কাশ্মির সফর শেষে বুধবার (৭ সেপ্টেম্বর) দিল্লিতে সবর্দলীয় প্রতিনিধি দলের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে জাতীয় সংহতি ও সুরক্ষার প্রশ্নে কোনও আপস না করে কেন্দ্র সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন নেতারা। কেন্দ্র সরকারের পক্ষ থেকেও হুরিয়তের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণের কথা স্পষ্টভাবেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এর আগে সর্বদলীয় প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আলোচনায় বসতে অস্বীকার করায় মোদি সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘হুরিয়ত শান্তি চায় না।’ এরপর এক বিবৃতিতে হুরিয়ত জানিয়েছে, ‘নিজেদের ক্ষতি স্বীকার করে কাশ্মিরের মানুষ বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের মুখোশ খুলে দিচ্ছে। আর নয়াদিল্লি চাইছে দেশের মানুষকে বোকা বানাতে। হুরিয়তের দিকে আঙুল তুলে কাশ্মিরের আসল সমস্যা থেকে মানুষের নজর ঘুরিয়ে দিতে চাইছে।’
তবে কাশ্মির প্রশ্নে ভারতের নির্বাচনপন্থী সবগুলো দলের অবস্থান প্রায় একই। বামপন্থী নেতা সীতারাম ইয়েচুরি থেকে শরদ যাদব, দিল্লি বৈঠকে কংগ্রেসসহ প্রায় সব দলের নেতারাই কাশ্মিরে আলোচনার পাশাপাশি হুরিয়তের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ারও সুপারিশ করেছেন।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানানো হয়েছে, হুরিয়ত নেতাদের সরকারি যে সাহায্য করা হয়, তা বন্ধ করার কথা ভাবছে কেন্দ্র সরকার। বর্তমানে গৃহবন্দী থাকলেও চিকিৎসা, অর্থ, বিদেশ ভ্রমণ বা নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলিতে হুরিয়ত নেতাদের সরকারি সাহায্য দেয় নয়াদিল্লি। কিছু ক্ষেত্রে তা কমিয়ে দেওয়া আবার কোনও ক্ষেত্রে এ সব একেবারে বন্ধ করে দেওয়ার কথা ভাবছে কেন্দ্র সরকার। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হংসরাজ আহির এ কথা জানিয়েছেন।
দিল্লি বৈঠকে প্রতিনিধি দলের নেতারা পাঁচটি বিষয়ে পদক্ষেপ করতে সরকারকে প্রস্তাব দিয়েছে। এক, ছররা গুলির ব্যবহার বন্ধ করা। বিকল্প হিসেবে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে পাভা শেল ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। দুই, ছররা গুলির কারণে যাদের চোখ নষ্ট হয়েছে বা শরীরে অন্য ক্ষতি হয়েছে, তাদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা। তিন, স্থানীয় মানুষদের উপর অত্যাচার করা নিয়ে নিরাপত্তাবাহিনীর বিরুদ্ধে যদি কোনও অভিযোগ ওঠে, তা হলে তার তদন্ত করতে হবে। চার, জনবসতি রয়েছে এমন জায়গায় সামরিক বাহিনীর বিশেষ ক্ষমতা বা আফস্পা প্রত্যাহার করে নেওয়া হোক। পাঁচ, প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও স্থানীয় যুবকদের রোজগারের সুযোগ করে দিতে ব্যর্থ হয়েছে সরকার। তাই দ্রুত কাশ্মীরি যুবকদের জন্য চাকরির ব্যবস্থা করতে হবে। এসব প্রস্তাব খতিয়ে দেখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে মোদি সরকার।
চলতি মাসের ৪ তারিখ ভারতের সর্বদলীয় প্রতিনিধি দল কাশ্মিরের বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনা করতে কাশ্মির সফর করে। তবে এর আগেই কাশ্মিরের প্রথমসারির অধিকার সংগঠন, সিভিল সোসাইটি গ্রুপ, ব্যবসায়ী, আইনজীবী এবং ডাক্তাররা ওই আলোচনা বর্জনের কথা জানিয়ে দেন। হুরিয়ত কনফারেন্সের সঙ্গে প্রাথমিকভাবে আলোচনা করার প্রোগ্রাম না থাকলেও প্রতিনিধিদল হুরিয়তকে আলোচনার আমন্ত্রণ জানালে, হুরিয়ত ওই আলোচনাকে ‘লোক দেখানো’ বলে বিবৃতি দিয়ে তা বর্জন করে। হুরিয়তের তিন নেতা মিরওয়াইজ উমর ফারুক, ইয়াসিন মালিক বর্তমানে কারাবন্দি রয়েছেন। অপর নেতা গিলানিকে গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ৮ জুলাই অনন্তনাগের কোকেরনাগ এলাকায় সেনা ও পুলিশের বিশেষ বাহিনীর যৌথ অভিযানে হিজবুল কমান্ডার বুরহান ওয়ানিসহ তিন হিজবুল যোদ্ধা নিহত হন। বুরহান নিহতের খবর ছড়িয়ে পড়লে কাশ্মির জুড়ে উত্তেজনা শুরু হয়। বিক্ষুব্ধ কাশ্মিরিদের দাবি, বুরহানকে ‘ভুয়া এনকাউন্টারে’ হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে প্রথমে পুলওয়ামা ও শ্রীনগরের কিছু অঞ্চলে কারফিউ জারি করা হয়। পরবর্তীতে বিক্ষোভ আরও জোরালো হলে পুরো কাশ্মিরজুড়ে কারফিউ সম্প্রসারিত হয়।
সম্প্রতি কাশ্মিরের বেশিরভাগ এলাকা থেকে কারফিউ সরিয়ে নিলেও উত্তাপ কমে আসেনি। চলমান সংঘর্ষে অন্তত ৭৩ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছে প্রায় ১১ হাজার মানুষ। এর মধ্যে সাত হাজারই কাশ্মিরি বিক্ষোভকারী।
সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, আনন্দবাজার।
/এসএ/