পেলেটে ঝাঁঝরা মুখ, তবু অনুশোচনা নেই: হাসপাতাল থেকেই যন্তর মন্তরে ফেরার ঘোষণা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২৩ জুলাই ২০২৬, ০০:০৬আপডেট : ২৩ জুলাই ২০২৬, ০০:০৮

শেখ ইরশাদ মনসুরি গুরুগ্রামভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টস ম্যানেজার। সোমবার সকালে সোনম ওয়াংচুক ও ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আহ্বানে যন্তর মন্তরে জমায়েত হওয়া হাজার হাজার মানুষের মধ্যে তিনি প্রথম উপস্থিত হন।

সেদিন ঠিক কী ঘটেছিল, তা স্মরণ করে পরিবারের এক সদস্যকে ইরশাদ বলেন, আমি ও আমার মতো আরও অনেকেই হাত জোর করে নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে আকুতি জানাচ্ছিলাম যে, দয়া করে আমাদের ওপর অস্ত্র ব্যবহার করবেন না। আমরা তরুণ এবং কেবল শিক্ষার অধিকার ও দাবি নিয়ে কথা বলছি।

পরিবারের সেই সদস্যের ভাষ্যমতে, এরপরই ইরশাদের মনে পড়ে তার বাঁ চোখ দিয়ে গলগল করে রক্ত ঝরার কথা। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সেই আঘাত তার থুতনির নিচের অংশ, কাঁধ ও বুকে ছড়িয়ে পড়ে। মধ্যপ্রদেশের ২৫ বছর বয়সী এই যুবককে দ্রুত কাছের লেডি হার্ডিঞ্জ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে তিনি বর্তমানে চিকিৎসাধীন। হাসপাতালেই তাকে জানানো হয় যে তিনি পেলেট (ছররা) গানের আঘাতে আহত হয়েছেন।

চিকিৎসার বিষয়ে অবগত একটি সূত্র জানায়, মঙ্গলবার তার গলা ও চোখে দুটি অস্ত্রোপচার করে শরীরে থাকা পেলেটের অবশিষ্টাংশ বের করা হয়েছে।

গত ২০ জুলাই ‘সংসদ চলো’ পদযাত্রা ছত্রভঙ্গ করতে দিল্লি পুলিশ ও র‍্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স (আরএএফ) বলপ্রয়োগ করলে আহত ৭০ জনেরও বেশি মানুষের মধ্যে ইরশাদ একজন। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষে ১০০ জনেরও বেশি নিরাপত্তা কর্মীও আহত হন।

পেলেটে ঝাঁঝরা মুখ, তবু অনুশোচনা নেই: হাসপাতাল থেকেই যন্তর মন্তরে ফেরার ঘোষণা

দিল্লি পুলিশ এই অভিযানে পেলেট গান ব্যবহারের কথা অস্বীকার করেছে এবং তাদের অস্ত্রাগারে এটি নেই বলেও জানিয়েছে। তবে আরএএফের অস্ত্রাগারে এখনও পেলেট গান বিদ্যমান। আরএএফ হলো সিআরপিএফের দাঙ্গা বিরোধী উইং। ২০১০ সালের দিকে জম্মু ও কাশ্মীরে ভিড় নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে পুলিশ ও সিআরপিএফ প্রথম পেলেট গান চালু করে, যার আঘাতে বহু মানুষ দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। ২০১৬ সালে সুপ্রিম কোর্ট নিরাপত্তা বাহিনীকে পেলেট গান ব্যবহারের আগে তা ভেবে দেখার নির্দেশ দেয়। পরের বছর সরকার আদালতকে জানায় যে, চরম সংকটময় মুহূর্তে বা ‘শেষ উপায়’ হিসেবেই কেবল পেলেট গান ব্যবহার করা হয়।

‘সংসদ চলো’ পদযাত্রায় পেলেট বিদ্ধ হয়ে আহত হওয়া আন্দোলনকারীদের মধ্যে এখন পর্যন্ত কেবল ইরশাদকেই শনাক্ত করা গেছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে আরও অনেকেই পেলেটের আঘাতে আহত হয়ে থাকতে পারেন।

ইরশাদ তার পরিবারকে বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম নীল পোশাক পরা জওয়ান (আরএএফ) আমার দিকে অস্ত্র তাক করে আছে। ভেবেছিলাম তিনি হয়তো কেবল ভঙ্গি করছেন, সত্যি সত্যি গুলি ছুড়বেন না। হঠাৎ একটি বস্তু এসে আমার বাঁ ভ্রুতে আঘাত করে এবং তা ছড়িয়ে পড়ে। আমি মুখের চামড়ায়, থুতনিতে এবং গলায় এর অস্তিত্ব অনুভব করতে পারছিলাম।’ আঘাত পাওয়ার পরপরই প্রচুর রক্তপাত হতে থাকে এবং তিনি পরিস্থিতির আকস্মিকতায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন।

ইরশাদ যে আন্দোলনে গেছেন তা জানত না পরিবার

জবলপুর জেলার পাটন সাব-ডিভিশনের এক কৃষকের ছেলে শেখ ইরশাদ মনসুরি গত দুই বছর ধরে দিল্লি-এনসিআরে বাস করছেন। তার বড় ভাই শেখ মোস্তফা মনসুরি জানান, ইরশাদ যন্তর মন্তরের বিক্ষোভে অংশ নিতে যাচ্ছেন সে বিষয়ে পরিবার কিছুই জানত না।

