এক পদস্থ কর্মকর্তা পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ‘দু’পক্ষের আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে। ২২টি প্রিডেটর গার্ডিয়ান ড্রোন কেনার বিষয়টি শেষ পর্যায়ে রয়েছে।’ রয়টার্স জানিয়েছে, সামরিক নজরদারির জন্য প্রিডেটর ড্রোন কেনা এবং একাধিক প্রতিরক্ষা ও পরমাণু প্রকল্পের বিষয়ে মার্কিন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করতে তৎপরতা চালাচ্ছে ভারত। এমন এক সময় এই চুক্তি স্বাক্ষর করার প্রসঙ্গ তোলা হলো, যখন কাশ্মির প্রশ্নে দুই দেশের মধ্যে চূড়ান্ত অস্থিরতা বিরাজ করছে।
ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে যে ব্যক্তিগত ও কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন, তা পরবর্তী প্রশাসনের সঙ্গে গড়ে উঠবে কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। আর এজন্য এই প্রশাসনের আমলেই দ্রুত চুক্তি স্বাক্ষর করতে চাইছে ভারত।
রাশিয়াকে সরিয়ে এখন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সবচেয়ে বড় অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ। মোদি সরকার ভারতে কয়েক বিলিয়ন ডলারের একটি মার্কিন পারমাণবিক চুল্লি বসানোর বিষয়েও আলোচনা এগিয়ে নিয়েছে।
এর বিপরীতে ওয়াশিংটন নয়াদিল্লিকে যুদ্ধবিমানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহৃত উচ্চ-প্রযুক্তির সামরিক সহায়তা দেবে। তাছাড়া মিসাইল টেকনোলজি কন্ট্রোল রেজিম-এর সদস্য হতেও ভারত সহায়তা পাবে যুক্তরাষ্ট্রের। আর এর ফলে ভারত নজরদারি প্রিডেটর ড্রোন কিনতে পারবে।
ভারতীয় সশস্ত্রবাহিনী অস্ত্রবাহী ড্রোন কেনারও ইচ্ছা পোষণ করেছিল। পাকিস্তানে কথিত জঙ্গি ঘাঁটিতে তা ব্যবহার করা হবে বলেও উল্লেখ করেছিল ভারত। তবে আইনি বাধ্যবাধকতার জন্য যুক্তরাষ্ট্র তার অনুমোদন দিতে পারছে না বলে জানা গেছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী অ্যাশটন কার্টার চলতি বছরের এপ্রিলে ভারত সফরে গিয়েছিলেন। বছরের শেষ নাগাদ তিনি আরেকবার ভারত সফরে যাবেন বলে জানা গেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যে জানিয়েছেন, তিনি নির্বাচিত হলে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে মার্কিন সেনাঘাঁটি সরিয়ে নেওয়া হতে পারে। আর এমনটা হলে তা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সেক্ষেত্রে ওই দেশগুলো পরমাণু বোমা তৈরির দিকে এগোতে পারে।
ভারত-মার্কিন সম্পর্কের ওপর বিশেষজ্ঞ ধ্রুব জয়শঙ্কর বলেন, ‘এটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। আর তা এশিয়ায় চীনা আধিপত্যকে সামনে নিয়ে আসতে পারে।’
তবে জঙ্গিবাদ বিশেষজ্ঞ এবং ট্রাম্পের উপদেষ্টা ওয়ালিদ ফারেজ জানিয়েছেন, নির্বাচনে যে-ই বিজয়ী হ্যোক, ভারতের তাতে চিন্তিত হওয়ার কোনও কারণ নেই।
ফারেজ বলেন, ভারত জঙ্গিবাদ-বিরোধী লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদার। দুটো দেশই শহরাঞ্চলে জঙ্গিবাদ দ্বারা আক্রান্ত। এই দুই পক্ষের মধ্যে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক আবশ্যক।
ট্রাম্পের এক সহায়ক জানিয়েছেন, চলতি বছরের জুলাইয়ে নরেন্দ্র মোদির দফতর ট্রাম্পের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য ছয় সদস্যবিশিষ্ট একটি গবেষণা দল গঠন করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় জনতা পার্টির সমর্থকরা মোদির জন্য দুই প্রেসিডেন্ট পার্থীর সঙ্গেই মোদি সরকারের যোগাযোগের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের সঙ্গে মোদি সরকারের সম্পর্ক তুলনামূলক অধিক আন্তরিক বলে ওভারসিজ ফ্রেন্ডস অব বিজেপির দিল্লিভিত্তিক এক কর্মী জানিয়েছেন।
মোদির ২০১৪ সালের নির্বাচনের সময় পরিচালকের দায়িত্ব পালন করে লন্ডনভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনোজ লাড়ওয়া জানিয়েছেন, ট্রাম্পের বক্তব্য স্ববিরোধী। তিনি বলেন, ‘একদিকে, তিনি (ট্রাম্প) ভারতের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ককে গুরুত্ব দিচ্ছেন। আবার বলছেন, ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদারের সম্পর্ক ঠিক না।’
উল্লেখ্য, সামরিক সহায়তার অংশ হিসেবে ভারতকে সবচেয়ে বড় বিমানবাহী রণতরী নির্মাণের জন্য প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। নৌবাহিনীর বিমান উড্ডয়নের ক্ষেত্রেও উচ্চ প্রযুক্তির সহযোগিতা দেওয়া হবে ভারতকে।
চলতি বছরের জুনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বড় বিমানবাহী রণতরী নির্মাণের জন্য প্রযুক্তিগত সাহায্যের বিষয়ে চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। মোদি সরকারের এক কর্মকর্তা ওই প্রযুক্তিগত সহায়তার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেছেন, ইতোমধ্যে ভারত বিমানবাহী রণতরী নির্মাণের কাজ শুরু করেছে।
আগস্টে মোদি সরকার ওবামা প্রশাসনের সঙ্গে ১০ বছর মেয়াদী একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন। যার ফলে এক দেশের সেনাঘাঁটি অপর দেশ ব্যবহার করতে পারবে। পাশাপাশি আরও দুটি প্রতিরক্ষা চুক্তিও স্বাক্ষর হয়েছে। যার ফলে দেশ দুটি পরস্পরের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আদান-প্রদান করবে।
সূত্র: রয়টার্স।
/এসএ/বিএ/