সিরিয়ায় গণহত্যা বন্ধের আহ্বান জানিয়ে খোলা চিঠি

সিরিয়ায় গণহত্যা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন দুনিয়ার নানা প্রান্তের দুই শতাধিক শিল্পী, সাহিত্যিক ও মানবাধিকার কর্মী। এক খোলা চিঠিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারগুলোর প্রতি এ আহ্বান জানান। মঙ্গলবার মার্কিন অনলাইন ‘নিউ ইয়র্ক রিভিউ অব বুকস’-এ চিঠিটি প্রকাশিত হয়। এতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে সিরিয়া, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্কের নাগরিকরাও রয়েছেন। এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা।

nonameচিঠিতে বলা হয়, জাতিসংঘ বলছে সিরিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে তাদের আর বলার মতো কোনও ভাষা নেই। কিন্তু আমরা মনে করি এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এখনও কিছু করণীয় রয়েছে। অবরুদ্ধ পূর্ব ঘৌটায় রাশিয়ার যুদ্ধবিমানের সহায়তায় হামলা চালিয়ে যাচ্ছে সিরিয়ার সেনাবাহিনী। ইতোমধ্যেই জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্রের তরফে সামরিক অভিযান বন্ধের কথা বলা হয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্টোনিও গুতেরেস পূর্ব ঘৌটার পরিস্থিতিকে ‘দুনিয়ার জাহান্নাম’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

গণহত্যা প্রতিরোধ করা এবং মানুষের জীবন বাঁচাতে জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন শিল্পী-সাহিত্যিকরা।

চিঠিতে বলা হয়, সিরিয়ার এই ধ্বংসযজ্ঞ প্রতিরোধযোগ্য ছিল। এখন শুধু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াতেই এটা থামানো সম্ভব।

noname

জাতিসংঘের ফাঁস হওয়া এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বিবিসি জানিয়েছে, রাসায়নিক অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহৃত হয় এমন উপকরণ সিরিয়ায় পাঠাচ্ছে উত্তর কোরিয়া। ২০১২ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে এ রকম প্রায় ৪০টি চালান পাঠানো হয়েছে।

১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ তারিখে বিদ্রোহী অধ্যুষিত পূর্ব ঘৌটায় বিমান হামলা শুরু করে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট জেনারেল বাশার আল আসাদের অনুগত বাহিনী। মেডিসিন স্যান্স ফ্রন্টিয়ার্স জানিয়েছে, ১০ দিনে আসাদ বাহিনীর হামলায় ৭০০-এরও বেশি মানুষ নিহতের খবর পাওয়া গেছে। একই সময়ে আহত হয়েছেন তিন হাজার ৭০০ মানুষ।

এদিকে জাতিসংঘের অস্ত্রবিরতি ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মানবিক বিরতির ঘোষণার মধ্যেও ঘৌটায় বিমান হামলা অব্যাহত রেখেছে দেশটির প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের অনুগত বাহিনী।noname

সিরিয়ায় আসাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক রাশিয়া ও ইরান। ঘৌটায় আসাদ বাহিনীর ব্যাপক হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিন্দার মুখে অঞ্চলটিতে প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত ৫ ঘণ্টার মানবিক বিরতির ঘোষণা দেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। এছাড়া সেখানে অস্ত্রবিরতির ঘোষণা দিয়েছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ। তবে এসবের তোয়াক্কা না করেই হামলা অব্যাহত রেখেছে রাশিয়ার মিত্র প্রেসিডেন্ট আসাদের অনুগত বাহিনী।

উদ্ধার তৎপরতায় যুক্ত সিরিয়ার স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা হোয়াইট হেলমেটস-এর মুখপাত্র মাহমুদ আদম। আল জাজিরাকে তিনি বলেন, মঙ্গলবার দৌমা ও হারাস্তা এলাকায় সিরিয়ার জঙ্গিবিমান থেকে কয়েক দফা হামলা চালানো হয়। দৌমায় এক নারীসহ দুইজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও অনেকে।

noname

স্থানীয় বাসিন্দা আলা আল আহমেদ আল জাজিরাকে বলেন, স্থানীয় সময় মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে হামলা শুরু হয়। পুতিনের ‘মানবিক বিরতি’ শুরু হওয়ার ৩০ মিনিটের মাথায় এ হামলা চালানো হলো। মানুষ কিভাবে রাশিয়ার ওপর আস্থা রাখবে? এটা স্ববিরোধীতা।

