গোয়েন্দা সংস্থা এবং সেনা প্রশাসনকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান। ব্যর্থ অভ্যুত্থান চেষ্টার পর চলমান ‘শুদ্ধি অভিযানে’র অংশ হিসেবে এবার তিনি এক সাংবিধানিক প্যাকেজ সামনে আনতে যাচ্ছেন। পার্লামেন্টে সেটি পাস হলেই সম্পূর্ণ প্রেসিডেন্টের কর্তৃত্বের আওতায় আসবেন সেনা প্রধান ও জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা (এমএইটি)। গোয়েন্দা ও সেনা প্রশাসনকে সম্পূর্ণ করায়ত্ত করতে পারবেন এরদোয়ান। রাজনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, তুরস্কের পার্লামেন্টে এরদোয়ানের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় এরদোয়ানের প্যাকেজ পাস হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।
এরদোয়ান বলেছেন, তিনি তার প্রস্তাব পার্লামেন্টের সামনে উত্থাপন করবেন। যেহেতু পার্লামেন্টে তার দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, তাই এ প্রস্তাব অচিরেই পাস হয়ে যাওয়ার কথা।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানাচ্ছে, শনিবার তুরস্কের এ হাবের টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এরদোয়ান বলেছেন, ‘আমরা একটি ছোট সাংবিধানিক প্যাকেজ সামনে নিয়ে আসছি, পার্লামেন্টে তা অনুমোদন হলে ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স অর্গানাইজেশন (এমএইটি) এবং সেনা প্রধান প্রেসিডেন্টের নিয়ন্ত্রণে আসবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সেনা স্কুলগুলো বন্ধ করে দেওয়া হবে। আমরা একটি জাতীয় প্রতিরক্ষা বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলব।’
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়, ‘এরদোয়ান ওই সাক্ষাৎকারে বলেছেন, নতুন ডিক্রিতে আমাদের সশস্ত্র বাহিনী আরও শক্তিশালী হবে। আমাদের বাহিনীর কমান্ডাররা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে থাকবেন।’
এর আগে তুরস্কের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ফিকরি ইসিক তুর্কি সংবাদমাধ্যম এনটিভি-কে বলেছেন, সেনাবাহিনীকে ঢেলে সাজানো হবে। সেনা স্কুলগুলোকেও নতুন আদলে গড়ে তোলা হবে বলে তিনি জানান।
অভ্যুত্থান চেষ্টায় জড়িত থাকার অভিযোগে চলতি সপ্তাহে আরও অন্তত এক হাজার ৭০০ জন সেনা কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে বলে গার্ডিয়ান জানিয়েছে। রবিবার সরকারি গেজেটে তা প্রকাশ করা হবে।
তুর্কি সশস্ত্রবাহিনীর প্রায় ৪০ শতাংশ জেনারেল ও এডমিরালকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
অভ্যুত্থান চেষ্টার পর থেকে এখন পর্যন্ত গ্রেফতার, বরখাস্তের সংখ্যা ৬০ হাজার ছাড়িয়েছে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেন্ডেন্ট। অভ্যুত্থান চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর ব্যাপক ধরপাকড় শুরুর পর সেনাবাহিনী, বিচারবিভাগ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সরকারি বিভিন্ন বিভাগ এবং সংবাদমাধ্যম এই গ্রেফতার-বরখাস্তের আওতায় এসেছে।
তুরস্কে তিন মাসের রাষ্ট্রীয় জরুরি অবস্থা জারির পর, ২৩ জুলাই প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান তার প্রথম ডিক্রিতে স্কুল, কলেজ, দাতব্য সংস্থা, শ্রমিক সংগঠন, ক্লিনিক, হাসপাতাল, মেডিক্যাল ইনস্টিটিউটসহ দুই হাজার ৩৪১টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করেছেন।
উল্লেখ্য, জরুরি অবস্থা জারি থাকায়, এখন কোনও ব্যক্তিকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই ৩০ দিন পর্যন্ত আটক রাখা যাবে। অনুমতিক্রমে আটকাদেশের এই মেয়াদ আরও বাড়ানো যেতে পারে।
এরই মধ্যে তুরস্কের বেশকিছু সংবাদমাধ্যম, ওয়েবসাইট, টেলিভিশন ও রেডিও স্টেশন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বেশ কয়েকজন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে।
গুলেনপন্থী বলে পরচিতি দৈনিক জামান পত্রিকার সাবেক ৪৭ কর্মীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। অভ্যুত্থান চেষ্টার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে অভিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত ফেতুল্লাহ গুলেনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে এমন সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ওপর ক্রমবর্ধমান দমনপীড়নের মধ্যে এ গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়।
প্রসঙ্গত, ১৫ জুলাই সন্ধ্যায় তুর্কি সেনাবাহিনীর একাংশ অভ্যুত্থান ঘটিয়ে দেশের শাসনভার নেওয়ার দাবি করে, যা দেশটির টেলিভিশনে প্রচার করা হয়। মধ্যরাতে ক্ষমতা দখলের ঘোষণা দিয়ে তুরস্কের ডানপন্থী সরকার উচ্ছেদের দাবি করে দেশটির সেনাবাহিনীর একাংশ। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক বিবৃতিতে তারা জানায়, ‘গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও মানবাধিকার রক্ষার স্বার্থে’ সশস্ত্র বাহিনী তুরস্কের ক্ষমতা দখল করেছে। টেলিভিশনের পর্দায় পড়ে শোনানো ওই বিবৃতিতে বলা হয়, এখন ‘শান্তি পরিষদ’দেশ চালাবে এবং কারফিউ ও সামরিক আইন জারি থাকবে। একই সঙ্গে তুরস্কের বিদ্যমান বৈদেশিক সব সম্পর্ক বহাল থাকবে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা প্রাধান্য পাবে। কারফিউর বিরোধিতা করে এরদোয়ানের সমর্থকরা রাস্তায় নেমে এলে সংঘর্ষ শুরু হয়।
শেষ পর্যন্ত সামরিক বাহিনীর সব অংশের সমর্থন না থাকায় এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের তৎপরতায় জনগণ রাস্তায় নেমে এলে বিদ্রোহী সেনাদের উদ্যোগ ভেস্তে যায়।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, বিবিসি।
/এসএ/বিএ/