এবার এরদোয়ানের ‘অভ্যুত্থান’

‘অভ্যুত্থানকারী’দের শায়েস্তা করতে তুরস্কে ফিরছে মৃত্যুদণ্ডের বিধান

এরদোয়ান সমর্থকরা মৃত্যুদণ্ড পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছেতুরস্কে সামরিক অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার মুহূর্তেই দুনিয়াজুড়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছিলেন, এবার আরও বেশি নির্বিচারি হয়ে উঠবেন প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান। তিনি ব্যর্থ অভ্যুত্থানে জড়িত থাকার অভিযোগ এনে বিরোধীদের শায়েস্তা করার নতুন পথ পেয়েছেন বলে মনে করছেন তারা। মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক ও বিবিসির সাংবাদিক রবার্ট ফিস্কসহ অনেকেই একে ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পর একটি সফল অভ্যুত্থানের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন। সেই অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই যেন এবার দেশটিতে পুনর্বহাল হতে যাচ্ছে মৃত্যুদণ্ডের বিধান। অভ্যুত্থানের পর তুর্কি প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান জানিয়েছেন, তুরস্ক মৃত্যদণ্ডের বিধান পুনর্বহালের বিষয়টি বিবেচনা করছে।
রবিবার ইস্তানবুলে আয়োজিত এক সমাবেশ থেকে রব ওঠে মৃত্যুদণ্ডের বিধান পুনর্বহালের। সেখানে এরদোয়ান বলেন, ‘গণতন্ত্রে জনমতের ভিত্তিতেই রায় তৈরি হয়। আমি মনে করি, আমাদের সরকার এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বিরোধী দলের সঙ্গেও আলোচনা করবে।’
ক্যু চেষ্টায় নিহতদের শেষকৃত্যে তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এই বিষয়ে আর দেরি করতে পারি না, কারণ এই দেশে যারা ক্যু চেষ্টা চালিয়েছে, তাদের তার মূল্য চুকাতে হবেই।’
ব্যর্থ অভ্যুত্থান চেষ্টার পর এখন পর্যন্ত ছয় হাজারেরও বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তাসহ সুপ্রিম কোর্টের বিচারক। রবিবার আরও ৫০ সেনা সদস্যকে আটক করা হয়েছে। আটক মানুষের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী বেকির বোজদাগ। এই আটকের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘শিগগিরই তাদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হবে।’
১৯৮৪ সাল থেকে কোনও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়নি তুরস্কে। ২০০৪ সালে মৃত্যুদণ্ডের বিধান বাতিল করে দেশটি। ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) সদস্যপদের আবেদনের জন্য যা ছিল একটি অন্যতম প্রধান শর্ত। শুক্রবারের ক্যু চেষ্টার পর মৃত্যুদণ্ডের বিধান পুনর্বহালের যে দাবি তোলা হয়েছে তা ইইউ এবং তুরস্কের মধ্যকার আলোচনায় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

টিভিতে সরাসরি সম্প্রচারিত ভাষণে তিনি বলেন, ‘সংবিধান অনুযায়ী, যথাযথ কর্তৃপক্ষ এ অধিকারের মূল্যায়ন করবে এবং এ ব্যাপারে একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।’ সেনাবাহিনীর ক্ষুদ্র একটি অংশ অভ্যুত্থানের চেষ্টা করেছিল বলে জানান এরদোয়ান। তিনি এ প্রচেষ্টাকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’ বলে নিন্দা করেছেন।

আটক সেনা সদস্যরা মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন

এদিকে, তুরস্কে রাজনৈতিক দলগুলো এক বিরল ঐক্যের মধ্য দিয়ে শুক্রবারের অভ্যুত্থান চেষ্টার নিন্দা জানিয়েছে। তবে মৃত্যুদণ্ড পুনর্বহালের প্রশ্নে তাদের এই ঐক্য কতোটা দৃঢ় হবে তা নিশ্চিত নয়। বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখনও সুস্পষ্ট কোনও অবস্থান ব্যক্ত করা হয়নি।

তবে এই মুহূর্তে তুরস্কের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি এরদোয়ান। দেশের জনগণের একটা বৃহৎ অংশের সমর্থন রয়েছে তার।

তুরস্কে অভ্যুত্থান চেষ্টার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে স্বেচ্ছানির্বাসনে থাকা ফেতুল্লাহ গুলেনকে দায়ী করে আসছেন এরদোয়ান। আর এজন্য এরদোয়ান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বারবার দাবি জানিয়েছে তাকে গ্রেফতার করে দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য। তিনি দাবি করেছেন গুলেন যুক্তরাষ্ট্রে বসে সন্ত্রাসী সংগঠন পরিচালনা করছেন।

অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা শেষে এরদোয়ান তার বক্তব্যে গুলেনকে অভিযুক্ত করেন

ইস্তানবুলে এক জনসভায় এরদোয়ান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘যদি আমরা কৌশলগত মিত্র হয়ে থাকি, তাহলে আমাদের অনুরোধ আপনাকে রাখতে হবে।’

তবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি লুক্সেমবার্গে সাংবাদিকদের বলেন, ‘গুলেন সম্পর্কে যেসব প্রশ্ন তোলা হয়েছে, সে সম্পর্কে আমরা পুরোপুরি অবগত। আর আমরা তুর্কি সরকারকে আগের মতোই আমন্ত্রণ জানাব যথাযথ তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের জন্য। যুক্তরাষ্ট্র তা বিচার বিবেচনা সাপেক্ষে তা গ্রহণ করবে।’

গুলেন ‘হিজমেত মুভমেন্ট’ নামের একটি জনপ্রিয় আন্দোলনের প্রধান তাত্ত্বিক নেতা। শনিবার এক সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকারে তিনি সামরিক অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান আমার ওপর যে অভিযোগ করেছে, আমি তাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি না।’ তিনি তুরস্কের অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার জন্য এরদোয়ানকেই দায়ী করেন। সাংবাদিকদের গুলেন বলেন, ‘এই সম্ভাবনা রয়ে যায় যে, এটি সম্ভবত একটি সাজানো ক্যু। এরদোয়ানের একেপি পার্টিই তা আয়োজন করেছে। আর এর মধ্য দিয়ে তারা গুলেনপন্থী এবং সেনাবাহিনীকে দোষারোপ করার সুযোগ পাবে।’

ফেতুল্লাহ গুলেন

রবিবার সাবেক তুর্কি প্রধানমন্ত্রী আহমেত দাভুতোগলু কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে জানান, ক্যু পরবর্তী সময়ে তুরস্কের সঙ্গে অন্যান্য দেশের সম্পর্কে এর কোনও প্রভাব পড়বে না।

তিনি বলেন, ‘প্রথমত, তুরস্কের প্রতি সমর্থনের জন্য আমরা সকল দেশ এবং নেতাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বুঝতে হবে, তুরস্ক কোন অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একটি সন্ত্রাসী সংগঠন, যা আমাদের যুদ্ধবিমান, আমাদের সমরাস্ত্র দিয়েই আমাদের জনগণের ওপর আঘাত হানছে।’

তিনি আরও বলেন, ওই ক্যু চেষ্টার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে কথিত ইসলামিক স্টেট (আইএস)-এর বিরুদ্ধে লড়াই করা জোটের কোনও ‘আন্তঃসম্পর্ক’ নেই।

জানা গেছে, এখনও দেশটির কিছু স্থানে বিদ্রোহী সেনারা আত্মসমর্পণ করেননি। মধ্য তুরস্কের কয়না বিমানঘাঁটিতে সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। তবে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম রয়টার্স জানিয়েছে, আটক সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন ইনচিরলিক বিমানঘাঁটির কমান্ডার জেনারেল বেকির ইরকান ভান। এই বিমানঘাঁটি থেকেই মার্কিন যুদ্ধবিমান আইএস-এর বিরুদ্ধে হামলা চালায়।

উল্লেখ্য, শুক্রবার সন্ধ্যায় তুর্কি সেনাবাহিনীর একাংশ অভ্যুত্থান ঘটিয়ে দেশের শাসনভার নেওয়ার দাবি করে, যা দেশটির টেলিভিশনে প্রচার করা হয়।

নিরাপত্তা বাহিনীর সতর্ক প্রহরা

মধ্যরাতে ক্ষমতা দখলের ঘোষণা দিয়ে তুরস্কের ডানপন্থী সরকার উচ্ছেদের দাবি করে দেশটির সেনাবাহিনীর একাংশ। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক বিবৃতিতে তারা জানায়, ‘গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও মানবাধিকার রক্ষার স্বার্থে’ সশস্ত্র বাহিনী তুরস্কের ক্ষমতা দখল করেছে। টেলিভিশনের পর্দায় পড়ে শোনানো ওই বিবৃতিতে বলা হয়, এখন ‘শান্তি পরিষদ’দেশ চালাবে এবং কারফিউ ও সামরিক আইন জারি থাকবে। একই সঙ্গে তুরস্কের বিদ্যমান বৈদেশিক সব সম্পর্ক বহাল থাকবে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা প্রাধান্য পাবে। কারফিউর বিরোধিতা করে এরদোয়ানের সমর্থকরা রাস্তায় নেমে এলে সংঘর্ষ শুরু হয়।

শেষ পর্যন্ত সামরিক বাহিনীর সব অংশের সমর্থন না থাকায় এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের তৎপরতায় জনগণ রাস্তায় নেমে এলে বিদ্রোহী সেনাদের উদ্যোগ ভেস্তে যায়।

সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, অভ্যুত্থান চেষ্টায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৯০ জনে দাঁড়িয়েছে। রবিবার দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে নিহতের এ সংখ্যা জানানো হয়েছে। এর আগে নিহতের সংখ্যা ২৬৫ বলে জানানো হয়েছিল।

সূত্র: আল জাজিরা, রয়টার্স।  

/এসএ/বিএ/