আসামের নাগরিক তালিকা কি বিজেপিকে লাভবান করেছে?

আসামে জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (এনআরসি) তালিকা প্রকাশের পর এখন অনেকটাই স্বস্তিতে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ও ক্ষমতাসীন জোটের প্রধান শরিক বিজেপি। তারা মনে করছে, সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করে নাগরিকদের তথ্য যাচাই ও তালিকা প্রকাশ করার মধ্য দিয়ে প্রশাসনিক বাধ্যবাধকতার শর্ত পূরণে সমর্থ হয়েছে তারা। তালিকা প্রকাশকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কা থাকলেও তা ঠেকানো সম্ভব হয়েছে। এর মধ্যদিয়ে আসামের জনগণকে দেওয়া রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা গেছে বলেও মনে করছে বিজেপি। তালিকায় না থাকা ৪০ লাখ অধিবাসীর ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তাদের বৈধতা-অবৈধতা নিষ্পত্তির প্রশ্ন একটি দীর্ঘসূত্রতার বিষয়। এদের মধ্যে যারা বাংলাদেশি, দীর্ঘসূত্রতার কারণে তাদের এক্ষুণি বিতাড়ন করতে হচ্ছে না। এই কৌশলটি আঞ্চলিক মিত্র বাংলাদেশের বর্তমান শাসক দলের সঙ্গে বিজেপির মৈত্রী জোরালো করবে বলেও মনে করছে দলটি। সব মিলে বিজেপির ধারণা, তালিকা প্রকাশের মধ্য দিয়ে প্রশাসনিক বাধ্যবাধকতা, রাজনৈতিক চাহিদা ও কূটনৈতিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে যথাযথ ভারসাম্য আনতে সক্ষম হয়েছে তারা। কেন্দ্রীয় সরকার ও বিজেপি সংশ্লিষ্ট তিন সূত্রকে উদ্ধৃত করে দেশটির সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস এসব কথা জানিয়েছে। তবে বিশ্লেষকরা এতে একমত নন। তারা মনে করছেন, আসামের নাগরিক তালিকা কোনও দলের জন্যই ইতিবাচক রাজনৈতিক ফলাফল নিয়ে আসতে সমর্থ হবে না।

তালিকায় নাম আছে কিনা জানতে লাইন ধরে দাঁড়ায় আসামের মানুষ (৩০ জুলাইয়ের ছবি)
সোমবার দুপুরে আসামের রাজধানী গোহাটি থেকে রেজিস্ট্রার জেনারেল অব ইন্ডিয়া চূড়ান্ত জাতীয় নাগরিকত্ব নিবন্ধন তালিকা উন্মুক্ত করেন। নিবন্ধনের জন্য আবেদন করা ৩ কোটি ২৯ লাখ অধিবাসীর মধ্যে ২ কোটি ৮৯ লাখকে চূড়ান্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।  রয়টার্স নিবন্ধন-সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, ৪০ লাখ ৭ হাজার ৭০৭ জন তালিকায় স্থান পায়নি। নাম প্রকাশ না করে সংশ্লিষ্ট এক সরকারি কর্মকর্তা হিন্দুস্তান টাইমসকে বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্ট রায় দেওয়ায় এবং সেখান থেকে কোনও ধরনের ছাড় দিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করায় আমাদের কাজটি শেষ করতে হয়েছে। এতে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা ছিল। তবে মাত্রা বিবেচনায় এ প্রক্রিয়া ছিল যতটা সম্ভব মসৃণ। পরবর্তী কয়েকদিনে পরিস্থিতি আরও স্বাভাবিক হয়ে যাবে। যারা তালিকায় নিজেদের নাম পায়নি, তারা উদ্বিগ্ন হতে পারে। কিন্তু তাদের এটা জানা প্রয়োজন এখানেই সবকিছু শেষ হয়ে যায়নি।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আসাম বিজেপির এক গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিন্দুস্তান টাইমসকে বলেন, ‘তালিকা প্রকাশে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা ছিল ঠিকই, তবে এসব ক্ষেত্রে সরকারের বিলম্ব করার নজির অপ্রতুল নয়। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে অবৈধ অভিবাসী ইস্যুটি আমাদের মূল ইস্যু ছিল। আসামে বিজেপির সামগ্রিক অস্তিত্ব এই ইস্যুর ওপরই নির্ভর করছে। আমরা এ প্রক্রিয়াটি নিশ্চিত করব। আমরা অবশ্যই এই দিকটার ওপর জোর দেবো।’ তিনি আরও বলেন, ‘এটি একটি প্রতীকী পদক্ষেপ। একদিক থেকে আমরা তা প্রমাণ করেছি। আমরা জানি, তালিকায় নাম না থাকাদের প্রত্যেককে আমরা সাগরে ঠেলে দিতে পারি না। মাঝামাঝি একটি জায়গা আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। যেসব এলাকায় তাদের উপস্থিতি আছে সেখানে তাদের চলাফেরা ও কাজের অনুমতি সীমিত করা যেতে পারে।'

