২০১৫ সালে মিনায় পদদলিত হয়ে নিহত হওয়া প্রায় আড়াই হাজার ধর্মপ্রাণ মুসলিমের স্মৃতি বুকে নিয়ে আবারও মীনায় সমবেত হয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা। যে কোনও ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে নেওয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আর মিনার পদদলনের মতো দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য স্বতন্ত্র ব্যবস্থাপনাও জারি করেছে হজ কর্তৃপক্ষ।
কেউ যাচ্ছেন গাড়িতে। কেউবা আবার পায়ে হেঁটে। মক্কা থেকে মিনার পথে লাখ লাখ মানুষের মুখরিত পদচারণা।
নজিরবিহীন নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে শুক্রবার জুমার নামাজের পর পবিত্র হজের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। হজের আগের এই শেষ জুমার দিনে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা লাখ লাখ হজযাত্রী মসজিদুল হারামে জুমার নামাজ আদায় করেন। পরে তারা পবিত্র হজ পালন করতে মক্কা থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে মিনা’র উদ্দেশে যাত্রা করেন। সেখানে সারাদিন-রাত অবস্থানের মধ্য দিয়ে পবিত্র হজের পাঁচদিনের আনুষ্ঠানিকতার প্রথম পর্ব শুরু হচ্ছে। দীর্ঘ যানজট এড়াতে অনেকেই মিনায় যাচ্ছেন পায়ে হেঁটে।
মূলত:হজের অংশ হিসেবে হজযাত্রীরা ৭ থেকে ১২ জিলহজ-মিনা, আরাফাত, মুজদালিফায় অবস্থান করবেন।
এদিকে মিনায় (জামারাত) শয়তানকে পাথর নিক্ষেপের সময় যাতে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে, সে জন্য এবার স্বতন্ত্র ব্যবস্থা নিয়েছে সৌদি হজ কর্তৃপক্ষ । হাজিদের ভাগ ভাগ করে জামারাতে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে তারা। গত বছর মিনায় পাথর নিক্ষেপের সময় পদদলিত হয়ে বহু হাজির মৃত্যু হয়। সৌদি আরবের তরফ থেকে নিহতের সংখ্যা ৭শ’র কিছু বেশি দাবি করা হলেও মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক যুক্তরাজ্যভিত্তিক অনলাইন সংবাদমাধ্যম নিহতদের ছবি ও আরও বিভিন্ন তথ্য খতিয়ে দেখার পর ২৪৩২ জনের প্রাণহানির তথ্য নিশ্চিত করে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থাসহ বেশ কয়েকটি মানবাধিকার সংস্থাও দাবি করেছে এ সংখ্যা ২ হাজার ছাড়িয়েছিল। এরপরই হজে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের উদ্যোগ নেয় সৌদি কর্তৃপক্ষ।
তাওয়াফ, সাঈ শেষে মিনায় ফিরে ১১ ও ১২ জিলহজ অবস্থান করবেন ও প্রতিদিন তিনটি শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করবেন। হাজিদের যাতায়াতের সুবিধার জন্য আরাফাত থেকে মিনা পর্যন্ত মনোরেল সেবা চালু হয়েছে। প্রায় ১৮ কিলোমিটার এ পথে রয়েছে নয়টি স্টেশন (আরাফাতে তিনটি, মুজদালিফায় তিনটি এবং মিনায় তিনটি)।
এ বছর হাজিদের পরিচয় নিশ্চিতের জন্য ইলেকট্রনিক ব্রেসলেট সরবরাহ করা হয়েছে। প্রতিটি ব্রেসলেটে বারকোড রয়েছে এবং এটি অ্যাপসের মাধ্যমে স্মার্টফোনের সঙ্গে সংযুক্ত। এই ব্রেসলেটে হাজিদের ব্যক্তিগত এবং স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য রয়েছে। এটি তাদের পরিচয় নিশ্চিত করার পাশাপাশি জরুরি সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রেও সুবিধা দেবে। সেইসঙ্গে তাদের গতিবিধিও পর্যবেক্ষণ করা হবে এই ব্রেসলেটের মাধ্যমে। সরকারি বার্তা সংস্থা সৌদি গেজেট জানিয়েছে, অবৈধ হজযাত্রীদের আটকে বাহিতা ও হাদা এলাকায় ১ হাজার ২০০ পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এছাড়া কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে যাতে হাজিদের নিরাপত্তায় দ্রুত তিন হাজার উদ্ধার ও অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র স্থানান্তরে ১৭ হাজার কর্মী মোতায়েন করেছে বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগ। হজের পাঁচদিন মক্কা ও পবিত্র স্থানগুলো পরিষ্কারের জন্য ২৬ হাজার কর্মীকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সৌদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হাজিদের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার জন্য মক্কায় পর্যাপ্ত জনবল, ওষুধ ও যন্ত্রপাতিসহ আটটি হাসপাতাল স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া মিনা, আরাফাতের ময়দান ও মুজদালিফায় ২৫টি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র চালু করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, চলতি বছর মোট ১ লাখ ১ হাজার ৪ জন বাংলাদেশি হজ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরব গেছেন। এর মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ৫ হাজার ১৮২ জন এবং বেসরকারি ব্যবস্থাপনার ৯৫ হাজার ৮২২ জন গেছেন। হজ অফিস সূত্র জানায়, চলতি বছর ১ লাখ ১ হাজার ৭৫৮ জন বাংলাদেশির হজ পালনের বিষয়ে সৌদি সরকারের সঙ্গে চুক্তি হয়। এর মধ্যে ১ লাখ ১ হাজার ৪ জন বাংলাদেশির নামে ভিসা ইস্যু করে ঢাকাস্থ সৌদি দূতাবাস। পুলিশ ভেরিফিকেশন শেষে নৈতিবাচক প্রতিবেদন, হজযাত্রীর মৃত্যুজনিত সমস্যাসহ নানা কারণে ৭৫৪ জনের নামে সৌদি দূতাবাস ভিসা ইস্যু করেনি। ভিসাপ্রাপ্তদের মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনার ৪০১ জন বাংলাদেশি হজযাত্রী নিয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের হজের প্রথম ফ্লাইটটি (বিজি-১০১১) গত ৪ আগস্ট সকাল ৮টা ৫ মিনিটে সৌদি আরবের উদ্দেশে ঢাকা ছেড়ে যায়। বিমানের হজ ফ্লাইট শেষ হয়েছে সোমবার। আর সাউদিয়া এয়ারলাইন্সের হজ ফ্লাইট শেষ হয়েছে মঙ্গলবার।
সূত্র: বিবিসি, মিডল ইস্ট আই
/বিএ/