এমনিতেই সমালোচকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যন্ত্রণাদায়ক পরাজয়ের মুখোমুখি হচ্ছেন নেতানিয়াহু। এমন চিন্তা এরইমধ্যে অনেক ইসরায়েলির মনে গেঁথে গেছে। তারা মনে করছেন, তাদের দেশ এবং ফিলিস্তিনের প্রতি তাদের নীতি দুনিয়াজুড়ে ব্যাপক সমালোচিত হচ্ছে।
এমন বাস্তবতায় নিজের সমর্থকদের জড়ো করতে চাইছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী। তাদের কাছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বসতি স্থাপনবিরোধী প্রস্তাবকে পুরো জেরুজালেমের ওপর ইসরায়েলের দাবিকৃত সার্বভৌমত্বকে একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে উপস্থাপন করতে চান তিনি।
ওয়েস্টার্ন ওয়ালে হানুক্কা হলিডের সফর সমালোচনার মুখে পড়েছে। এই ওয়েস্টার্ন ওয়াল ইহুদিদের পবিত্র স্থাপনাগুলোর একটি। এর অবস্থান পূর্বাঞ্চলীয় সেক্টরে জেরুজালেমের প্রাচীন শহরে। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর পশ্চিম তীরের সঙ্গে এটিরও দখল নেয় ইসরায়েল।
ইসরায়েলিদের সর্বসম্মতভাবে এ ব্যাপারে একমত যে, পুরো জেরুজালেমই ইসরায়েল রাষ্ট্রের রাজধানী। এমনকি এ ব্যাপারে তারাও একমত; পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনে নেতানিয়াহু’র সমর্থনের ব্যাপারে যাদের মধ্যে সন্দেহ-সংশয় রয়েছে।
পূর্ব জেরুজালেমকে নিজেদের রাজধানী দাবি করেন ফিলিস্তিনিরা। ইতোপূর্বে ওয়াশিংটন এটা স্বীকার করে নিয়েছে যে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে, ভবিষ্যৎ শান্তি আলোচনার মাধ্যমেই জেরুজালেম শহরের স্ট্যাটাস নির্ধারিত হবে। ডোনাল্ড ট্রাম্প অবশ্য কয়েক দশক ধরে চলে আসা যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের বিপরীত প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি ইসরায়েলের মার্কিন দূতাবাস তেল আবিবের বদলে জেরুজালেমে স্থানান্তরের ঘোষণা দিয়েছেন।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ‘এই সন্ধ্যায় আমার এখানে থাকার পরিকল্পনা ছিল না। কিন্তু জাতিসংঘের প্রস্তাবের আলোকে আমার মনে হয়েছে, হানুক্কা ক্যান্ডেলের জন্য ওয়েস্টার্ন ওয়ালের চেয়ে অধিকতর ভালো কোনও জায়গা নেই।’
তিনি বলেন, ‘আমি সেসব দেশগুলোকে প্রশ্ন করছি যারা আমাদরে হানুক্কার শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন তারা কিভাবে জাতিসংঘের প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। ওই প্রস্তাব অনুযায়ী এখন আমরা যেখানে হানুক্কা উদযাপন করছি সেটি দখলকৃত ভূখণ্ড?’
পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুজালেমে প্রায় ৫ লাখ ৭০ হাজার ইসরায়েলির বসবাস। এই ভূখণ্ডকে ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের অংশ হিসেবে দেখতে চান ফিলিস্তিনিরা।
রবিবার ইসরায়েলি মন্ত্রিসভার সাপ্তাহিক বৈঠকে জাতিসংঘের ভোটাভুটিতে ইসরায়েলের প্রতি হোয়াইট হাউসের প্রত্যাখ্যানকে ভ্রুক্ষেপ না করার কথা বলেন নেতানিয়াহু। এ সময় তিনি ফের ফিলিস্তিনি জনগণের সঙ্গে অশুভ আঁতাতের জন্য ওবামা প্রশাসনকে অভিযুক্ত করেন।
জাতিসংঘের ওই প্রস্তাব অনুযায়ী, অধিকাংশ দেশই ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকে বেআইনি বলে মনে করে। এমনকি ওয়াশিংটনও এটাকে অবৈধ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
খ্রিস্টানদের ধর্মগ্রন্থ বাইবেলে ইসরায়েলি শহরগুলোর উল্লেখ রয়েছে। নিরাপত্তা উদ্বেগের পাশাপাশি পশ্চিম তীর ও জেরুজালেমের মতো শহরগুলোর ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে।
রবিবার একজন ইসরায়েলি কর্মকর্তা জানান, বসতি স্থাপন নিয়ে জাতিসংঘের প্রস্তাবের পক্ষে যেসব দেশ ভোট দিয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণের আগ পর্যন্ত সেসব দেশ সফর অথবা ওই সব দেশের সঙ্গে কোনও দাফতরিক বৈঠক থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
সোমবার যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল এমএসএনবিসি’র সঙ্গে কথা বলেন ওয়াশিংটনে নিযুক্ত ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত রন ডার্মার। এ সময় তিনি শুক্রবার জাতিসংঘের ভোটাভুটিতে নেপথ্যের কলকাঠি নাড়ানোর জন্য ওবামা প্রশাসনকে অভিযুক্ত করেন। এমন দাবি অবশ্য প্রত্যাখ্যান করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
বড়দিনের ছুটিতে এই কূটনৈতিক নাটক উন্মোচিত হয়ে পড়ে। জটিলতার আবর্তে মোড় নেয় বারাক ওবামা-বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সম্পর্ক। যেখানে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি থেকে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের বিরোধিতা করেন।
শুক্রবার জাতিসংঘের ভোটাভুটির আগের দিন বৃহস্পতিবার সফল লবিং চালান ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তার লবিংয়ের জেরেই জাতিসংঘে প্রথম এ প্রস্তাব তোলা মিসর তার প্রস্তাব থেকে নিরস্ত হয়। জাতিসংঘ থেকে প্রস্তাব তুলে নেয় কায়রো। নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দিয়ে মিসরকে চাপ দিয়ে এই সাফল্য ঘরে তোলেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী।
ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দিয়ে মিসরকে পরাস্ত করতে পারলেও শেষটা ভালো ছিল না নেতানিয়াহু’র। ইসরায়েলি নেতাকে পরাস্ত করে একদিন পরই পুনরায় জাতিসংঘে প্রস্তাবটি উপস্থাপন করা হয়। এবারে প্রস্তাবকারী দেশের তালিকায় মিসরের বদলে আসে নিউজিল্যান্ড, ভেনেজুয়েলা, সেনেগাল এবং মালয়েশিয়া’র নাম।
নতুন করে চার দেশ ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতি স্থাপন বন্ধের প্রস্তাব তোলার পর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ১৪-০ ভোটে এটি পাস হয়। ভোটদানে বিরত থাকে ইসরায়েলের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র। সচরাচর ইসরায়েলবিরোধী যে কোনও প্রস্তাবেই ভেটো দিয়ে থাকে ওয়াশিংটন। তবে এদিন আর সে পথে হাঁটেনি ওবামা প্রশাসন। এটাকে ব্যাপকভাবে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তার বসতি স্থাপন পরিকল্পনার সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা’র বিচ্ছেদ হিসেবে দেখা হয়।
ত্বরিত নির্মাণ:
একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানান, ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তের পেছনে একটা বড় উদ্বেগ কাজ করেছে। এটা ছিল দখলকৃত ভূখণ্ডে ইসরায়েল ত্বরিত নির্মাণ প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে পারে। এতে ফিলিস্তিনের সঙ্গে চলমান সংঘাতের বাস্তবতায় দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের বিষয়টি ঝুঁকিতে পড়তে পারে। ইসরায়েলের অবৈধ বসতি স্থাপনবিরোধী এ প্রস্তাবটি শুক্রবার জাতিসংঘে পাস হয়। তবে এতে এ ইস্যুতে নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থানে কোনও পরিবর্তন দৃশ্যমান নয়। আসন্ন ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন হয়তো বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে।
ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের ভয়ের কারণ হচ্ছে, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে এ প্রস্তাব পাসের ফলে বিষয়টি ফিলিস্তিনিদের অন্যান্য আন্তর্জাতিক ফোরামেও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে অনুপ্রাণিত করবে।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাব পাসের পর ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু’র দফতর থেকে একটি বিবৃতি পাঠানো হয়। এতে বলা হয়, ‘ইসরায়েল এই লজ্জাকর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করছে। এর কোনও শর্ত মানতে আমরা বাধ্য নই।’ জাতিসংঘে ইসরায়েলি দূত ড্যানি ড্যানন বলেন, তাদের সরকার আশা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র এই প্রস্তাবে ভেটো দেবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নতুন মার্কিন প্রশাসন এবং জাতিসংঘের নতুর মহাসচিব এসে নতুন কিছু করবেন।
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, ওবামা প্রশাসন একটি লজ্জাজনক ও অশুভ আঁতাতের পথ বেছে নিয়েছে।
এমন মন্তব্য ছিল বারাক ওবামা’র প্রতি বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু’র সবচেয়ে কঠোর সমালোচনাগুলোর একটি। ২০০৯ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম মধ্যপ্রাচ্য সফরেও ইসরায়েলকে সফর তালিকা থেকে বাদ রেখেছিলেন ওবামা।
২৩ ডিসেম্বর ২০১৬ তারিখে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে অবৈধ ইসরায়েলি বসতি স্থাপন বন্ধের ওই প্রস্তাব পাসের পর এতে সমর্থন দেওয়া দেশগুলোর বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে ইসরায়েল। এ দেশগুলোর মধ্যে যাদের সঙ্গে ইসরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে এমন সবকটি দেশের ইসরায়েলে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতদের তলব করে তেল আবিব। এর আওতায় বসতি স্থাপন বন্ধের প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেওয়া ১০টি দেশ এবং ভোটদানে বিরত থাকা যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতকে তলব করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি তলব করা হয়েছে যুক্তরাজ্য, চীন, রাশিয়া, ফ্রান্স, জাপান, মিসর, উরুগুয়ে, স্পেন, ইউক্রেন ও নিউজিল্যান্ডের রাষ্ট্রদূতকে।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু’র কোয়ালিশন সরকারে রয়েছে দেশটির কট্টর ইহুদিবাদী বা অতি জাতীয়তাবাদী দল ‘জিউশ হোম’। তিনি ইসরায়েলের সংবাদমাধ্যমগুলোকে বামপন্থী ও ‘দেশপ্রেমিক নয়’ এমনভাবে আখ্যায়িত করে থাকেন।
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তার ফেসবুক পেজে লিখেছেন, ‘বামপন্থী রাজনৈতিক দল এবং টেলিভিশন ভাষ্যকাররা জাতিসংঘের ইসরায়েলবিরোধী সিদ্ধান্তে উচ্ছ্বসিত। এটা প্রায় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এবং হামাসের মতোই’।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আগামী ১৫ জানুয়ারি ৭০টি দেশের অংশগ্রহণে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে একটি সম্মেলন শুরুর কথা রয়েছে। ২০ জানুয়ারি ইসরায়েলপন্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র পাঁচদিন আগে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
২৫ ডিসেম্বর রবিবার ইসরায়েলের নিরাপত্তা সংক্রান্ত মন্ত্রিসভার অধিবেশনে উপস্থিত থাকা দেশটির একজন কর্মকর্তা জানান, ’২০ জানুয়ারির আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের পদক্ষেপের ব্যাপারে নেতানিয়াহু শঙ্কিত। ফ্রান্সের শান্তি আলোচনা হয়তো একটি ঘোষণামূলক ধাপ হতে পারে।’
/এমপি/