আরেক বিজেপি নেতা নাম প্রকাশ না করে বলেন, আসামে নির্বাচনের জন্য যথেষ্ট সংখ্যক সমর্থন নিশ্চিত হয়ে গেছে। জনগণকে বার্তা দেওয়া গেছে যে, অ-অসমীয়দের প্রণোদনা দেওয়ার যে সিদ্ধান্ত ছিল, সেটি বদলে গেছে। ‘শুরুতে জনগণের কাছে এই বার্তা পৌঁছেছিল যে বহিরাগতদের ভোটব্যাংক হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং তাদের প্রণোদনা দেওয়া হবে। এখন এটা প্রতিষ্ঠিত যে তারা কোনও প্রণোদনা পাবে না এবং রাজ্য ও আইন-কানুনকে মোকাবিলা করতে হবে। আসামসহ দেশের বাকি জায়গাগুলোতে আমাদের ভোটাররা এমনটাই চেয়েছিল’- বলেন দ্বিতীয় বিজেপি নেতা।

আসামবাসী
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সেই সরকারি কর্মকর্তা বলেন, ‘এক মাসের মধ্যে তালিকা নিয়ে আপত্তি ও নাগরিকত্বের দাবি তোলা শুরু হবে। যারা মনে করবে তাদের নাম ভুল করে মুছে ফেলা হয়েছে এবং যারা ভাববে নাম ভুল করে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে- তারা সবাই আবেদন জানাতে পারবেন। এটি একটি সুদীর্ঘ প্রক্রিয়া। সবশেষে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে। এরপর যারা একে চ্যালেঞ্জ করতে চাইবে তারা ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল ও আদালতের শরণাপন্ন হতে পারেন। সে সময় পর্যন্ত তাদের কোনোভাবে বিদেশি কিংবা নাগরিকত্ববিহীন বলে বিবেচনা করা হবে না।’ পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে অনেক সময় লাগবে; জানান ওই সরকারি কর্মকর্তা। আর এ দীর্ঘায়িত সময়ের বিষয়টি সরকারকে স্বস্তি দেবে বলে মনে করছেন তিনি। কারণ, চূড়ান্তভাবে যদি অবৈধদের তালিকা প্রকাশ করা হতো, তাহলে তাদের বিতাড়নের জন্য চাপ বাড়ত এবং তা সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে পারত। ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘সত্যিকার অর্থে তাদের বিতাড়িত করাটা আমাদের উদ্দেশ্য নয়।’ তার মতে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিগগিরই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন এবং ভারত তাকে মিত্র বিবেচনা করে। ভারত আশা করে শেখ হাসিনা নির্বাচনে জয়ী হবেন। তার জন্য জটিল হয় এমন কোনও পরিস্থিতি তারা তৈরি করবে না। ‘কী করতে হবে তার সমাধান শেষ পর্যন্ত অসমীয় সমাজ থেকেই আসতে হবে। এ নিয়ে এখনই তাড়াহুড়ো নেই।’ বিজেপি মনে করছে, এই ধীরগতির পদক্ষেপ তাদের রাজনৈতিকভাবে লাভবান করবে এবং ২০১৯ সালে আসামে লোকসভা নির্বাচনে মুখ্য ভূমিকা পালন করবে। অন্যান্য জায়গায়ও সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিজেপির জন্য একটি চ্যালেঞ্জ থেকেই যাচ্ছে। তালিকায় নাম না থাকা ৪০ লাখ অধিবাসীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হিন্দু রয়েছে। বিশেষ করে বারাক ভ্যালির বাংলাভাষী হিন্দুরা রয়েছেন। বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, তালিকা থেকে নাম বাদ পড়াদের এক-চতুর্থাংশ বাংলাভাষী হিন্দু। 

বিজেপির প্রতীক
সাক্ষাৎকার প্রদানকারী প্রথম বিজেপি নেতা বলেন, ‘সে কারণে নাগরিকত্ব সংশোধন বিলের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এনআরসি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করাটা আমাদের জন্য জরুরি। আসামের জনগণকে রাজনৈতিক শরণার্থী ও অর্থনৈতিক অভিবাসীর মধ্যে পার্থক্য না বোঝাতে পারা পর্যন্ত আমাদের কাজ পূর্ণ হবে না।’

সমালোচকদের দাবি, বিজেপি যে ভেদাভেদ তৈরি করছে তা কেবল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অভিবাসীদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করছে না, বরং হিন্দু ও মুসলিম অভিবাসীদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিভাজন দেখা দিচ্ছে। দ্য সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট বিলের আওতায় আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে প্রবেশকারী হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি ও খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়। তবে আসামের পরিস্থিতি এর একেবারে বিপরীত। ‘অসম গণপরিষদের’ মতো বিজেপি মিত্ররাও বিশ্বাস করে, শুধু মুসলিম নয়, সকল বহিরাগতকে বিতাড়িত করা উচিত।

গোহাটিভিত্তিক আইনজীবী ও নর্থ ইস্ট বার কাউন্সিলের সহ-সভাপতি নেকিবুর জামানের দাবি, এ প্রক্রিয়া বিজেপিকে লাভবান করবে না। তিনি বলেন, ‘১৯৮৫ সালে আসামে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। তবে ৩৩ বছরেও কোনও সরকারকে উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি। সুপ্রিম কোর্টের আদেশের অধীনেই দ্বিতীয় দফার এনআরসি তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। কংগ্রেস কিংবা বিজেপির মতো কোনও দলের জন্য এমনটা হয়নি।’ তার যুক্তি হলো: কংগ্রেস মুসলিম বাঙালিদের পক্ষ নিয়েছে আর বিজেপি রয়েছে হিন্দু বাঙালিদের পক্ষে। কোনও দলই লাভবান হবে না। এক্ষেত্রে যা প্রয়োজন তা হলো আসামের স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য সাংবিধানিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।’