তিন সৌদি নাগরিকসহ ৩৫০ বন্দিকে মুক্তির ঘোষণা দিয়েছে ইয়েমেনের ইরান সমর্থিত শিয়াপন্থী হুথি বিদ্রোহীরা। সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দিয়েছেন বিদ্রোহীদের বন্দিবিষয়ক জাতীয় কমিটির প্রধান আব্দুল কাদের আল-মুরতাজা। এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা।
আব্দুল কাদের আল-মুরতাজা জানান, সৌদি সীমান্তবর্তী নাজরান প্রদেশের কাছে বিশাল অভিযানে যেসব সেনা ও ভাড়াটে সন্ত্রাসী আটক হয়েছে তাদের মধ্য থেকে তিন সৌদি নাগরিকসহ ৩৫০ জনকে মুক্তি দেওয়া হবে। শুভেচ্ছার নিদর্শনস্বরূপ বন্দিমুক্তির সিদ্ধান্ত নিয়েছে হুথি।
বন্দিবিষয়ক জাতীয় কমিটির প্রধান বলেন, এসব বন্দিকে মুক্তি দেওয়ার মাধ্যমে হুথি সুইডিশ শান্তিচুক্তির প্রতি নিজেদের প্রতিশ্রুতির প্রমাণ দিতে চায়।
২০১৭ সালের ডিসেম্বরে সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে শান্তি আলোচনা হয়েছিল। সে সময় ইয়েমেনের সৌদি সমর্থিত পলাতক প্রেসিডেন্ট আব্দুর রাব্বু মানসুর হাদি সমর্থিত সরকারের সঙ্গে হুথিরা হুদাইদা বন্দরনগরীতে যুদ্ধবিরতি এবং যুদ্ধবন্দি বিনিময় চুক্তি সম্পাদন করে।
এ প্রসঙ্গে আব্দুল কাদের আল-মুর্তাজা বলেন, বন্দি মুক্তির মাধ্যমে আমরা সুইডেন চুক্তির প্রতি আমাদের প্রতিশ্রুতির প্রমাণ দিতে চাই। অন্যদেরও একই পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।
তিনি বলেন, যে সাড়ে তিনশ’ বন্দিকে মুক্তি দেওয়া হবে তার মধ্যে সুইডেন চুক্তির সময় দেয়া তালিকার লোকজনও রয়েছে।
হুথি সমর্থিত আল মাসিরাহ টেলিভিশন জানিয়েছে, হুথির বন্দি মুক্তি কার্যক্রম জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটির তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন করা হবে।
গত সপ্তাহে যুদ্ধ বন্ধে সৌদি আরবের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল হুথি। গত ২০ সেপ্টেম্বর হুথির সর্বোচ্চ নেতা মাহাদি আল-মাশহাত বলেছিলেন, সৌদি আরব যদি হামলা বন্ধ করে তাহলে ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সাহায্যে দেশটিতে হামলা চালানো বন্ধ করবে হুথি। ওই ঘোষণার পর ইরানের পক্ষ থেকেও হুথির যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব মেনে নিতে সৌদি আরবের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
সৌদি জোটের হামলা বন্ধে হুথিদের দেওয়া প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়ে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সাইয়্যেদ আব্বাস মুসাভি বলেছেন, এ প্রস্তাব মেনে নিলে তা (যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব) মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে।
গত ১৪ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর দুটি বৃহৎ তেল স্থাপনায় ড্রোন হামলা চালানো হয়। ওই হামলার পর সৌদি আরবের তেল উৎপাদন অর্ধেকে নেমে আসে। ইয়েমেনের ইরান সমর্থিত শিয়াপন্থী হুথি বিদ্রোহীরা এ হামলার দায় স্বীকার করলেও এ ঘটনায় ইরানকে দায়ী করে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব। যুক্তরাষ্ট্রের তরফে স্যাটেলাইট ছবি প্রকাশ করে হামলার নেপথ্যে ইরান জড়িত রয়েছে বলে দাবি করা হয়। যদিও অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে তেহরান। এ ঘটনার জেরে সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে আরও সেনা মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। পরে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেয় ওই সশস্ত্র গোষ্ঠী। তখন রিয়াদ জানিয়েছিল, কথায় নয়, হুথিদের কাজে বিশ্বাস করবে সৌদি। পরে অবশ্য রবিবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সৌদির নাজরানে ইয়েমেন সীমান্তে হামলার দাবি করে হুথিরা।
সাইয়্যেদ আব্বাস মুসাভি এক বিবৃতিতে বলেন, আন্তর্জাতিক সমাজ ইয়েমেনের প্রস্তাবকে স্বাগত জানালেও দুঃখজনকভাবে সৌদি বাহিনী এখনও ইয়েমেনের বিভিন্ন এলাকায় বোমাবর্ষণ করে যাচ্ছে ও যুদ্ধের দাবানল জ্বালিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। তেহরান রিয়াদকে ইয়েমেনের প্রস্তাব মেনে নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় সহযোগিতা করার আহ্বান জানাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ইয়েমেনে সৌদি আগ্রাসন বন্ধ এবং যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার যেকোনও প্রস্তাবের প্রতি তেহরানের সমর্থন রয়েছে। ইরান মনে করে, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করতে হলে অস্ত্রের ঝনঝনানি বন্ধ করার ছাড়া অন্য কোনও উপায় নেই।
উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট মনসুর হাদিকে উচ্ছেদ করে রাজধানী সানা দখলে নেয় ইরান সমর্থিত শিয়াপন্থী হুথি বিদ্রোহীরা। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে পালিয়ে যান হাদি। ২০১৫ সালের মার্চে হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে মিত্রদের নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় ‘অপারেশন ডিসাইসিভ স্টর্ম’ নামে সামরিক অভিযান শুরু করে সৌদি আরব। সৌদি জোটের অভিযান শুরুর পর এ পর্যন্ত নারী-শিশুসহ ১০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে কোটি কোটি মানুষ। সূত্র: আল জাজিরা, পার্স টুডে।