পৃথিবীতে ক্ষুধা-মঙ্গা-দুর্ভিক্ষ যেমন বাস্তব, এরই বিপরীতে বিপুল পরিমাণ খাবার নষ্ট হওয়ার ঘটনাও বাস্তব। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষ যখন নিজেদের জন্য প্রয়োজনীয় খাবারটুকু যোগাড় করতে পারছে না, তখন মোট উৎপাদিত খাদ্যের অর্ধেকই নষ্ট করে ফেলছে যুক্তরাষ্ট্র। আর এ প্রবণতার কারণে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ার পাশাপাশি ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের হার ক্রমশ বাড়ছে।
খাবার নষ্টের পেছনে দাঁড় করানো হচ্ছে ওই খাদ্য-পণ্য নিখুঁত না হওয়ার অজুহাত। দোষ দেওয়া হচ্ছে ক্রেতাদের। বলা হচ্ছে, তারা নাকি ‘নিখুঁত’ না হলে খাদ্য কিনতে চান না। তবে এই যুক্তি মানছেন না খাদ্য নষ্টের বিরুদ্ধে সোচ্চার অ্যাকটিভিস্টরা। তারা এর নেপথ্যে বাজার-অর্থনীতির ধারাপ্রবণতাকেই কারণ হিসেবে শনাক্ত করেছেন। গার্ডিয়ানের নিজস্ব অনুসন্ধানেও খাবার নষ্টের পেছনে সুপার সপগুলোর নেপথ্য ভূমিকার কথা উঠে এসেছে।
বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ এবং বেশ কয়েকজন কৃষক, মোড়ক প্রস্তুতকারক, ট্রাকচালক, গবেষক, ক্যাম্পেইনার ও সরকারি কর্মকর্তার সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে গার্ডিয়ানের গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিদিন বিশ্বে মোট উৎপাদিত খাবারের এক তৃতীয়াংশ নষ্ট হচ্ছে। খাদ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাদ্য নষ্ট করার পরিমাণ কমানো না গেলে সরকার কার্যকরভাবে ক্ষুধা নিবৃত্তি অথবা জলবায়ু পরিবর্তন রোধ করতে পারবে না। নষ্ট খাদ্য বৈশ্বিকভাবে ৮ শতাংশ দূষণের জন্য দায়ী।
ওই গবেষণাকে উপজীব্য করে তৈরী করা গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন বলছে, খাবার নষ্টের পেছনের অজুহাত ‘নিখুঁত’ না হওয়া। যুক্তরাষ্ট্রে যেসব খাবার ‘নিখুঁত’ মনে হয় না কিংবা ত্রুটিযুক্ত মনে হয় সেগুলো ফেলে দেওয়া হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, গুণাগুণের ব্যাপারে অবাস্তব ও অনমনীয় মনোভাবের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত খাবারের একটা বিশাল অংশ মাঠে পঁচিয়ে ফেলা হয়। ক্যালিফোর্নিয়ার মাঠ ও বাগান থেকে শুরু করে পূর্ব উপকূলের পপুলেশন সেন্টার পর্যন্ত থাকা কৃষক ও খাদ্য সরবরাহের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, খুচরা বিক্রেতাদের তথাকথিত ‘নিখুঁত’ পণ্যের চাহিদা মেটাতে না পারায় অনেক উচ্চ মূল্য এবং পুষ্টিকর খাবার ফেলে দেওয়া হয়।
যুক্তরাষ্ট্র সরকারের এক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, কথিত ‘নিখুঁত’ না হওয়ার কারণে প্রতি বছর প্রায় ৬০ মিলিয়ন টন উৎপাদিত পণ্য (যার মূল্য প্রায় ১৬০ বিলিয়ন ডলার) ফেলে দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে এক তৃতীয়াংশই খাদ্যসামগ্রী।
