জোরপূর্বক যৌন ব্যবসায় বাধ্য করা হচ্ছে গ্রিসের শরণার্থী শিবিরের বাসিন্দাদের। তারা আসক্ত হয়ে পড়ছেন মাদকে। কখনও কখনও তারা পরিণত হচ্ছেন মানব পাচারের সহজ শিকারে। মাফিয়াদের দৌরাত্মে শরণার্থী শিবিরগুলোতে এই বাস্তবতা হাজির রয়েছে।
গত সপ্তাহে অবজারভারস এক্সপোজ অব সেক্সুয়াল অ্যাবিউজ’ শিরোনামে ওইসব শরণার্থী শিবিরের শিশুদের ওপর যৌন নিপীড়নের ঘটনা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেই প্রতিবেদনের পর সোমবার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান ত্রাণকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে। ওই দুই প্রতিবেদনে শরণার্থী শিবিরের ভয়াবহ বাস্তবতা উঠে আসে। এর প্রেক্ষিতে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে গ্রিসের সরকার। ভিড় এড়াতে নতুন শরণার্থী শিবির প্রতিষ্ঠারও ঘোষণা দিয়েছে দেশটি।
উল্লেখ্য ইইউ এবং বালাকান দেশগুলো তাদের সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়ার পর থেকে গ্রিস হয়ে উঠেছে শরণার্থীদের প্রধান গন্তব্য। দেশটিতে এখনও পর্যন্ত ৫৫ টি শরণার্থী শিবির স্থাপিত হয়েছে বলে অনুমান করা হচ্ছে। তুরস্কের গত মাসের ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পর গ্রিসে শরণার্থী ও অভিবাসন প্রত্যাশীদের ভিড় বেড়ে যায়। সব মিলে গ্রিস এখন শরণার্থীতে ভরা এক দেশ।
ত্রাণকর্মীরা গার্ডিয়ানকে জানান, অন্তত ৫৮ হাজার শরণার্থী গ্রিক ও আলবেনিয়ান মাফিয়াদের লক্ষ্যবস্তু হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন। গত সপ্তাহে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম অবজারভারস ‘এক্সপোজ অব সেক্সুয়াল অ্যাবিউজ’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশের পর অবশ্য গ্রিক সরকার পরিচালিত এই শরণার্থী শিবিরগুলোতে সংকট মোকাবেলায় দ্রুত ও যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। সরকারি এই ঘোষণায় বলা হয় শরণার্থী শিবিরগুলোতে অতিরিক্ত ঘনবসতি হওয়ায় অস্থিতিশীলতা তৈরি হচ্ছে। ভিড় কমাতে নতুন চারটি শরণার্থী শিবির প্রতিষ্ঠারও ঘোষণা দেয় গ্রিসের সরকার।
এর আগে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পৃষ্ঠপোষকতায় গ্রিক শরণার্থী কেন্দ্রগুলোতে জীবনযাপন পদ্ধতির উন্নয়নের পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এ উদ্দেশ্যে ইইউ এপ্রিল মাসে ৭১ দশমিক ৮ মিলিয়ন পাউন্ড তহবিল দেয়। এ ছাড়াও জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর এবং ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রসসহ ছয়টি আন্তর্জাতিক এনজিও শরণার্থীদের জন্য বিপুল পরিমাণ তহবিল দেয়। এই জরুরি সহায়তা সম্পর্কে ইইউ মানবিক ত্রাণ ও সংকট ব্যবস্থাপনা কমিশনার ক্রিসটোস স্টাইলিয়ানিদেস বলেন, ‘ইইউ কিভাবে ইউরোপের সংকটগুলো মোকাবেলা করছে তার একটি বাস্তব উদাহরণ এই তহবিল।’
তবে কয়েক মাসের মধ্যে দেখা যায়, যৌন শোষণ ও অপরাধ প্রবণতায় ভরে গেছে শরণার্থী শিবিরগুলো। শিবিরগুলোর ভয়াবহতা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ হতে থাকে। প্রশ্ন ওঠে ত্রাণের অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে কিনা। প্রশ্ন ওঠে দুর্বল পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ও পুলিশি প্রতিরক্ষা নিয়েও । সর্বপোরি শিবিরগুলোর মানবেতর পরিস্থিতি সামনে চলে আসে। তহবিল দাতাদের একজন আমেদ খান অবজারভারকে বলেন, ‘এখানে মানবিকতার কোন স্থান নেই। সংখ্যাই সব।’
তবে ব্যতিক্রমী শিবিরও আছে। তেমনই একটি শিবির আমেদ খানের দান করা এলপিদা। এলপিদা শিবির স্থাপিত হয়েছে একটি পরিত্যাক্ত কারখানায়। সেখানে একটি চা খাওয়ার কক্ষ ও ইয়োগা কেন্দ্র খোলা হয়েছে। একে একটি অভিনব পদক্ষেপ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। কেননা, এতে শরণার্থীরা কিছুটা হলেও নিজের মতো সময় কাটানোর সুযোগ পাবেন। এই শিবিরটি স্থাপিত হওয়ার পর থেকেই একে সবচেয়ে মানবিক শরণার্থী কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। আমেদ খান বলেন, ‘এখানে তহবিলের অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় শরণার্থী শিবিরগুলোর যে অবস্থা ছিলো, এই শিবিরগুলোর অবস্থা তার থেকে কিছুমাত্র ভালো নয়।’
এদিকে মার্কিন ত্রাণকর্মী নাসরিন আবাজা বলেন, ‘যদি এদের জীবনযাপন পদ্ধতির কোনও উন্নয়ন না করা যায়, তাদের উৎপাদনে যুক্ত করা না যায়, তাহলে সামনে ভয়াবহ দুর্গতি অপেক্ষা করছে।’ তিনি আরও বলেন, এই শিবিরগুলো জঙ্গিবাদের বৃদ্ধির জন্য উর্বর ভূমি হিসেবেও কাজ করতে পারে। মাফিয়া গ্যাংগুলোর সহিংসতা তো রয়েছেই। এই শিবিরগুলো দেখলে মনে হয়, বাকি পৃথিবী এই মানুষগুলোর কথা ভুলে গেছে।’
গত গ্রীষ্মে গ্রিসে শরণার্থী প্রবেশের হার ছিল সবচেয়ে বেশি। সে সময় একদিনেই ১০ হাজার মানুষ গ্রিক দ্বীপে পৌঁছানোর রেকর্ডও রয়েছে। তবে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবারের মধ্যে ২৪ ঘণ্টা সময়ে সেখানে ২৬১ শরণার্থীর প্রবেশ ঘটেছে যা স্বাভাবিক হারের প্রায় দ্বিগুণ। গ্রিসের শিবিরে থাকা এক সিরিয়ান কিশোর বলেন, ‘আমি এখানে আসার আগে মাদকদ্রব্য সম্পর্কে কিছুই জানতামও না। এখন এই আমিই মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছি।’ শিবিরের বাসিন্দারা জানান, পুলিশ এখানে একেবারেই নিষ্ক্রিয়। তারা মাফিয়াদের মাদক কেনাবেচা, সহিংসতা ইত্যাদি দেখেও কোন পদক্ষেপ নেয় না।
/ইউআর/বিএ/