ইস্তাম্বুলের সৌদি কনস্যুলেট থেকে সাংবাদিক জামাল খাশোগি নিখোঁজ হওয়ার দিনের সিসিটিভি ফুটেজ সরিয়ে ফেলা হয়েছে। আর ওই দিন আকস্মিকভাবে কনস্যুলেটের তুর্কি কর্মীদের ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তুর্কি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান এ খবর জানিয়েছে।
তুরস্কের উচ্চপদস্থ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা মনে করেন, জামাল খাশোগিকে খুন বা অপহরণের জন্য আগে থেকেই ইস্তাম্বুলের সৌদি কনস্যুলেটে অপেক্ষমান ছিল সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় কিলিং স্কোয়াড বা খুনি বাহিনী। তারা মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত ঘাপটি মেরে অপেক্ষায় ছিলেন কখন খাশোগি হাজির হন। কনস্যুলেটে এটা ছিল তার দ্বিতীয় প্রবেশ। স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদ চূড়ান্ত করতে এর আগে আরও এক দফায় সেখানে গিয়েছিলেন তিনি। তখন তাকে জানানো হয়, কাগজপত্র ঠিক নেই। মঙ্গলবার আবার আসতে হবে। সে অনুযায়ী, দ্বিতীয় দফায় কনস্যুলেটে গিয়েই সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় হিট স্কোয়াডের নৃশংস শিকারে পরিণত হন তিনি।
এখন পর্যন্ত জামাল খাশোগির অপহরণের ঘটনায় সৌদি আরবের বিরুদ্ধেই অভিযোগের তীর যাচ্ছে। তারপরও তুর্কি কর্মকর্তারা দৃশ্যত বিষয়টি নিয়ে সৌদি আরবকে দোষারোপের ব্যাপারে অনাগ্রহী। কারণ সৌদি আরবের সঙ্গে জ্বালানি তেলের ব্যবসা ও আঞ্চলিক সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রাখতে চায় আঙ্কারা। যদিও তুরস্কের ক্ষমতাসীন দল এরদোয়ানের একে পার্টি এ ইস্যুতে রিয়াদের ওপর ব্যাপক মাত্রায় ক্ষুব্ধ। বিষয়টি নিয়ে খোদ এরদোয়ানসহ দলটির শীর্ষ নেতারা প্রকাশ্যেই কথা বলছেন।
এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত রাজনৈতিক নেতারা কনস্যুলেটের কোনও ভিডিও ফুটেজ সরবরাহের আহ্বান জানায়নি। তবে একটি ফুটেজে দেখা গেছে, সেদিন কনস্যুলেটের গেটে একটি ভারী ব্যাগ বের করে অপেক্ষমান গাড়িতে তোলা হচ্ছে। যেসব কর্মকর্তা তদন্তে আশার আলোর কথা জানিয়েছিলেন তারাও এখন বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চাইছেন না।
তুর্কি প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ানের উপদেষ্টা ইয়াসিন আকতাই দাবি করেছেন, ‘এখানে সৌদি রাষ্ট্রকে দোষারোপ করা হয়নি।’ অথচ এর আগে তিনি সেখানে আসলে কী ঘটেছিল তা প্রকাশের জন্য সৌদি আরবের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন। সংবাদমাধ্যম আল-আরাবি’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমাদের নিজেদেরই অনেক ভয়াবহ মাত্রার সমস্যা রয়েছে।’ এর আগে আকতাই সুনির্দিষ্টভাবে বলেছিলেন, রিয়াদ থেকে পাঠানো লোকজনই খাশোগিকে হত্যা করেছে।
তুর্কি কর্মকর্তারা আগে জানিয়েছিলেন, ইস্তাম্বুলের আতাতুর্ক বিমানবন্দরের ফ্লাইট রেকর্ড অনুসারে দেখা গেছে, দুটি সৌদি আকাশযান মঙ্গলবার বিমানবন্দরে অবতরণ করেছে। আবার একই দিনে খাশোগিকে সর্বশেষ দেখা যাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বিমান দুটি উড্ডয়ন করে। খাশোগির নিখোঁজ হওয়ার পেছনে ভূমিকার কথা অস্বীকার করলেও সৌদি কর্তৃপক্ষ স্বীকার করেছে, শনিবার ইস্তানবুলে তাদের একটি নিরাপত্তা প্রতিনিধি দলকে পাঠানো হয়েছিল। তবে এই সফরের কারণ জানানো হয়নি।
তুরস্কের এমন পিছুটানের আরেকটি ইঙ্গিত পাওয়া যায় সরকারপন্থী সংবাদপত্র ডেইলি সাবাহ’র খবরে। সংবাদপত্রটি জানিয়েছে, খাশোগিকে জীবিত অবস্থায় ওই বিমানগুলোর একটিতে সৌদি আরবে পাচার করার সম্ভাব্যতা মাথায় রেখে তদন্ত করা হচ্ছে। কিন্তু আগে তুর্কি কর্মকর্তারা বারবার বলেছেন, ওই সাংবাদিককে কনস্যুলেটের মধ্যেই হত্যা করা হয়েছে। গত রবিবার যুক্তরাষ্ট্র খাশোগির নিখোঁজের ব্যাপারে জানতে চাইলে মার্কিন কর্তৃপক্ষের কাছেও একই দাবি করেছিল তুরস্ক।
দ্য গার্ডিয়ান জানায়, ব্যক্তিগতভাবে তুরস্কের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কূটনীতিকদের কাছে বলেছেন যে, তারা এখনও বিশ্বাস করেন খাশোগিকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক নেতারা সৌদি আরবের কাছ থেকে সুবিধা পাওয়ার আশায় এই দাবি থেকে সরে আসতে চাইছেন। এই তদন্তটি যেভাবে রাজনৈতিক রূপ নিচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে খাশোগির ভাগ্যে ঠিক কী ঘটেছে তার প্রমাণ কখনওই প্রকাশ করা হবে না।
এক সময় রাজপরিবারের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করা জামাল খাশোগি গত বছর সৌদি যুবরাজ দেশব্যাপী ভিন্নমতাবলম্বীদের ধরপাকড় শুরুর পর দেশ ছাড়েন। গত মার্চে আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, সৌদি আরবে বিতর্কের কোনও জায়গা নেই। সরকারের নীতিকে প্রশ্ন করলেই নাগরিকদের আটক করে কারাবন্দি করা হচ্ছে।
নির্বাসিত সাংবাদিক খাশোগি ছিলেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের কঠোর সালোচক। সৌদি অভিজাত পরিবারে জন্ম নেওয়া এই সাংবাদিক গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসনে যান। সেখান থেকে তিনি দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট-এ কলাম লিখতেন। তার লেখায় সৌদি যুবরাজের সংস্কার কর্মসূচির সমালোচনা পরিলক্ষিত হতো। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান।