সৌদি যুবরাজ ও দেশটির ডি ফ্যাক্টো নেতা মোহাম্মদ বিন সালমান বলেছেন, বহু বিষয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদি আরবের অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য আটলান্টিককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এই বিস্ফোরক মন্তব্য করেন। একইসঙ্গে তিনি ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে জন্ম নেওয়া ইসরায়েল রাষ্ট্রের অস্তিত্বের অধিকারের পক্ষে নিজের অবস্থানের কথা জানান। তিনি বলেন, ফিলিস্তিনিদের পাশাপাশি ইসরায়েলিদেরও তাদের নিজেদের ভূমিতে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাসের ‘অধিকার’ রয়েছে।
দ্য আটলান্টিকের জন্য ৩২ বছর বয়সী যুবরাজের সাক্ষাৎকারটি নেন সংবাদমাধ্যমটির প্রধান সম্পাদক জেফরি গোল্ডবার্গ।
সাক্ষাৎকারে এমবিএস নামে পরিচিত সৌদি যুবরাজ বলেন, আয়তনের তুলনায় ইসরায়েল একটি বৃহৎ অর্থনীতি। এটি একটি ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির দেশ। শান্তি বজায় থাকলে উপসাগরীয় সহযোগিতা কাউন্সিলে (জিসিসি) থাকা মিসর ও জর্ডানের মতো অন্য দেশগুলোও তেল আবিবের ব্যাপারে আগ্রহী হবে।
তিনি বলেন, একটি শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্রে যে কোনও মানুষের বসবাসের অধিকার রয়েছে। আমার বিশ্বাস, নিজেদের ভূমির ওপর ফিলিস্তিনি এবং ইসরায়েলিদের অধিকার রয়েছে। এখন একটি শান্তিচুক্তি প্রয়োজন, যাতে সব পক্ষই স্থিতিশীল ও স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে।’
মোহাম্মদ বিন সালমান বলেন, ‘আমাদের আগ্রহের কেন্দ্রে রয়েছে আল আকসা মসজিদের ধর্মীয় গুরুত্ব এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকারের বিষয়টি। অন্য কারও বিষয়ে আমাদের কোনও অভিযোগ নেই।’
ইহুদি বিদ্বেষের বিরোধিতা করে তিনি বলেন, এমনকি ইসলামের নবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন ইহুদি নারীকে বিয়ে করেছিলেন।
উল্লেখ্য, আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলকে সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকার করে না সৌদি আরব। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশের সম্পর্কের যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে খবর বেরিয়েছে। দুই দেশের সম্পর্কোন্নয়নের ধারাবাহিকতায় সৌদি আকাশসীমা ব্যবহার করে ইসরায়েল-ভারতের সরাসরি বিমান চলাচলের অনুমতি দেয় সৌদি কর্তৃপক্ষ। এর মধ্য দিয়ে ইসরায়েলে ফ্লাইট পরিচালনায় নিজেদের আকাশসীমা ব্যবহারে কয়েক দশকের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় রিয়াদ।
সৌদি আরবের সঙ্গে ইসরায়েলের গোপন যোগাযোগের বিষয়টি নতুন করে প্রকাশ্যে আসে ২০১৭ সালে। ওই বছরের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা সিআইএ প্রধান মাইক পম্পেও জানিয়েছিলেন, ইসরায়েলি প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠকের ভয় অনেক আগেই দূর হয়েছে সৌদি অভিজাতদের। সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধে সৌদি আরবসহ বেশ কয়েকটি সুন্নি রাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি কাজ করছে। এর আগে ইসরায়েলের জ্বালানিমন্ত্রী ইয়ুভাল স্টেইনিৎজ এক রেডিও সাক্ষাৎকারে নিশ্চিত করেছিলেন, সৌদি আরবের সঙ্গে ইসরায়েলের একাধিক চুক্তি রয়েছে। কিন্তু রিয়াদের অনুরোধে গোপন রাখা হয়েছে।
চলতি মাসের গোড়ার দিকে যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের বেশিরভাগ দেশ জানে ইসরায়েল তাদের শত্রু নয়, বরং অভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ইসরায়েল তাদের অপরিহার্য মিত্র।
ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের অন্যতম কারিগর মনে করা হয় ট্রাম্পের জামাতা ও হোয়াইট হাউসের উপদেষ্টা ইহুদি ধর্মাবলম্বী জ্যারেড কুশনারকে। জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী ঘোষণার প্রতিবাদে তুরস্কে ওআইসি শীর্ষ সম্মেলনে বিভিন্ন মুসলিম দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা অংশ নিলেও সৌদি আরবের শীর্ষস্থানীয় পর্যায়ের কেউ এতে অংশ নেননি। সৌদি সংবাদমাধ্যমগুলোতে জেরুজালেম সংক্রান্ত খবর প্রকাশে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। জর্ডানে থাকা সৌদি নাগরিকদের প্রতি নির্দেশনা দেওয়া হয়, ট্রাম্পের ওই ঘোষণার প্রতিবাদে জর্ডানে আয়োজিত কোনও বিক্ষোভে যেন তারা অংশ না নেন। পূর্ব জেরুজালেমের বদলে আবু দিস নামের একটি শহরকে রাজধানী হিসেবে বেছে নিতে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে ফিলিস্তিনকে চাপ দেওয়ার খবরও বেরিয়েছে।
এ বছরের জানুয়ারিতে মার্কিন সাংবাদিক মাইকেল উলফের বইয়ের বরাত দিয়ে বিবিসি’র খবরে বলা হয়, মোহাম্মদ বিন সালমান সৌদি যুবরাজ হওয়ার পর ট্রাম্প এর কৃতিত্ব দাবি করেছিলেন। বন্ধুদের ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি এবং তার জামাতা জ্যারেড কুশনার সৌদি আরবে একটি 'অভ্যুত্থানের পেছনে' কলকাঠি নেড়েছেন। ট্রাম্পের ভাষায়, ‘আমরা আমাদের একজন লোককে শীর্ষ পদে বসিয়েছি।’ সূত্র: দ্য আটলান্টিক, আল জাজিরা।