গত তিন বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যকে বিপর্যস্ত করে রেখেছে তিনটি প্রধান সংঘাত- গাজা, লেবানন ও ইরান। কাগজে-কলমে এই তিন সংঘাতেই এখন যুদ্ধবিরতির অধীনে রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে প্রতিটি ফ্রন্টেই এখনও পুরোদমে লড়াই চলছে। গাজা উপত্যকায় ইসরায়েল এখনও হামাসকে পুনর্গঠিত হতে বাধা দিতে এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলায় জড়িত যোদ্ধাদের লক্ষ্য করে অভিযান চালাচ্ছে। লেবাননে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে তীব্র লড়াই চলছে। আর ইরানে নিয়মিত বিরতিতে সংঘর্ষে জড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও তেহরান। এর সর্বশেষ উদাহরণ দেখা গেছে মঙ্গলবার সন্ধ্যায়।
আগের তুলনায় লড়াইয়ের তীব্রতা কিছুটা কম হলেও, এই তিন অঞ্চলের পরিস্থিতি এখন যুদ্ধ ও শান্তির এক অস্বস্তিকর দোলাচলে ঝুলে রয়েছে।
গাজা
আট মাস ধরে যুদ্ধবিরতি চলার পরও গাজায় হামাসের লক্ষ্যবস্তুগুলোতে ইসরায়েলের হামলা অব্যাহত রয়েছে। গত সপ্তাহে ইসরায়েলি বাহিনী হামাসের সামরিক প্রধান মোহাম্মদ ওদেহকে হত্যা করেছে। এ ঘটনার মাত্র দুই সপ্তাহ আগে তার পূর্বসূরিকেও হত্যা করা হয়েছিল। ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় আরও শত শত ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
এদিকে গাজার মানবিক সংকট এখনও চরম আকার ধারণ করে আছে। সেখানকার বেশিরভাগ মানুষ ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল এবং পর্যাপ্ত আশ্রয় ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার অভাবে ভুগছেন। এর মাঝেই ইসরায়েল গাজার বিভিন্ন অংশে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও সম্প্রসারিত করেছে এবং একসময় হামাসের দখলে থাকা ভূখণ্ডের আরও গভীরে প্রবেশ করেছে।
লেবানন
গত এপ্রিলের মাঝামাঝিতে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধবিরতির এক সপ্তাহের মাথায় লেবাননেও যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল। তবে সেই চুক্তি সত্ত্বেও ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে লড়াই আরও তীব্র হয়েছে। হিজবুল্লাহ বিস্ফোরক ড্রোন ব্যবহার করে ইসরায়েলের সামরিক অবস্থান ও উত্তরাঞ্চলীয় এলাকাগুলোতে হামলা বাড়িয়েছে। জবাবে ইসরায়েলও তাদের সামরিক অভিযান ও বিমান হামলা জোরদার করেছে।
মূলত ইরানের সমর্থনে হিজবুল্লাহর হামলার পরই এই নতুন দফার লড়াই শুরু হয়। লেবাননের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, গত মার্চ থেকে এ পর্যন্ত লেবাননে ৩ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ১০ লাখেরও বেশি মানুষ। একই সঙ্গে ইসরায়েলি বাহিনী সীমান্তজুড়ে একটি তথাকথিত ‘বাফার জোন’ তৈরি করছে, যা লেবাননের ভঙ্গুর সরকারের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে এবং আঞ্চলিক কূটনীতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
ইরান
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই মাসের যুদ্ধবিরতি চললেও হরমুজ প্রণালি ও এর আশেপাশে বারবার সামরিক সংঘাতের ঘটনা ঘটছে। দুই পক্ষই একে অপরের দিকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে, যদিও উভয় পক্ষই একে যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন না বলে ‘সীমিত ও আত্মরক্ষামূলক’ পদক্ষেপ হিসেবে দাবি করছে।
গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায়ও এই সংঘর্ষের পুনরাবৃত্তি ঘটে। ইরান বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের একটি সামরিক নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রে হামলা চালায় এবং একটি খালি তেলবাহী ট্যাংকারে গুলি বর্ষণ করে। মার্কিন দাবি অনুযায়ী, ট্যাংকারটি তাদের অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করছিল।
তবে এই সংঘর্ষের পরও ওয়াশিংটন ও তেহরান সর্বাত্মক যুদ্ধ এড়াতে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে। হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের অধিকার নিশ্চিত করা এবং নিষেধাজ্ঞা ও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে একটি বৃহত্তর আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে দুই দেশই সমঝোতার চেষ্টা চালাচ্ছে। বর্তমানে উভয় পক্ষই সামুদ্রিক অবরোধের মাধ্যমে একে অপরের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে বিশ্ববাজারে তেলের দাম চড়া রাখছে। আর যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরগুলোতে জাহাজ প্রবেশ এবং বের হওয়া আটকে দিচ্ছে।
সূত্র: ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল









