পুলিশি হেফাজতে বিক্ষোভকারীর মৃত্যুতে ইরানে উদ্বেগ

ইরানে ঢালাওভাবে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের গ্রেফতারের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছেন মানবাধিকারকর্মীরা। তেহরানের কুখ্যাত জেলে বন্দি বিক্ষোভকারীর মৃত্যুর পর অন্য বন্দিদের পরিণতি কী হবে তা নিয়ে উদ্বেগ জোরালো হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে এক বন্দির মৃত্যুর কথা জানানো হলেও মানবাধিকারকর্মীদের দাবি, তারা অন্তত তিন বন্দির মৃত্যুর ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছেন। শঙ্কা ও উদ্বেগে থাকা কয়েকজন মানবাধিকারকর্মীকে উদ্ধৃত করে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান খবরটি জানিয়েছে।

ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ
মৌলিক খাদ্য দ্রব্যগুলোর দাম বৃদ্ধি এবং নতুন বছরের বাজেটে জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধির সরকারি প্রস্তাবের বিরোধিতা করে ২৮ ডিসেম্বর ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদে বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে তা তেহরান ও অন্যান্য শহরে ছড়িয়ে পড়ে। সরকারি হিসেব অনুযায়ী, বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত ২১ জন নিহত হয়েছে। নিহতদের বেশিরভাগই বিক্ষোভকারী। এই পর্যন্ত এক হাজারেরও বেশি মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে, এর মধ্যে ৯০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে।

ইরানের সংস্কারপন্থীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা থাকা দুই পার্লামেন্ট সদস্য সোমবার এক বন্দির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, এভিন কারাগারে সিনা ঘানবারি নামের ওই বন্দি মারা গেছেন। তেহরান থেকে টেলিফোনে মানবাধিকারকর্মী নাসরিন সোতৌদেহ গার্ডিয়ানকে জানিয়েছেন, অন্তত আরও দুই বিক্ষোভকারী জেলে মারা গেছেন। তাদেরকে এখনও শনাক্ত করা যায়নি।

সোতৌদেহ বলেন, ‘এভিন কারাগারে আমি এক বন্দির সঙ্গে কথা বলেছি। আমাকে বলা হয়েছিল তিন বন্দির প্রাণহানি হয়েছে। কর্তৃপক্ষ যখন ঢালাও গ্রেফতারকে বেছে নিয়েছেন তখন তারা তাদের (বিক্ষোভকারীদের) অধিকার রক্ষা করছে বলে দাবি করতে পারে না। এই পরিস্থিতিতে যথাযথ সময়ে বিচার প্রক্রিয়া শেষ করা যায় না।’

সরকার পক্ষের দাবি, ঘানবারি আত্মহত্যা করেছেন। তবে সরকারের এই দাবির ব্যাপারে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন মানবাধিকারকর্মীরা। ইরানের স্টোর ফর হিউম্যান রাইটসের নির্বাহী পরিচালক হাদি ঘায়েমি দাবি করেন, ঘানবারির মৃত্যুর পর হাজারো বন্দির পরিণতি কী হতে যাচ্ছে তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। তিনি বলেন, ‘কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে ঘানবারি আত্মহত্যা করেছে কিন্তু একটি স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্ত ছাড়া তাদের এই দাবির কোনও বিশ্বাসযোগ্যতা নেই।’

ইরানি অভিনেতা মাহনাজ আফসারও ঘানবারি হত্যার প্রতিবাদ জানিয়েছেন। টুইটারে তিনি লিখেছেন: ‘এভিন কারাগারে ২৩ বছর বয়সী তরুণের মৃত্যু নিয়ে কোনও বাহানা চলবে না।’

ইরানের সরকারবিরোধী বিক্ষোভ
গোপন আটককেন্দ্রগুলোর ব্যবহার নিয়েও সোতৌদেহ উদ্বেগ জানিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে মাহমুদ আহমদিনেজাদের পুনর্নির্বাচিত হওয়াকে কেন্দ্র করে ২০০৯ সালে বিক্ষোভ চলার সময় একটি আটককেন্দ্র সবার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল। কাহরিজাক নামের ওই আটককেন্দ্রে কয়েকজন বিক্ষোভকারীর ওপর যৌন নিপীড়ন চালানো ও নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। বিক্ষোভকারীদের নিরাপত্তা হেফাজতে হত্যার অভিযোগও উঠেছিল সেসময়।

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, সাম্প্রতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে যেন কাহরিজাকের মতো পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি না ঘটে তা নিয়ে কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করেছেন সংস্কারপন্থী রাজনীতিবিদরা। মাহমুদ সাদেঘি নামের সংস্কারপন্থী এমপি বলেন, ‘দ্বিতীয় কাহরিজাকের পুনরাবৃত্তি নিয়ে আমি প্রেসিডেন্ট, গোয়েন্দা ও বিচারিক কর্মকর্তাদেরকে সতর্ক করেছি।’

সোতৌদেহ জানান, যখন অনেক মানবাধিকার আইনজীবীকে বন্দি করে রাখা হয়েছে কিংবা নির্বাসিত রাখা হয়েছে তখন এই সময়ে বন্দিদের আইনগত প্রতিনিধিত্ব কে করবেন তা নিয়েও তিনি উদ্বিগ্ন।