পরিবর্তন আনার মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সংখ্যালঘুদের ভারতে আশ্রয়ের নিশ্চয়তা বিধান করা হচ্ছে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবরে বলা হয়েছে, ওই দুই দেশের সংখ্যালঘুদের বিপন্নতায় তাদের রক্ষাকারী হিসেবে নিজেদের পরিচিত করতেই মোদি সরকারের এই উদ্যোগ।  

টাইমস অব ইন্ডিয়া বলছে, ভারতের নাগরিকতা আইনের এই পরিবর্তনের কারণে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ২ লাখ হিন্দু উপকৃত হবেন। নিজ দেশে সংখ্যালঘু ও দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে বিবেচিত এইসব মানুষেরা মাঝে মাঝে ব্লাসফেমির স্বীকার হয়ে থাকেন উল্লেখ করে টাইমস অব ইন্ডিয়া বলছে, ওই দুই দেশের সংখ্যালঘুরা এখন থেকে চাইলে সেই ব্লাসফেমির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার সুযোগ তৈরী হবে।

noname

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত কোনও বাংলাদেশি মুসলমান যখন ভারতে ঢুকতে চায় তখন তাকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বলা হয়। সেখানে হিন্দুদের কিংবা সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রে এই আলাদা বিধান জারির সিদ্ধান্তকে অনেকেই হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডা বলে সমালোচনা করছেন। তারা বলছেন, সংঘ পরিবারের প্রেরণায় ভারতকে পৃথিবীর সব হিন্দুর দেশ হিসেবে বিবেচনা করার জায়গা থেকেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।


২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের ইশতেহারে সংখ্যালঘু হিন্দু শরণার্থীদের নাগরিকতা দেওয়ার অঙ্গীকার করে বিজেপি। ক্ষমতায় আসবার পর থেকেই শুরু করে এ সংক্রান্ত তৎপরতা। নাগরিকতা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি ভিসা দেওয়ারও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি ভিসাধারীদের জন্য ড্রাইভিং লাইসেন্স ও বিভিন্ন সুযোগসুবিধা দেওয়ার পরকল্পনাও নিয়েছে তারা।

নাগরিকতা আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনী অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর থেকে যে সংখ্যালঘুরা ভারতে গেছেন অবৈধ পথে, তারা নাগরিকতার আবেদন করতে পারবেন।

সংশোধিত ওই খসড়া খুব শিগগির মন্ত্রিসভার অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে।

সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া

/বিএ/