আলা আল আহমেদ বলেন, আজ সকালে যা ঘটেছে তা অস্ত্রবিরতির পরিষ্কার লঙ্ঘন। ওই অস্ত্রবিরতি নিছক প্রপাগান্ডা মাত্র।

এর আগে সোমবার বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত পূর্ব ঘৌটায় আসাদ বাহিনীর বিমান হামলায় রাসায়নিক গ্যাস ব্যবহারের অভিযোগ তোলে হোয়াইট হেলমেটস-এর স্বাস্থ্যকর্মীরা। সংস্থাটি বলছে, সেখানে ক্লোরিন গ্যাস ব্যবহার করা হয়েছে। এ মাসের ৫ তারিখেও আসাদ বাহিনীর বিরুদ্ধে রাসায়নিক হামলার অভিযোগ উঠেছিল।

noname

ইতোপূর্বে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক রাসায়নিক অস্ত্র নিরস্ত্রীকরণ সংস্থার যৌথ তদন্তে প্রমাণিত হয়, আসাদ সরকার ২০১৪ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে অন্তত তিন দফায় নিজ দেশের নাগরিকদের ওপর ক্লোরিন হামলা চালিয়েছে। এছাড়া গত এপ্রিলে আসাদ বাহিনীর সারিন গ্যাস হামলায় নিহত হন ৮০ জনেরও অধিক ব্যক্তি। তবে সরকারিভাবে বরাবরই রাসায়নিক হামলার খবর অস্বীকার করে আসছে সিরিয়া। এসব হামলার জন্য উল্টো বিদ্রোহীদেরই দায়ী করছে তারা।

পূর্ব ঘৌটায় প্রায় চার লাখ মানুষের বসবাস। ২০১৩ সাল থেকে এলাকাটি বিদ্রোহীদের দখলে রয়েছে। রাজধানী দামেস্কের কাছে অবস্থিত এটিই সর্বশেষ এলাকা, যেটি বিদ্রোহীদের দখলে রয়েছে। এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ নিতে এ মাসের শুরুর দিকে অভিযান জোরালো করে আসাদ বাহিনী। এতে দেড় শতাধিক শিশুসহ ৫৪০ জন নিহত হন। আহত হন আরও কয়েক হাজার বাসিন্দা।

noname

১ হাজার ২৪৪ সম্প্রদায়ের ৫৬ লাখ মানুষের মানবিক সহায়তার স্বার্থের কথা উল্লেখ করে নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধবিরতির একটি খসড়া প্রস্তাব আনে কুয়েত ও সুইডেন। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দুনিয়ার সঙ্গে আসাদের মিত্র রাশিয়ার বিরোধে সেই প্রস্তাব নিয়ে ভোটাভুটি পিছিয়ে যায় একাধিক বার। সর্বশেষ ২৪ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে সিরীয় অস্ত্রবিরতির প্রস্তাব অনুমোদন পায়। ত্রাণ ও চিকিৎসা সরবরাহে ৩০ দিনের অস্ত্রবিরতির ব্যাপারে একমত হয় সংস্থাটির স্থায়ী-অস্থায়ী ১৫ সদস্য রাষ্ট্রই। তবে দৃশ্যত এই অস্ত্রবিরতির তোয়াক্কা করছে না আসাদ বাহিনী। এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে রাশিয়ার সহায়তায় বিদ্রোহী অধ্যুষিত এলাকাটিতে বিমান হামলা অব্যাহত রেখেছে সিরিয়ার সরকারি বাহিনী। সূত্র: আল জাজিরা, বিবিসি মিডল ইস্ট মনিটর।