সন্ত্রাসবিরোধী কর্মকর্তাদের মতে, সম্প্রতি যেসব হামলা হয়েছে সেগুলোর ক্ষেত্রে অন্তত একটি বিষয়ে খুব মিল খুঁজে পাওয়া গেছে। এসব ক্ষেত্রে দেখা গেছে হামলাকারী অতীতে মানসিক জটিলতায় ভুগেছিলেন। অরল্যান্ডোর নাইটক্লাবে হামলা, ব্রিটিশ এমপিকে হত্যা, ব্যাটন রগ, লুইজিয়ানা, ডালাস ও টেক্সাসে পুলিশের ওপর হামলা, ফ্রান্সে ট্রাক হামলা এবং জার্মানির শপিং সেন্টারে হামলা-সবগুলোর ক্ষেত্রে একই ধরনের প্রবণতা পাওয়া গেছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন হামলা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গুটিকয়েকের ক্ষেত্রেই কেবল উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে।
রয়টার্সের সঙ্গে যেসকল সন্ত্রাসবিরোধী কর্মকর্তা কথা বলেছেন তারা তাদের নাম এবং প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশে অনিচ্ছা জানিয়েছেন। গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে উগ্রপন্থীদের বিরুদ্ধে তথ্য সংগ্রহের জন্য যে ব্যবস্থা বিদ্যমান রয়েছে তা দিয়ে মানসিক জটিলতায় থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। মানসিক জটিলতার ইতিহাস রয়েছে এমন ব্যক্তিরা অন্য মানুষ কিংবা কোনও প্রপাগান্ডা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়েন। তাদেরকে সংহিংসতা চালানোর জন্য উসকানি দেওয়া হয়ে থাকে।
তদন্ত কর্মকর্তাদের দাবি অনুযায়ী, অরল্যান্ডোর হামলাকারী ওমর মতিন জিহাদি তৎপরতা পর্যবেক্ষণ করতেন। তিনি আইএসের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতেন বলে সন্দেহ করা হয়ে থাকে। তবে এখন পর্যন্ত ওমর মতিনের সঙ্গে আইএস কিংবা অন্য জঙ্গি গোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পানিনি তদন্তকারীরা।
ফ্রান্সের নিস শহরে হামলায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে পাঁচ সন্দেহভাজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত ওই হামলার সঙ্গে বিদেশি জঙ্গি গোষ্ঠীর সরাসরি সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন মার্কিন ও ফরাসি সন্ত্রাসবিরোধী কর্মকর্তারা।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, মানসিক রোগের পূর্ব ইতিহাস রয়েছে এমন ব্যক্তিদের আগে থেকে হামলাকারী হিসেবে শনাক্ত করা যে কঠিন তার অন্যতম উদাহরণ হলেন ওমর মতিন। ফেডারেল কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, ২০১৩ ও ২০১৪ সালে প্রায় ১০ মাস ধরে মতিনের ওপর তদন্ত চালিয়েছে এফবিআই। আল কায়েদাসহ অন্য জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গে মতিনের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে সহকর্মীদের অভিযোগের পর এ তদন্ত চালানো হয়। তদন্তের আওতায় থাকাকালীন সরকারের তিনটি ডাটাবেজে ওমর মতিনের নাম রেখেছিল এফবিআই। এরমধ্যে একটি ডাটাবেজ ছিল বিমানবন্দর ও সীমান্ত পার হওয়ার সময় অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের। তবে এরপরও জঙ্গিদের সঙ্গে মতিনের সত্যিকারের সংশ্লিষ্টতার কোনও প্রমাণ পাননি তদন্তকারীরা। যুক্তরাষ্ট্রের দুইজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, মতিনের বিরুদ্ধে প্রমাণ না পেয়ে পরবর্তীতে তদন্ত বন্ধ করে দেয় এফবিআই। ডাটাবেজগুলো থেকেও তার নাম সরিয়ে নেওয়া হয়। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, নিজস্ব নাগরিকদের ওপর সরকারের নজরদারি সীমিত করে প্রণিত আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই ওই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কেননা, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে সংযোগ থাকার সম্ভাবনা না থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের সন্দেহভাজন নাগরিকদের তথ্য সংগ্রহের অনুমতি পায় না সিআইএ কিংবা ন্যাশনাল কাউন্টার টেরোরিজমের কেউই।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ব্যাটন রগ ও ডালাসে বন্দুক হামলার ঘটনায়ও মানসিক জটিলতার ইস্যুটির ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দুটি হামলার ক্ষেত্রেই আপাত দৃষ্টিতে হামলাকারীদের মানসিক অসুস্থতা ও উগ্রপন্থী দৃষ্টিভঙ্গির লক্ষণ দেখা গেছে।
মিউনিখ, নিস, ব্যাটন রগ, ডালাস ও অরল্যান্ডোতে হামলার আগে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জোরেসোরে জঙ্গি গোষ্ঠীর (বিশেষ করে আইএসে) কাছ থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জঙ্গিদের শনাক্ত করার ও ধরার চেষ্টা করছে। সন্ত্রাসবাদবিরোধী কর্মকর্তাদের দাবি, সিআইএ, এফবিআই ও যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল কাউন্টার টেরোরিজম এবং ব্রিটেনের এমআই ফাইফের মতো গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর একসঙ্গে সীমিত সংখ্যক ব্যক্তিকে শনাক্ত করার সক্ষমতা রয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে ব্রিটেনের এমআই ফাইভের কথা বলা যায়। এ সংস্থাটি ইসলামী জঙ্গিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্রিটিশ নাগরিক এবং যুক্তরাজ্যভিত্তিক বিদেশিদের শনাক্ত করে। এ সংস্থা যুক্তরাজ্যের উগ্রপন্থীদের ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করে না।
সিআইএ’র সাবেক কর্মকর্তা জেনারেল মাইকেল হায়ডেনের মতে, সংগঠিত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে শনাক্ত করা এবং রুখে দেওয়ার কাজটি খুব কঠিন, কিন্তু মানসিক জটিলতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের স্বত:প্রণোদিত উগ্রপন্থা পুরোপুরি নতুন ধরনের সন্ত্রাসকে উপস্থাপন করে। সূত্র: রয়টার্স
/এফইউ/