দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন

সৌদি বাদশা ও যুবরাজের দ্বন্দ্ব চরমে

অসমর্থিত সূত্রের বরাত দিয়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান দাবি করেছে, ইয়েমেন যুদ্ধসহ বেশ কিছু বিষয়ে সৌদি বাদশাহ সালমান বিন আব্দুল্লাহ ও যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রকট আকার ধারণ করেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই সূত্র গার্ডিয়ানের কাছে দাবি করে, ফেব্রুয়ারিতে বাদশাহর মিসর সফরকালে তার পরামর্শকরা যুবরাজের ব্যাপারে তাকে সতর্ক করেছিলেন। যুবরাজ যে কোনও পদক্ষেপ নিতে পারেন, এমন আশঙ্কা থেকে একান্ত অনুগত ৩০ জনকে বাদশাহর নিরাপত্তার দায়িত্ব দেওয়া হয়। বাদশাহ-যুবরাজের দ্বন্দ্বের প্রেক্ষাপট তুলে ধরতে ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে জারি করা একটা ডিক্রির প্রসঙ্গও উল্লেখ করা হয়েছে গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে। বলা হয়েছে, সৌদি আরবে সব ডিক্রিই বাদশাহর নামে জারি করা হলেও ওই ডিক্রিতে উপ-বাদশাহ হিসেবে যুবরাজের নামে স্বাক্ষর দেওয়া ছিল। 

ff2971559eec49008599b0f46f4ed236_18

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, আলজেরিয়া ও সুদানের সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ও ইয়েমেন যুদ্ধ নিয়ে বাদশা সালমানের সঙ্গে যুবরাজ মোহাম্মদের মতবিরোধ রয়েছে। আলজেরিয়া ও সুদানের বিক্ষোভকারীদের প্রশ্নে বাদশাহকে নমনীয় মনে করেন যুবরাজ, আরও শক্ত অবস্থান নেওয়ার পক্ষে তিনি। ইয়েমেনের যুদ্ধবন্দিদের ব্যাপারেও আরও নৃশংস অবস্থান নিতে চান যুবরাজ। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে আভাস দেওয়া হয়েছে, ফেব্রুয়ারিতে বাদশাহর মিসর সফরের সময় দ্বন্দ্ব প্রকট হওয়ার আভাস পাওয়া গেছে।

মিসর সফরের সময়েই বাদশাহ সালমানকে তার পরামর্শকরা সতর্ক করেন, যুবরাজ তার বিরুদ্ধে যেকোনও পদক্ষেপ নিতে পারেন। বাদশাহর অনুগতরা তাকে নিয়ে খুবই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কাবোধ করায় তার সফরকালীন নিরাপত্তাসঙ্গী হিসেবে নির্ধারিত গ্রুপকে বাতিল করা হয়। মিসরীয় বাহিনীর কাউকে সেই নিরাপত্তা দলে রাখতে অস্বীকৃতি জানানো হয়। নতুন করে বাদশাহর একান্ত অনুগত ৩০ জনকে দায়িত্ব দেওয়া হয় তার সুরক্ষার। ধারণা করা হচ্ছে, পূর্বে যে দলটিকে বাদশাহর সফরকালীন দেহরক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, তারা যুবরাজের অনুগত ছিল।

বাদশাহ-যুবরাজ দ্বন্দ্বের আরেক প্রমাণ হাজির করে গার্ডিয়ান দাবি করেছে, সফর শেষে বাদশা যখন দেশে ফিরে আসেন তখন যুবরাজ তাকে স্বাগত জানাতে যাননি। এ সংক্রান্ত সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে দেখা যায়, তাকে স্বাগত জানাতে যাওয়া রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তালিকায় যুবরাজের নাম নেই।

বাদশার মিসর সফরের সময় যুবরাজ ছিলেন দেশটির ‘ডেপুটি কিং’। সে সময় তিনি বড় দুটি পরিবর্তন আনেন। যুক্তরাষ্ট্রে প্রথমবারের মতো একজন নারী রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেন প্রিন্সেস রিমাকে। আর তার ভাই খালিদ বিন সালমানকে নিয়োগ দেওয়া হয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে। এই নিয়োগে ক্ষমতাসম্পন্ন পদগুলো একই পরিবারের মধ্যে কেন্দ্রীভূত হয়ে যায়। গার্ডিয়ানের কাছে ওই সূত্র দাবি করে, এই পরিবর্তন নিয়ে বাদশাহ অবগত ছিলেন না। প্রিন্স খালিদকে এত বড় দায়িত্ব এখনই দেওয়ার ব্যাপারে একমত ছিলেন না বাদশাহ।

রাজদরবারের এই নিয়োগগুলো প্রায় সবসময়ই বাদশাহর নামে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু ২৩ ফেব্রুয়ারির ওই ঘোষণায় স্বাক্ষর ছিল ‘ডেপুটি কিং’-এর। ওই সূত্র বলেন, বাদশাহ ও তার দল এ খবর পেয়েছিলেন টেলিভিশনের মাধ্যমে। এক বিশেষজ্ঞ গার্ডিয়ানকে বলেছেন, ডেপুটি কিংয়ের এই পদবী অনেক দিন ধরেই ব্যবহৃত হয় না। বড় ওই দুই নিয়োগ নিয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ গার্ডিয়ানকে জানায়, ‘সৌদি আরবের আইন অনুযায়ী যখন বাদশাহ দেশের বাইরে থাকবেন তখন তিনি রাষ্ট্রের দায়িত্ব যুবরাজকে দিয়ে যাবেন। মিসর সফরের সময় সেই ঘটনাই ঘটেছে।’ তাদের মুখপাত্র জানান, সৌদি যুবরাজ যে কাজই করেছেন তা বাদশাহর হয়ে করেছেন, কোনও দ্বন্দ্বের অভিযোগ আসলে ভিত্তিহীন।

তবে ওই মুখপাত্র সৌদি নিরাপত্তা দল পরিবর্তন নিয়ে স্পষ্ট কিছু বলতে পারেননি। মন্তব্য করেননি মিসরীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সরিয়ে নেওয়া নিয়েও। মিসরের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও ও মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। গার্ডিয়ানের অনুরোধে সাড়া দেয়নি সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল কমিউনিকেশন ইন সৌদি আরবের কোনও মুখপাত্রও।

সৌদি যুবরাজ দেশে তার সব প্রতিদ্বন্দ্বীকে সরিয়ে এবং মানবাধিকার কর্মীদের আটক করে নিজের ক্ষমতা সংহত করার চেষ্টার একপর্যায়ে এসে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন। একইসঙ্গে আগ্রাসী বৈদেশিক নীতির কারণেও সমালোচিত হন যুবরাজ। গত অক্টোবরে ইস্তাম্বুলে সৌদি দূতাবাসে সাংবাদিক জামাল খাশোগির হত্যাকাণ্ডের পর বিপাকে পড়েন এমবিএস খ্যাত যুবরাজ। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতার কথা উঠে আসে জোরেশোরে। এ ঘটনায় ভীষণভাবে ক্ষুণ্ন হয় সৌদি আরবের ভাবমূর্তি। হারানো ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন বাদশাহ সালমান। তার সমর্থকরা বারবারই দাবি জানাচ্ছেন, যুবরাজ নয়, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তিনি যেন নিজেই সিদ্ধান্ত নেন।