মিয়ানমারে দাফতরিক গোপনীয়তা আইন ভঙ্গের দায়ে দণ্ডিত দুই রয়টার্স সাংবাদিক এবার তাদের রায়ের বিরুদ্ধে দেশটির সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেছেন। শুক্রবার (১ ফেব্রুয়ারি) তাদের আইনজীবীরা আপিল আবেদন করেন। আইনি ব্যবস্থার আওতায় সাজা থেকে মুক্তি পেতে দুই রয়টার্স সাংবাদিকের জন্য এ আপিলকেই শেষ সুযোগ বলে মনে করা হচ্ছে। গত জানুয়ারিতে তাদের করা আপিল আবেদন খারিজ করে দিয়েছিল মিয়ানমারের হাইকোর্ট।
২০১৭ সালের ডিসেম্বরের এক সন্ধ্যায় পুলিশ সদস্যদের আমন্ত্রণে রেস্টুরেন্টে যাওয়ার পর নিখোঁজ হন মিয়ানমারে কর্মরত রয়টার্সের দুই সাংবাদিক ওয়া লোন এবং কিয়াও সোয়ে ও। পরে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ দাফতরিক গোপনীয়তা আইন ভঙ্গের অভিযোগে তাদের গ্রেফতার দেখায়। রাখাইনের ইন দিন গ্রামে সেনা অভিযানের সময় রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো গণহত্যার ওপর অনুসন্ধান চালাতে গিয়েই মামলার কবলে পড়েন তারা। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে তাদের বিরুদ্ধে সাত বছর করে কারাদণ্ড ঘোষণা করে ইয়াঙ্গুনের একটি জেলা আদালত। ওই বছরের নভেম্বরের শুরুতে ইয়াঙ্গুনের হাইকোর্টে দুই সাংবাদিকের পক্ষে আপিল করেন তাদের আইনজীবীরা। গত ১১ জানুয়ারি আপিল খারিজ করে নিম্ন আদালতের সাজা বহাল রাখে হাইকোর্ট। এবার সর্বশেষ প্রচেষ্টা হিসেবে মিয়ানমারের সুপ্রিম কোর্টের শরণাপন্ন হলেন রয়টার্স সাংবাদিকরা। তাদের আইনজীবীরা শুক্রবার সুপ্রিমকোর্টে আপিল করেছেন।
আপিলে দাবি করা হয়, পুলিশ মামলাটি সাজিয়েছে বলে প্রমাণ আছে। রয়টার্স সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ সরবরাহেও ঘাটতি রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয় আবেদনে।
রয়টার্সের পক্ষ থেকেও একটি বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘পিটিশনে আমরা সুপ্রিম কোর্টের কাছে আবেদন জানিয়েছি যেন নিম্ন আদালতের ত্রুটি শুধরে চূড়ান্তভাবে ওয়া লোন এবং কিয়াও সোয়ে ও ‘র জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হয়। আমাদের এ দুই সাংবাদিককে যেন মুক্তি দেওয়া হয়।’
মিয়ানমারের আইন অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা ব্যক্তিগতভাবে আপিলের শুনানি করেন। এ প্রক্রিয়া শেষ করতে কয়েক মাস লেগে যেতে পারে। এছাড়া রয়টার্স সাংবাদিকদের আগাম মুক্তির আরেকটি পথ হলো রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে সাধারণ ক্ষমা পাওয়া।
২৫ আগস্ট রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর পূর্ব-পরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ছয় লাখেরও বেশি মানুষ। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন এ ঘটনায় খুঁজে পেয়েছে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের আলামত। তবে শুরু থেকে ও পর্যন্ত এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে মিয়ানমার।
জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে ইন দিন গ্রামে সংঘটিত এক গণহত্যার চিত্র তুলে এনেছিলেন রয়টার্সের দণ্ডিত দুই সাংবাদিক। এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর প্রথমবারের মতো মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ১০ রোহিঙ্গা হত্যাকাণ্ডের স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য হয়। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ওই ঘটনার দায়ে সেনা-সদস্যদের সাজা দিলেও দাফতরিক গোপনীয়তা আইনে রয়টার্স সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। তাদের মুক্তির দাবিতে ক্রমেই জোরালো হচ্ছে আন্তর্জাতিক চাপ। এরইমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ব্রিটেনসহ বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ, জাতিসংঘ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের কর্মকর্তারাও রয়টার্স সাংবাদিকদের মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
এদিকে রয়টার্স সাংবাদিকদের কিভাবে ‘ফাঁদে’ ফেলা হয়েছিলো সেই সাক্ষ্য দিয়ে মিয়ানমারে গ্রেফতার হওয়া পুলিশ কর্মকর্তা মুক্তি পেয়েছেন। এক বছর সাজাভোগের পর বৃহস্পতিবার (৩১ জানুয়ারি) তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। বের হয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন,কারাগারে থাকা সাংবাদিকদের জন্য তিনি দুঃখিত। পুলিশ ক্যাপ্টেন মো ইয়ান নাইং তার সাক্ষ্যে বলেছিলেন, কিভাবে পুলিশ কর্মকর্তারা রয়টার্স সাংবাদিকদের কাছে গোপন নথি রেখে তাদের ফাঁদে ফেলে। তিনি বলেন,পুলিশ পুরো ঘটনা সাজিয়ে রেখেছিলো।
আদালতে এমন সাক্ষ্য দেওয়ার কিছুদিন পরই তাকে পুলিশ ডিসিপ্লিনারি অ্যাক্ট ভাঙার অপরাধে কারাগারে পাঠানো হয়। তার পরিবারকেও পুলিশ কলোনি থেকে বের করা হয়। এই আইন ও শাস্তির সমালোচনা করেন মো ইয়াং।