নর্থ ক্যারোলিনা এবং মধ্যাঞ্চলীয় ফ্লোরিডা থেকে তাজা ফলমূল আর শাকসবজির ব্যবসা করেন জে জনসন। তিনি বলেন, ‘এগুলো সবই খুঁত-মুক্ত উৎপাদনের চাহিদার অংশ। আজকাল আমাদের ব্যবসার ক্ষেত্রে যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে তাহলো-হয় নিখুঁত উৎপাদন করো নয়তো ফেলে দাও’।
গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, খুঁতযুক্ত খাবারগুলো সাধারণত ক্ষেতেই নষ্ট করে ফেলা হয়। কেননা, এর মধ্য দিয়ে খরচ কমে। আবার যেসব খাদ্যে সামান্য খুঁত থাকে যা সতেজতা কিংবা গুণাগুণ নষ্ট করতে পারে না, সেসব খাবারের ক্ষেত্রে তা গুদামে পঁচিয়ে ফেলা হয়।
ওয়েড কার্সচেনম্যান নামে একজন ক্যালিফোর্নিয়ার বেকারসফিল্ডে আলু এবং অন্যান্য সব্জি চাষ করে থাকেন। ১৯৩০ সাল থেকে এটা তাদের পারিবারিক ব্যবসা। তিনি বলেন, ‘পরিপূর্ণ সতেজ খাদ্যের চাহিদা না মেটাতে পারায় প্রায় ২৫ শতাংশ ফসল মাঠ থেকে ফেলে দেওয়া হচ্ছে অথবা গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। মাঝে মাঝে এটি আরও খারাপ হয়।’
খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, তারা ভোক্তার স্বার্থেই খাদ্য নষ্ট করে থাকেন। জনস হপকিন্স সেন্টার ফর লাইভেবল ফিউচার এর গবেষক রনি নেফ বলেন, ‘ফলমূল আর খাদ্যদ্রব্য প্রায়সময়ই নষ্ট করে ফেলা হয়, কারণ খুচরা বিক্রেতারা বিশ্বাস করেন কেউ তা কিনবে না।’
তবে এসব কথা মানছেন না খাদ্য অর্থনীতির তাত্ত্বিতরা। তারা মনে করেন, এটা বাজার অর্থনীতির প্রক্রিয়ার কারণেই হচ্ছে। মানুষের চাহিদা নয়, বাজার অর্থনীতির উৎপাদনের লক্ষ্য হলো মুনাফা। মুনাফাকে উপজীব্য করে জারি থাকা এই উৎপাদন প্রক্রিয়ায় তাই চাহিদা আর যোগানের ভারসাম্যে তারতম্য থাকে। খাদ্য নষ্টকারী তিনটি দেশের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, উৎপাদিত উদ্ধৃত্ত খাদ্যদ্রব্য যেন বাজারে চাহিদা ও যোগানের ভারসাম্যে ব্যাঘাত ঘটাতে না পারে সেজন্য তা ফেলে দিতে হয়। তাই দুনিয়াজুড়েই খাদ্যদ্রব্য নষ্ট হচ্ছে। গার্ডিয়ান জানাচ্ছে, ইউরোপীয় কমিশনের ২০১৪ সালের হিসেব অনুযায়ী ইউরোপে বছরে ১০০ মিলিয়ন টন খাবার নষ্ট হয়।
খাদ্য নষ্ট করার বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরিকারী প্রতিষ্ঠান ফুড কাউবয় এর প্রতিষ্ঠাতা রজার গর্ডনও খাদ্য নষ্টের পেছনে ভোক্তাকে দায়ী করতে নারাজ। দার মতেও খাদ্য উৎপাদনের অর্থনীতির মধ্যেই খাদ্য নষ্টকরণের প্রবণতা উপস্থিত। খাদ্য-বাজারে সুপারমার্কেটগুলোর আধিপত্যের প্রশ্নকেই সামনে এনেছেন তিনি। রজার বলেন, ‘সুপারমার্কেটগুলোর মোট লাভের ১৫ শতাংশই আসে সতেজ উৎপাদন থেকে। যদি আমি-আপনি যদি সতেজ খাবারের উৎপাদন ৫০ শতাংশ কমিয়ে দেই তবে সুপারমার্কেটগুলোর মুনাফার স্তর ১.৫ শতাংশ থেকে নেমে ০.৭ শতাংশে দাঁড়াবে। আর আমাদেরকে যদি ভোগ্য দ্রব্য নষ্ট করার হার ৫০ শতাংশ কমাতে হয় তবে আমাদের ২৫০ বিলিয়ন ডলার অর্থনৈতিক সচলতা কমে যাবে’।
যুক্তরাষ্ট্রের কিছু সুপারমার্কেট চেইন এবং শিল্প গোষ্ঠী এ ধরনের ক্ষতির মাত্রা কমাতে ক্যাম্পেইন চালিয়ে যাচ্ছে। তবে উৎপাদনকারী এবং সরবরাহকারীদের কেউ কেউ দাবি করেছেন খুচরা বিক্রেতাদের কেউ কেউ এখনও নিখুঁতের আদর্শের ভিত্তিতে উৎপাদনের প্রবণতাকে প্রত্যাখ্যান করে যাচ্ছে।
গার্ডিয়ান যেসকল কৃষকের সাক্ষাৎকার নিয়েছে তাদের মধ্যে কেউ কেউ জানিয়েছেন তারা অনেক ছোটখাটো বিষয়ে তাদের খাদ্যদ্রব্য প্রত্যাখ্যাত হতে দেখেছেন। কিন্তু ক্ষমতাশালী সুপারমার্কেটগুলোর কাছ থেকে বর্জনের শিকার হওয়ার ভয়ে তারা এ ব্যাপারে মুখ বন্ধ রাখেন।
গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, খাদ্য নষ্ট করে ফেলার প্রবণতা বাড়তে থাকায় তা পরিবারের আয়ের ওপর প্রভাব ফেলছে। প্রতি বছর চার সদস্যের একটি পরিবারে প্রায় ১ হাজার ৬০০ ডলারের মতো ক্ষতি হচ্ছে। একইসঙ্গে তা ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় বিশ্বব্যাপী চলমান প্রচেষ্টা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ওয়াশিংটন ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক শেঙ্গ্যান ফ্যান বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে এখনও অনেক ক্ষুধার্ত ও অপুষ্ট মানুষ রয়েছে। আমার ধারণা, ৫-১০ শতাংশ মানুষ এখনও ক্ষুধার্ত রয়েছে। তাদের এখন পর্যন্ত পর্যাপ্ত পরিমাণ খাদ্য নেই। তাই খাদ্য নষ্ট করা বা ফেলে দেওয়ার ঘটনাটি সত্যিই খুব চিন্তার বিষয়। মানুষ এখনও ক্ষুধার্ত।’
তবে যুক্তরাষ্ট্রে কী পরিমাণ খাদ্য ফেলে দেওয়া হচ্ছে এখন পর্যন্ত তার স্পষ্ট হিসেব নেই বলে স্বীকার করেছেন গবেষকরা। অবশ্য, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড রিসোর্সেস ইন্সস্টিটিউট এর সঠিক হিসেবের জন্য এখনও কাজ করে যাচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা প্রশাসন ও জাতিসংঘ অঙ্গীকার করেছে ২০৩০ সালের মধ্যে খাদ্য নষ্ট করার হার অর্ধেকে নামিয়ে আনা হবে। এছাড়া খাদ্য উৎপাদনকারী, খুচরা বিক্রেতা এবং ন্যাচারাল রিসোর্সেস ডিফেন্স কাউন্সিলও খাদ্য নষ্ট করার পরিমাণ শিগগিরই কমিয়ে আনার অঙ্গীকার করেছে। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
/এআর/এফইউ/বিএ/ আপ- এপিএইচ/
আরও পড়ুন:
মুন্সীগঞ্জে ইউপি সদস্য ও তার ভাই গুলিতে নিহত
ফাঁসিতে ঝোলানো তিন মন্ত্রীর নামের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ‘যুদ্ধাপরাধী’
জঙ্গি তৎপরতায় এগিয়ে নর্থ-সাউথ, বুয়েট ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়