গুলেনকে কি তুরস্কে ফেরত পাঠাবে যুক্তরাষ্ট্র?

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান অভ্যুত্থান চেষ্টার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত ফেতুল্লাহ গুলেনকে গ্রেফতার করে দেশে ফেরত পাঠানোর দাবি জানিয়ে আসছে ওবামা প্রশাসনের কাছে। তবে এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র কী করতে যাচ্ছে তা এখনও পরিষ্কার নয়। তারা বলছে, অপরাধী বিনিময় চুক্তির আওতায় গুলানের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তাই গুলানকে তুরস্কে ফেরত পাঠানো হবে কিনা, তা নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না এখনই।

এরদোয়ান সমর্থকদের উল্লাস

এরদোয়ান সরকারের দাবি, গুলেনই ওই অভ্যুত্থান চেষ্টার মূল হোতা। যদিও গুলেন ওই অভ্যুত্থানের সঙ্গে তার কোনও সম্পর্কে নেই বলে দাবি করছেন।

হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, মঙ্গলবার এই প্রসঙ্গে এরদোয়ানের কথা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র জশ আর্নেস্ট বলেছেন, গুলেনকে ফেরত পাঠানো হবে কিনা, তা নির্ভর করবে দেশ দুটির মধ্যে করা অপরাধী বিনিময় চুক্তির ওপর।

তুর্কি সরকারের মুখপাত্র ইব্রাহীম কালিন জানান, যুক্তরাষ্ট্র গুলেনকে ‘সন্দেহভাজন’ হিসেবেও দেশে ফেরত পাঠাতে পারে। তিনি বলেন, ‘খুবই জোরালো সন্দেহ রয়েছে যে, গুলেন ওই অভ্যুত্থান চেষ্টার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন। আর এর ওপর ভিত্তি করেই তাকে ফেরত পাঠাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র।’

এই যুক্তিকে ‘হাস্যকর’ বলে উল্লেখ করেছেন গুলেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘মার্কিন সরকারের কাছে আমি রাজনৈতিক বন্দিদের দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ার অপব্যবহার রোধে তা প্রত্যাখ্যানের অনুরোধ করছি।’

ফেতুল্লাহ গুলেন

উল্লেখ্য, গুলেন ‘হিজমেত মুভমেন্ট’ নামের একটি জনপ্রিয় আন্দোলনের প্রধান তাত্ত্বিক নেতা। গত শনিবার (১৬ জুলাই) এক সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকারে তিনি সামরিক অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান আমার ওপর যে অভিযোগ করেছে, আমি তাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি না।’ তিনি তুরস্কের অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার জন্য এরদোয়ানকেই দায়ী করেন। সাংবাদিকদের গুলেন বলেন, ‘এই সম্ভাবনা রয়ে যায় যে, এটি সম্ভবত একটি সাজানো ক্যু। এরদোয়ানের একেপি পার্টিই তা আয়োজন করেছে। আর এর মধ্য দিয়ে তারা গুলেনপন্থী এবং সেনাবাহিনীকে দোষারোপ করার সুযোগ পাবে।’

পেন্টাগন জানিয়েছে, প্রতিরক্ষামন্ত্রী অ্যাশ কার্টার তুরস্কের ইনচিরলিক বিমানঘাঁটির বিষয়ে তুর্কি পক্ষের সঙ্গে কথা বলেছেন। এই বিমানঘাঁটি থেকেই মার্কিন যুদ্ধবিমান কথিত ইসলামিক স্টেট (আইএস)-এর ওপর হামলা চালায়। বিমানঘাঁটিতে অভ্যুত্থান চেষ্টার পর থেকেই বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

এদিকে, তুরস্কে দমননীতি ক্রমশ বাড়তে থাকায়, তাতে চিন্তিত বিভিন্ন মহল। সরকার হাজার হাজার কর্মকর্তা বরখাস্তের পর এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা। দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং মানবাধিকার সমুন্নত রাখার বিষয়ে জাতিসংঘের কাছে তারা অনুরোধ করেছে।  

