‘জাতীয় ঐক্যের ডাক’ দিলেন এরদোয়ান

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান বলেছেন, তাকে অবমানতার অভিযোগে তুর্কি জনগণের ওপর যে সব মামলা দায়ের করা হয়েছে, তা তিনি প্রত্যাহার করে নেবেন। অভ্যুত্থান চেষ্টার পর ‘জাতীয় ঐক্যের ডাক’ দিয়ে তিনি এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। তবে অভ্যুত্থান প্রচেষ্টায় জড়িত থাকার কথা বলে ব্যাপক ধরপাকড়, বরখাস্ত, বহিষ্কারের ঘটনা মাত্রাগতভাবে বেড়েই চলেছে। সে কারণে তার ‘জাতীয় ঐক্যের ডাক’ নিয়ে সংশয় কাটছে না।

রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান

শুক্রবার (২৯ জুলাই) আঙ্কারায় অভ্যুত্থান চেষ্টায় নিহতদের স্মরণে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এরদোয়ান তাকে অবমাননার জন্য দায়ের করা সব মামলা তিনি প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়ে বলেন, ‘কেবল একবারের জন্যই আমি ক্ষমা করে মানহানি ও অবমাননার সব মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি মনে করি, আমরা যদি এই সুযোগ সঠিকভাবে কাজে না লাগাতে পারি, তাহলে জনগণ আমাদের কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে। তাই আমার মনে হয়, সমাজের সকল অংশ,  প্রথমত এবং প্রধানত রাজনীতিবিদদেরই এই নতুন বাস্তবতায় কাজ করতে হবে, যে সংবেদনশীল অবস্থা আমাদের সামনে রয়েছে।’

দেশব্যাপী শত শত মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুর্কি প্রেসিডেন্টের সমালোচনা করার জন্য মামলার সম্মুখীন হয়েছেন। চলতি বছরের ২ মার্চ ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান ও রয়টার্সের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৪ সাল থেকে তখন পর্যন্ত এরদোয়ানকে মানহানি ও অবমাননার এক হাজার ৮৪৫টি মামলা দায়ের করা হয়।

আঙ্কারার সদর দফতরে পুলিশের বিশেষ বাহিনীর সঙ্গে এরদোয়ান

অপরদিকে, তুরস্কে অভ্যুত্থান চেষ্টার পর থেকে সেনা সদস্য, বিচারক, আইনজীবী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, সাংবাদিকসহ অন্তত ১৮ হাজার মানুষকে আটক করা হয়েছে। এর মধ্যে  আট হাজার মানুষের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে।

অভ্যুত্থান চেষ্টার পর থেকে এখন পর্যন্ত গ্রেফতার, বরখাস্তের সংখ্যা ৬০ হাজার ছাড়িয়েছে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেন্ডেন্ট। অভ্যুত্থান চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর ব্যাপক ধরপাকড় শুরুর পর সেনাবাহিনী, বিচারবিভাগ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সরকারি বিভিন্ন বিভাগ এবং সংবাদমাধ্যম এই গ্রেফতার-বরখাস্তের আওতায় এসেছে।

তুরস্কে তিন মাসের রাষ্ট্রীয় জরুরি অবস্থা জারির পর, ২৩ জুলাই প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান তার প্রথম ডিক্রিতে স্কুল, কলেজ, দাতব্য সংস্থা, শ্রমিক সংগঠন, ক্লিনিক, হাসপাতাল, মেডিক্যাল ইনস্টিটিউটসহ দুই হাজার ৩৪১টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করেছেন।

ফেতুল্লাহ গুলেন

উল্লেখ্য, জরুরি অবস্থা জারি থাকায়, এখন কোনও ব্যক্তিকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই ৩০ দিন পর্যন্ত আটক রাখা যাবে। অনুমতিক্রমে আটকাদেশের এই মেয়াদ আরও বাড়ানো যেতে পারে।  এরই মধ্যে তুরস্কের বেশকিছু সংবাদমাধ্যম, ওয়েবসাইট, টেলিভিশন ও রেডিও স্টেশন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বেশ কয়েকজন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে।

গুলেনপন্থী বলে পরচিতি দৈনিক জামান পত্রিকার সাবেক ৪৭ কর্মীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। অভ্যুত্থান চেষ্টার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে অভিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত ফেতুল্লাহ গুলেনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে এমন সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ওপর ক্রমবর্ধমান দমনপীড়নের মধ্যে এ গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়।

গত মার্চে রাষ্ট্র নিয়োগকৃত প্রশাসকরা জামান ও একই মালিকানাধীন ইংরেজি দৈনিক টুডে’জ জামানের নিয়ন্ত্রণ নেয়। তখন থেকে পত্রিকা দুটি কড়া সরকারপন্থী হিসেবে খবর প্রকাশ করে যাচ্ছে। এমন বিভাজিত সমাজ-বাস্তবতায় ভিন্নমত প্রকাশের সকল মাধ্যম বন্ধ করে দিয়ে কেবল হাজার দুয়েক মানহানি ও অবমাননার মামলা প্রত্যাহার করে ‘জাতীয় ঐক্যের ডাক’ দেওয়ার ঘটনাকে ইতবাচকভাবে দেখছেন না রাজনীতি বিশ্লেষকরা।

বিদ্রোহী সেনাদের সামনেই বিক্ষোভ জানায় এরদোয়ানের সমর্থকরা

প্রসঙ্গত, ১৫ জুলাই সন্ধ্যায় তুর্কি সেনাবাহিনীর একাংশ অভ্যুত্থান ঘটিয়ে দেশের শাসনভার নেওয়ার দাবি করে, যা দেশটির টেলিভিশনে প্রচার করা হয়। মধ্যরাতে ক্ষমতা দখলের ঘোষণা দিয়ে তুরস্কের ডানপন্থী সরকার উচ্ছেদের দাবি করে দেশটির সেনাবাহিনীর একাংশ। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক বিবৃতিতে তারা জানায়, ‘গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও মানবাধিকার রক্ষার স্বার্থে’ সশস্ত্র বাহিনী তুরস্কের ক্ষমতা দখল করেছে। টেলিভিশনের পর্দায় পড়ে শোনানো ওই বিবৃতিতে বলা হয়, এখন ‘শান্তি পরিষদ’দেশ চালাবে এবং কারফিউ ও সামরিক আইন জারি থাকবে। একই সঙ্গে তুরস্কের বিদ্যমান বৈদেশিক সব সম্পর্ক বহাল থাকবে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা প্রাধান্য পাবে। কারফিউর বিরোধিতা করে এরদোয়ানের সমর্থকরা রাস্তায় নেমে এলে সংঘর্ষ শুরু হয়।

শেষ পর্যন্ত সামরিক বাহিনীর সব অংশের সমর্থন না থাকায় এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের তৎপরতায় জনগণ রাস্তায় নেমে এলে বিদ্রোহী সেনাদের উদ্যোগ ভেস্তে যায়।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, বিবিসি।

/এসএ/বিএ/