‘ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে’ ইসরায়েলের নতুন মৃত্যুদণ্ডের বিধান

‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে’র বিচারে মৃত্যুদণ্ড প্রদানের বিধান সহজ করতে নতুন প্রস্তাব করেছে ইসরায়েলি সরকার। এই প্রস্তাবকে ‘ফ্যাসিবাদী’ অ্যাখ্যা দিয়ে তার নিন্দা জানিয়েছেন ফিলিস্তিনি রাজনীতিক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো। প্রস্তাবটি পাস হলে ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য বানানোর বৈধতা পেয়ে যাবে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এ খবর জানিয়েছে।

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু

বুধবার ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটে মৃত্যুদণ্ডের বিধান সংক্রান্ত একটি বিদ্যমান আইন সংশোধনের জন্য প্রাথমিক পাঠ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু’র নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন জোট আইনটির প্রস্তাব করেছে। ইসরায়েলি পার্লামেন্টের সদস্য ও ফিলিস্তিনি নাগরিক আইদা তোওমা সুলেইমান আল জাজিরাকে বলেন, এই বিলে কোনও নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর কথা উল্লেখ করা হয়নি। এটা মূলত ফিলিস্তিনি জনগণের জন্যই করা হয়েছে।

বিলটির লেখককে ‘চরম ডানপন্থী’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘নিশ্চিতভাবে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সন্ত্রাসী হামলাকারী ইহুদির বিরুদ্ধে এটা ব্যবহার করা হবে না। এটা একটা ফ্যাসিবাদী বিল, এটা ইসরায়েলি সমাজের মধ্যে ফিলিস্তিনিদের প্রতি ফ্যাসিবাদী মনোভাব ছড়িয়ে দেবে।’

বিদ্যমান আইনের আওতায় ইসরায়েলি বেসামরিক আদালত নাৎসি ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ প্রমাণ হলে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে থাকে। তবে সামরিক আদালতে তিন বিচারকের একটি বেঞ্চ সর্বসম্মতিক্রমে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিলেই কেবল তারা কাউকে মৃত্যুদণ্ড দিতে পারবে।

প্রস্তাবিত পরিবর্তনের মাধ্যমে ইসরায়েলি আইনে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে’র অভিযোগে যে কাউকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যাবে। বিলে ‘রাজনৈতিক, জাতীয়, ধর্মীয় অথবা আদর্শিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য’ ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক নাগরিকদের হত্যার চেষ্টা করা হলে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যাবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। নতুন আইনে সামরিক আদালতের সর্বসম্মত রায়ের পরিবর্তে দুই-এক ব্যবধানে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডও বেসামরিক আদালতে উত্থাপন করে মৃত্যুদণ্ডের আবেদন করা যাবে।

ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেট

২০১৫ সালে পশ্চিম তীরের দুমা গ্রামের এক ইহুদির আক্রমণে এক বছরের এক শিশুসহ তিনজন নিহত হয়। ওই ঘটনা উল্লেখ করে ফিলিস্তিনি নেসেট সদস্য আহমাদ তিবি নেতানিয়াহুকে জিজ্ঞেস করেন, ‘যারা দুমায় শিশু পুড়িয়ে মেরেছে’ তাদের মতো ইহুদি হামলাকারীদের উপর এই আইন প্রয়োগ করা হবে কিনা। জবাবে নেতানিয়াহু বলেন, নৈতিকভাবে ‘হ্যাঁ’। 

ইসরায়েলে আটককৃত ফিলিস্তিনি কারাবন্দীদের আইনজীবী ও মানবাধিকার সংগঠন আদামিরের সদস্য দাঊদ ইউসেফ নেতানিয়াহুর ওই কথায় সন্দেহ প্রকাশ করেন। নেতানিয়াহুর জোটের চরম ডানপন্থী মিত্র ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী আভিগদোর লাইবারম্যানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা দেখেছি তিনি নেতানিয়াহুর জোটের ঢোকার শর্ত হিসেবে এই উদ্যোগ নিতে চাপ দিচ্ছিলেন। তিনি বের হয়ে এসে বলেছেন এটা শুধু আরবদের উপর প্রয়োগ করবেন। যখন আরব বলা হয়, তখন ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিক ও পশ্চিমতীর ও গাজার ফিলিস্তিনিদেরেই বোঝানো হয়।’

ইউসেফ বলেন, ‘যদি বিলটি পাস হয় তাহলে এটা আমাদের জন্য পিচ্ছিল খাড়াইয়ের মতো হবে। এটাকে আমরা ইসরায়েলি সরকারের চরম কৌশল হিসেবে দেখছি। আমরা এখনকার পরিস্থিতি বুঝতে পারছি না এটা কোথায় গিয়ে থামবে।’

গত ৬ ডিসেম্বর জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্বীকৃতি দিলে ফিলিস্তিনিদের ইন্তিফাদা বা সর্বাত্মক প্রতিরোধ শুরু হয়েছে। ৮ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া ইন্তিফাদায় ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় অন্তত ১৬ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নারী ও শিশুসহ গ্রেফতার করা হয়েছে ৬২০ জনকে। এমনকি ছোট শিশুদের ধরে নিয়ে খাঁচায় বন্দি করে রাখার মতো বর্বরোচিত ঘটনাও ঘটেছে।

প্যালেস্টাইনিয়ান প্রিজনার্স ক্লাব (পিপিসি)-এর হিসাবে, ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে গ্রেফতারকৃত ফিলিস্তিনিদের মধ্যে ১২ জন নারী এবং ১৭০ শিশুও রয়েছে। এছাড়া আহত অবস্থায় তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।