সিরিয়ার সীমান্তবর্তী এলাকায় আইএসের প্রধান সরবরাহ রুট বন্ধ করে দিয়েছে কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস (এসডিএফ)। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত এসডিএফ-এর যোদ্ধারা ওই এলাকাটি চারদিক থেকে ফেলেন। যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস জানিয়েছে, ‘শুক্রবার সকালে সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্স মানবিজ থেকে তুরস্ক সীমান্তগামী সর্বশেষ পথটি বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে।’
পর্যবেক্ষণকারী সংস্থার প্রধান রামি আব্দেল রহমান বলেন, আইএস এখনও তুরস্ক সীমান্তে সিরিয়ার একটি বড় এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে।
সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস হচ্ছে মূলত দেশটিতে মার্কিন সমর্থিত সশস্ত্র গ্রুপগুলোর একটি জোট। গ্রুপটির নেতৃত্বে রয়েছে কুর্দিশ পিপলস প্রটেকশন ইউনিট (ওয়াইপিজি)।
ওয়াশিংটনের দ্য ইন্সটিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার-এর সিরিয়া বিষয়ক বিশ্লেষক জেনিফার কাফারেলা। তিনি বলেন, আইএস বিরোধী গ্রুপগুলো যদি জঙ্গিদের কাছ থেকে প্রথমে মানবিজ ও পরে জারাব্লাজ শহরের নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হয় তাহলে তুরস্কের সঙ্গে তাদের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। মানবিজ পুনর্দখল এবং জারাব্লাজ শহরে অগ্রসর হতে পারলে আইএসের সরবরাহ রুট ক্ষতিগ্রস্ত হবে; তবে সেটা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে না।
মূলত সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ শুধু প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে উৎখাতে যুদ্ধরত বিদ্রোহী ও সেনাদের মধ্যে লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই। আইএসের মতো কুখ্যাত জঙ্গি সংগঠনের বিরুদ্ধেও লড়াই করছে সরকারবিরোধী একাধিক বিদ্রোহী গ্রুপ। টানা পাঁচ বছর ধরে চলা এ যুদ্ধের যেন শেষ নেই। এরই মধ্য ঝরে গেছে লাখো প্রাণ। রক্তপাত চলছেই।
২০১১ সালের ১৫ মার্চ সিরিয়ায় শুরু হয়েছিল সরকারবিরোধী আন্দোলন। প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের পদত্যাগের দাবিতে শুরু হওয়া এ আন্দোলন এক পর্যায়ে রূপ নেয় গৃহযুদ্ধের। তবে এই গৃহযুদ্ধে সেখানকার মানুষের দুঃখ-দুর্দশা এখন চাপা পড়ে গেছে আইএসের বর্বর নারকীয় কর্মকাণ্ডের নিচে।
পাঁচ বছর ধরে চলা এ গৃহযুদ্ধে এখন দেশটির নানা অংশ আইএসের দখলে। প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ এখনও ক্ষমতা আঁকড়ে আছেন আর বিপ্লবী স্বপ্ন অনেকটাই ঝাপসা।
বর্বর সব কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে আইএস পুরো বিশ্বের নজর কাড়তে সমর্থ হয়েছে। এরই মধ্যে গোষ্ঠীটি দুই লক্ষাধিক মানুষকে হত্যা করেছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। তারা অপহৃত ব্যক্তিদের শিরশ্ছেদের ভিডিও প্রচার করেছে। আরও যেসব বর্বরোচিত কাণ্ড ঘটিয়েছে, এর মধ্যে রয়েছে ‘অবিশ্বাসী’ ও ‘চর’ আখ্যা দিয়ে হত্যা করে লাশ ঝুলিয়ে রাখা, সমকামীদের ছাদ থেকে ফেলে হত্যা, লোকজনকে জিম্মি করে খাঁচায় ভরে নিয়ে যাওয়া, নারীদের দাসে পরিণত করা, জর্ডানের এক পাইলটকে পুড়িয়ে হত্য, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, প্রাচীন ঐতিহাসিক শিল্পকর্ম ধ্বংস ইত্যাদি।
প্যারিসভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক রিলেশনস এর গবেষক করিম বিতার। তিনি বলেন, ভয়াবহ সব কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে আইএস পশ্চিমাদের বোঝাতে সমর্থ হয়েছে যে তারা অনেক দূর এগিয়েছে। যার অর্থ তারাই এখন চূড়ান্ত শত্রু। অন্যরা তাদের তুলনায় তেমন কিছুই নয়।
২০১৩ সালে সিরিয়ায় আইএস জঙ্গি তৎপরতা সবার নজর কাড়ে। প্রাথমিক পর্যায়ে সিরীয় সেনাবাহিনীকে অনেকটা এড়িয়ে গেলেও পরের বছর থেকে সরকারের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে তারা। ২০১৪ সালের জুনে সিরিয়া ও প্রতিবেশী দেশ ইরাকের বেশ খানিকটা অংশ দখল করে আইএস নিজেদের খিলাফত ঘোষণা করে। বর্তমানে আইএসের প্রধান লক্ষ্য—ইরাকের সুন্নি অঞ্চল এবং বাশারের পতন ঘটিয়ে সিরিয়ার বিস্তৃত অঞ্চল নিয়ে খিলাফতের ব্যাপ্তি ঘটানো।
আইএস বিভিন্ন দেশে সংঘাতে লিপ্ত ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের আকৃষ্ট করছে। ইতিমধ্যে হাজারো ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার দেশের তরুণেরা সিরিয়া ও ইরাকে যুদ্ধরত আইএস যোদ্ধাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন। শুধু তরুণেরাই নন, ইদানীং বেশ কিছু তরুণীকেও আইএস আকৃষ্ট করছে।
২০১৩ সালে দামেস্কের বাইরে ভয়াবহ রাসায়নিক অস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটে। পশ্চিমা বিশ্ব সিরিয়ায় সেনা অভিযানের হুমকি দিলে প্রেসিডেন্ট আসাদ এই ধ্বংসযজ্ঞ থামান। আর এখন মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট আইএসকে দমনে সিরিয়ায় বিমান হামলা চালাচ্ছে। সূত্র: আল জাজিরা, ডি ডব্লিউ, মিডল ইস্ট আই।
/এমপি/