মোস্তফা ফোনে বলেন, সোমবারেও প্রতিদিনের মতোই সাধারণ একটি ফোনকল হয়েছিল। আমাদের বাবা কয়েক দিন আগে সেখানে গেছেন এবং ছোট ভাইয়ের ভাড়া বাসাতেই আছেন। আমি যেতে পারিনি, আর বাবা স্মার্টফোন ব্যবহার করতে পারেন না বলে দিল্লিতে বেশ অসহায় বোধ করছেন।’

পরিবারের ওই সদস্য জানান, হাসপাতালে থাকা অবস্থায় বাবা যেন তাকে দেখতে না আসেন, সে জন্য ইরশাদ নিজেই বারণ করেছেন। ইরশাদ বলেন, ‘আমি এখন ভালো আছি এবং বিপদমুক্ত। আমাকে এই অবস্থায় দেখলে বাবার শরীর খারাপ হয়ে যাবে।’ ২৫ বছর বয়সী এই তরুণের গলা ও ডান চোখে সেলাই দেওয়া হলেও দৃষ্টিশক্তি বা সামগ্রিক স্বাস্থ্যের কোনও ক্ষতি হয়নি। হাসপাতালের চিকিৎসকেরাও জানিয়েছেন তার সব ভাইটাল প্যারামিটার স্বাভাবিক রয়েছে।

আবারও যন্তর মন্তরে ফিরে যাব

ঘটনার বিবরণ দিয়ে ইরশাদ জানান, ব্যক্তিগত কাজে ঝান্ডেওয়ালান যাওয়ার আগে সোমবার সকাল ৯টার দিকে তিনি কেরালা ভবনের বাইরে ছিলেন। যন্তর মন্তরে ফেরার পথেই তিনি পেলেটের আঘাতে আহত হন।

ইরশাদ বলেন, ‘চিকিৎসকরা প্রথমে নিশ্চিত ছিলেন না পেলেটে কী উপাদান ছিল। তারা ভেবেছিলেন এটি হয়তো শুধুই রাবার। পরবর্তীতে রিপোর্ট আসার পর তারা জানান, এটি ছিল সীসা মিশ্রিত রাবারজাতীয় পদার্থ।’ দুই বার অস্ত্রোপচারের পর চিকিৎসকেরা তাকে জানান যে তিনি এখন বিপদমুক্ত এবং শরীর থেকে সব পেলেট বের করা হয়েছে।

পরিবারের সদস্যরা জানান, এই ঘটনার জন্য ইরশাদের মনে ‘বিন্দুপরিমাণ কোনো অনুশোচনা নেই’।

ইরশাদ দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ‘এই আন্দোলন ছিল তরুণদের এবং তাদের ভবিষ্যতের জন্য। আমি একটা চাকরি পেয়েছি, কিন্তু সেটাই সব শেষ নয়। দেশের তরুণদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থা দরকার এবং এর জন্যই আমি আবার যন্তর মন্তরে ফিরে যাব।’

সূত্র: দ্য প্রিন্ট

/এএ/
সম্পর্কিত
খাবার, ক্ষোভ আর সংহতিতে গতি পাচ্ছে যন্তর মন্তরের আন্দোলন
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
যন্তর মন্তরে বিক্ষোভকারীদের পাশে স্বেচ্ছাসেবী চিকিৎসকেরা
সর্বশেষ খবর
মগবাজারে এক চালককে মারধরের ঘটনায় জড়িত একজন গ্রেফতার
মগবাজারে এক চালককে মারধরের ঘটনায় জড়িত একজন গ্রেফতার
সবার হৃদয় ছুঁয়েছে ইকন, বাবার দাফন শেষে রাতে এটিএম বুথে, সকালে এইচএসসি পরীক্ষায়
সবার হৃদয় ছুঁয়েছে ইকন, বাবার দাফন শেষে রাতে এটিএম বুথে, সকালে এইচএসসি পরীক্ষায়
‘দাম বাড়ানোর পর সব ঠিক হয়ে যাবে’, ৫ ঘণ্টায়ও গ্যাস না পেয়ে সিএনজিচালক  
‘দাম বাড়ানোর পর সব ঠিক হয়ে যাবে’, ৫ ঘণ্টায়ও গ্যাস না পেয়ে সিএনজিচালক  
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় দেশ ও মানুষের সেবায় কাজ করছে ছাত্রদল: ডিএনসিসি প্রশাসক
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় দেশ ও মানুষের সেবায় কাজ করছে ছাত্রদল: ডিএনসিসি প্রশাসক
সর্বাধিক পঠিত
আর্জেন্টিনার জার্সি পরে ভাইরাল, সেই রুনা ডিবির হাতে গ্রেফতার
আর্জেন্টিনার জার্সি পরে ভাইরাল, সেই রুনা ডিবির হাতে গ্রেফতার
জামায়াত এমপির বিয়ে আর কাবিনের গোমর ফাঁস করে দিলেন কাজী
জামায়াত এমপির বিয়ে আর কাবিনের গোমর ফাঁস করে দিলেন কাজী
হত্যাকাণ্ডের শিকার সেই শিক্ষিকার চার সন্তান নিয়ে দিশেহারা পরিবার
হত্যাকাণ্ডের শিকার সেই শিক্ষিকার চার সন্তান নিয়ে দিশেহারা পরিবার
খাল খনন শেষে ৬৪ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দিলেন ইউএনও
খাল খনন শেষে ৬৪ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দিলেন ইউএনও
মুক্তি পেয়েই যে বার্তা দিলেন রাহুল-প্রিয়াঙ্কা
মুক্তি পেয়েই যে বার্তা দিলেন রাহুল-প্রিয়াঙ্কা