অবশেষে হজে যাওয়ার বাধা দূর হলো ফিলিস্তিনিদের

সৌদি আরবের ভিসা জটিলতার জাল ছিঁড়ে বের হওয়ার পথ পেয়েছেন ফিলিস্তিনিরা। গত পাঁচ মাস ধরে এই নিষেধাজ্ঞার জন্য তারা ওমরাহ হজ পালন করতে পারছিলেন না। মধ্যপ্রাচ্যের সংবাদ পর্যবেক্ষণকারী যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংস্থা মিডিল ইস্ট আই লিখেছে, সৌদি আরব ফিলিস্তিনিদের ভিসা আবেদনের বিষয়ে নতুন আইন জারি করেছিল। অধিকাংশ ফিলিস্তিনি তাতে পড়েন বিপাকে। শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলের সরকার নতুন ধরনের একটি নথি প্রদান শুরু করলে তা গ্রহণে সম্মত হয় সৌদি আরব। আর এর ভিত্তিতে আবারও হজে যাওয়ার সুযোগ উন্মুক্ত হয় ফিলিস্তিনিদের জন্য।প্রতীকী কাবা ঘরের চারপাশে ফিলিস্তিনি শিশুরা
সৌদি আরবের ভিসা সংক্রান্ত বিধির কারণে ইসরায়েলে বসবাসরত ফিলিস্তিনিদের প্রায় তিন দশক হজ করা বন্ধ ছিল। ইসরায়েলের পাসপোর্টকে যেহেতু সৌদি আরবসহ আরব বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ স্বীকৃতি দেয় না, সেহেতু জর্ডানিয়ান ট্রাভেল ডকুমেন্ট দিয়ে ইসরায়েলি পাসপোর্টধারী ফিলিস্তিনিদের হজে যাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছিল। ১৯৭৮ সালে জর্ডানের বাদশাহ হুসেইন জর্ডানের ট্রাভেল ডকুমেন্ট ব্যবহার করে ফিলিস্তিনিদের হজে যাওয়ার সুযোগ উন্মুক্ত করেছিলেন।
২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, ফিলিস্তিনিদের যাদের অস্থায়ী জর্ডানিয়ান পাসপোর্ট আছে তাদেরকে ভিসা দেওয়া হবে না। গত ডিসেম্বর মাসে আম্মানের সৌদি দূতাবাসের সঙ্গে একটি সমঝোতায় উপনীত হওয়া সম্ভব হয়। এতে নির্ধারিত হয়, জর্ডানিয়ান ট্র্যাভেল ডকুমেন্টের ভিত্তিতেই সংশ্লিষ্ট ফিলিস্তিনিদের ওমরাহ ভিসা দেবে সৌদি আরব। কিন্তু পূর্ব জেরুজালেমের একটি ট্র্যাভেল এজেন্সি জানিয়েছে, এ বছরের জানুয়ারিতে এসেই সৌদি আরব সিদ্ধান্ত পাল্টায়। তারা দাবি করে, আবেদনপত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ফিলিস্তিনিদের ইসরায়েলের দেওয়া পরিচয়পত্রও জমা দিতে হবে। কিন্তু ইসরায়েল অধিকৃত এলাকায় বসবাসরত ফিলিস্তিনিদের কাছে আইডি কার্ড ভিসা আবেদনের সঙ্গে জমা দিয়ে দেওয়ার বিষয়টি অগ্রহণযোগ্য ঠেকেছিল।
ইসরায়েলি পরিচয়পত্র আবেদনপত্রের সঙ্গে দিয়ে দিলে, তা হারিয়ে যেতে পারে বা জেরুজালেমে প্রবেশে সমস্যা হতে পারে। আইডি কার্ড না থাকলে ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনী যেকোনও সময় গ্রেফতার করতে পারে। ফলে ফিলিস্তিনিরা হজে যাওয়ার ভিসা আবেদন প্রক্রিয়াকে সহজভাবে নিতে পারছিলেন না। আইডি কার্ড হাতছাড়া করতে না চাওয়ার পাশাপাশি অন্য কারণও আছে। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর ইসরায়েল পূর্ব জেরুজালেম দখল করে। সেই থেকে এলাকাটির ফিলিস্তিনি বাসিন্দা ও তাদের উত্তরসূরিরা ইসরায়েলি আইনের অধীনে বসবাস করছেন। ইসরায়েল তাদের যে আইডি কার্ড দিয়েছে তা তারা যেকোনও সময় যেকোনও কারণে দেখিয়ে বাতিল করে দেয়। ফলে ফিলিস্তিনি হয়েও হজে যাওয়ার সুযোগ না পাওয়ার মতো অবস্থায় ছিলেন অনেকেই।
এমন অচলাবস্থা নিরসনে জেরুজালেমের আদালতের স্মরণাপন্ন হন সংশ্লিষ্টরা। হজের জন্য যাতে ফিলিস্তিনিরা ভিসা আবেদন করতে পারেন তা নিশ্চিতে ইসরায়েলি আদালত একটি নতুন নথি প্রদানের পক্ষে রায় দেয়। আর এটি হচ্ছে ঠিকানা প্রমাণের প্রত্যয়নপত্র। আবেদনকারীকে দুইজন সাক্ষীর সমর্থনে তার বসবাসের ঠিকানার সত্য হওয়ার প্রত্যয়নপত্র দাখিল করতে হবে। এই সিদ্ধান্তের পর সৌদি আরব রাজি হয় ইসরায়েলের দেওয়া আইডি কার্ডের বদলে ফিলিস্তিনিদের ভিসা আবেদনে ঠিকানার প্রত্যয়নপত্র গ্রহণ করতে।
জর্ডানের পক্ষ থেকে যে ট্রাভেল ডকুমেন্ট ইস্যু করা হতো ফিলিস্তিনিদের জন্য, তা দিত আম্মানের পাসপোর্ট কর্তৃপক্ষ। কিন্তু তাতে জাতীয় নাগরিক নম্বর থাকত না। ফলে ট্রাভেল ডকুমেন্টধারী জর্ডানের পূর্ণ নাগরিক হিসেবে স্বীকৃত হতেন না। প্রথম দিকে ফিলিস্তিনিদের উৎসাহ দেওয়া হতো রামাল্লাভিত্তিক প্যালেস্টিনিয়ান অথরিটির কাছ থেকে পাসপোর্ট নিতে অথবা জর্ডানের পূর্ণ নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে। এতে অবশ্য অন্যদিকে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। কিছু ফিলিস্তিনি রাজনীতিবিদ ও কূটনীতিক সন্দেহ করেছিলেন, সৌদি আরবের চাপে পড়ে জর্ডান ফিলিস্তিনিদের নাগরিক বানিয়ে ফেলতে চাইছে, যাতে তারা আর ফিলিস্তিনে না ফেরে।
২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে লেবাননের বৈরুতে অবস্থিত সৌদি দূতাবাসের একজন কর্মকর্তা মিডিল ইস্ট আইকে জানান, লেবাননে আশ্রয় নেওয়া ফিলিস্তিনিদেরকেও ভিসা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সৌদি আরব। লেবাননের ২০১৭ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী এদের সংখ্যা এক লাখ ৭৪ হাজার প্রায়। পরবর্তীতে যে ঠিকানা প্রমাণের প্রত্যয়নপত্র গ্রহণের বিষয়ে সম্মতি দিয়েছে সৌদি আরব তা লেবাননে বসবাসরত ফিলিস্তিনিদের জন্যও প্রযোজ্য কি না, তা নিশ্চিত হতে পারেনি মিডিল ইস্ট আই।