জন কেরি

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি বলেছেন, ‘তুরস্ক সরকারকে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং আইনের শাসন সমুন্নত রাখতে সর্বোচ্চ মান রক্ষা করতে হবে। আমরা অবশ্যই অভ্যুত্থান চেষ্টাকারীদের বিচারকে সমর্থন করি, কিন্তু এমন কোনও পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে ওই মান যেন নিচে নেমে না যায় সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।’

তুরস্কে মৃত্যুদণ্ডের বিধান পুনর্বহাল প্রশ্নে ইইউ পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান ফেদেরিকা মোগেরিনি বলেন, ‘মৃত্যুদণ্ডের বিধান বহাল রেখে কেউ ইইউ সদস্য হতে পারবে না।’ তুরস্ক কাউন্সিল অব ইউরোপের সদস্য ছিল এবং ইউরোপীয় কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশ, যা মৃত্যুদণ্ডের বিধানের বিরোধী।

জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেলের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, মৃত্যুদণ্ডের বিধান বহাল রেখে কেউ ইইউ-র সদস্য হতে পারবে না। আমরা নিশ্চিতভাবেই মৃত্যুদণ্ডের বিরোধী, আর মৃত্যুদণ্ডের বিধান জারি রাখার মানে হলো ইইউ-তে যোগ দেওয়ার আলোচনা শেষ হয়ে যাওয়া।

এরদোয়ান সমর্থকদের বিক্ষোভ

ইইউ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এক বিবৃতিতেও অনুরূপ কথা বলা হয়েছে।

ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ-মার্ক অরাল্ট বলেছেন, ‘তুরস্ক আমাদের কৌশলগত মিত্র। কিন্তু তাকে অবশ্যই মৌলিক স্বাধীনতাকে মর্যাদা দিতে হবে। অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার পরেও গণতান্ত্রিকতা কমে যাওয়ার কোনও সুযোগ নেই। বরং আরও বেশি গণতান্ত্রিক হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।’

ন্যাটো মহাসচিব জেনস স্টোলটেনবার্গ এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘অন্যান্য মিত্রের মতোই আমাদের কাছে তুরস্ক গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির গণতন্ত্র ও তার প্রতিষ্ঠানগুলো, সাংবিধানিক আদেশ, আইন এবং মৌলিক স্বাধীনতাসমূহ নিশ্চিত রাখাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’

বিদ্রোহী সেনাদের সামনেই বিক্ষোভ জানায় এরদোয়ানের সমর্থকরা

উল্লেখ্য, শুক্রবার সন্ধ্যায় তুর্কি সেনাবাহিনীর একাংশ অভ্যুত্থান ঘটিয়ে দেশের শাসনভার নেওয়ার দাবি করে, যা দেশটির টেলিভিশনে প্রচার করা হয়। মধ্যরাতে ক্ষমতা দখলের ঘোষণা দিয়ে তুরস্কের ডানপন্থী সরকার উচ্ছেদের দাবি করে দেশটির সেনাবাহিনীর একাংশ। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক বিবৃতিতে তারা জানায়, ‘গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও মানবাধিকার রক্ষার স্বার্থে’ সশস্ত্র বাহিনী তুরস্কের ক্ষমতা দখল করেছে। টেলিভিশনের পর্দায় পড়ে শোনানো ওই বিবৃতিতে বলা হয়, এখন ‘শান্তি পরিষদ’দেশ চালাবে এবং কারফিউ ও সামরিক আইন জারি থাকবে। একই সঙ্গে তুরস্কের বিদ্যমান বৈদেশিক সব সম্পর্ক বহাল থাকবে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা প্রাধান্য পাবে। কারফিউর বিরোধিতা করে এরদোয়ানের সমর্থকরা রাস্তায় নেমে এলে সংঘর্ষ শুরু হয়।

শেষ পর্যন্ত সামরিক বাহিনীর সব অংশের সমর্থন না থাকায় এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের তৎপরতায় জনগণ রাস্তায় নেমে এলে বিদ্রোহী সেনাদের উদ্যোগ ভেস্তে যায়।

সূত্র: বিবিসি।

/এসএ/বিএ/