বাগদাদে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলায় ইরানের শীর্ষস্থানীয় কমান্ডার কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উত্তেজনা বাড়ছে। ইতোমধ্যেই এ হত্যকাণ্ডের চরম প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে ইরান। অন্যদিকে হামলা হলে নতুন ধরনের সরঞ্জাম নিয়ে তেহরানকে পাল্টা জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পাল্টা হামলা চালাতে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই ইরানের ৫২টি লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করে ফেলেছে বলেও জানান তিনি। অন্যদিকে ট্রাম্পের হুমকির সমালোচনা করে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ বলেছেন, পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি শেষ হতে চলেছে। দুই দেশের নেতাদের এমন যুদ্ধংদেহী অবস্থানে দৃশ্যত মধ্যপ্রাচ্যে একটি জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে।
ইরানের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন কাসেম সোলাইমানি। ইরাকে তার গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী ছিলেন দেশটির আধাসামরিক বাহিনী হাশদ আল শাবি-র উপ-প্রধান আবু মাহদি আল মুহানদিস। উভয়েই মার্কিন ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছেন। শনিবার বাগদাদে তাদের মরদেহ নিয়ে শোক মিছিলে জনতার ঢল নামে। এদিন রাতেই বাগদাদের সুরক্ষিত গ্রিন জোন এলাকায় মার্কিন দূতাবাসের কাছে দুইটি রকেট হামলা চালানো হয়। এর কয়েক দিন আগেই ওই দূতাবাসে হামলা চালায় ইরাকের ইরান সমর্থিত শিয়া মিলিশিয়ারা।
সোলাইমানি হত্যাকাণ্ড নিয়ে ওয়াশিংটন ও তার মিত্রদের মধ্যেও বিরোধ দেখা দিয়েছে। এই ঘটনার পর ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ইরাকের অন্তর্বর্তকালীন প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করে মার্কিন হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। ইরাকের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ফরাসি সমর্থন অব্যাহত রাখার কথাও জানান ম্যাক্রোঁ। বাগদাদের অনুমোদন না নিয়ে এ ধরনের হামলা চালানোয় ওয়াশিংটনের সমালোচনা করেন তিনি।
বিদ্যমান উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশ সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। তবে এ হত্যাকাণ্ডের পর মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কে ভিত্তি পরিবর্তন হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। এখন ইরানের সম্ভাব্য প্রতিশোধের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ওই তিন দেশকে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এদিকে টুইটারে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেছেন, তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের কোনও নাগরিক অথবা স্থাপনায় আঘাত করলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ইরান ও তার সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চ পর্যায়ের ৫২টি লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা আঘাত করা হবে। ইরানের পক্ষ থেকে জেনারেল সোলাইমানি হত্যার বদলা নেওয়ার ঘোষণা আসার পর ট্রাম্প বলেছেন, ‘ইরান নিজেই অতি দ্রুত ও খুবই ভয়াবহভাবে হামলার শিকার হবে।’
যুক্তরাজ্যের সিক্রেট ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস (এমআই৬)-এর সাবেক প্রধান স্যার জন সোয়ার্স সোলাইমানি হত্যাকাণ্ডকে ‘যুদ্ধের কার্যক্রম’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী বেন ওয়ালেস মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্ক এসপারের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘উদ্ভূত পরিস্থিতি প্রশমিত করতে সব পক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছি।’
ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, ইরাক সরকারের আমন্ত্রণে সেখানে যাওয়া মার্কিন সেনারা ইরান সমর্থিত মিলিশিয়া কর্তৃক বারবার হামলার শিকার হয়েছে। ওই অঞ্চলে ইরানের শত্রুদের ‘খতম’ ও প্রতিবেশী সার্বভৌম জাতির ক্ষতিসাধনের ‘মধ্যমণি’ ছিলেন সোলাইমানি। ওয়ালেস বলেন, ‘আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী মার্কিন নাগরিকদের ওপর আসন্ন হুমকি মোকাবিলার অধিকার যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে।’
হোয়াইট হাউস সূত্র ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছে, শনিবার সন্ধ্যায় আনুষ্ঠানিকভাবে মার্কিন ড্রোন হামলার বিষয়টি কংগ্রেসকে জানানো হয়েছে। এরপর ডেমোক্র্যাটদের অনেক আইনপ্রণেতা ওই হামলার আগাম অনুমোদন নিতে না পারা বা কংগ্রেসকে অবহিত করতে ব্যর্থ হওয়ায় ট্রাম্পের সমালোচনা করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে সামরিক হামলা বা আসন্ন হামলার বিষয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কংগ্রেসকে অবহিত করার নিয়ম রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন ওই হামলার পরিস্থিতি অবহিত করেছে। কারা, কখন হামলা চালিয়েছে, অভিযানের স্থায়িত্ব এবং ইরানের বিরুদ্ধে কোন পরিস্থিতিতে হামলা চালানো হয়েছে কংগ্রেসকে তা অবহিত করেছে ট্রাম্প প্রশাসন।
বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত যুক্তরাজ্য। তবে দেশটির প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন শনিবার রাত পর্যন্ত সোলাইমানি হত্যাকাণ্ড নিয়ে কোনও মন্তব্য করেননি। তবে তার সরকারের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খোলাখুলিভাবেই মার্কিন হামলার পক্ষে কথা বলেছেন।
সোলাইমানিকে হত্যার পরে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে ওয়াশিংটন ও বাগদাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর। এর ফলে ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের একটি সাধারণ ভিত্তি তৈরি হতে পারে। ইরানি কমান্ডারের শোক মিছিলে অংশ নিয়ে ইরাকি কর্মকর্তারা বলেছেন, জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে আসা মার্কিন সেনাদের দেশছাড়া করতে জোর তৎপরতা চালানো হবে।
পপুলার মোবিলাইজেশন ইউনিটের নতুন নেতা হাদি আল আমিরি বলেছেন, ‘পূর্ণ জাতীয় সার্বভৌমত্ব অর্জন করতে ইরাক থেকে মার্কিন সেনাদের বের করে দিয়ে এই হামলার প্রতিশোধ নেওয়া হবে; এ ব্যাপারে নিশ্চিত থাকুন।’
পিএমএফ-এর মুখপাত্র মোহাম্মদ হোসাইন আল জাজিরা-কে জানিয়েছেন, শনিবার শোক মিছিল মধ্য বাগদাদের হারিয়া স্কয়ারে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে নিহতদের প্রতি সম্মান জানানোর পরে মরদেহগুলো শিয়া নগরী কারবালায় নিয়ে যাওয়া হয়। বিকালে সেখানে আরেক দফা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর সেখান থেকে নেওয়া হয় আরেক শিয়া নগরী নাজাফে।
রবিবার কাসেম সোলাইমানির মরদেহ নিজ দেশে পৌঁছালে তার স্মরণে আয়োজিত শোক মিছিলে মানুষের ঢল নামে। নিহত কমান্ডারের জন্য রাজপথে নেমে আসে লাখো মানুষ। আগামী কয়েকদিন ধরে দেশজুড়ে দফায় দফায় তার জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। আগামী ৭ জানুয়ারি সোলাইমানিকে তার নিজ শহর কেরমানে দাফন করা হবে।
ইরানের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রভাবশালী কমান্ডার সোলায়মানিকে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানি রণকৌশলের অগ্রপথিক হিসেবে বিবেচনা করা হতো। শোক মিছিলগুলোতে তাকে ‘ঐতিহাসিক আধ্যাত্মিক নেতা’ হিসেবে উল্লেখ করে সমর্থকরা।
সিরিয়া যুদ্ধে ইরান সমর্থিত আসাদ বাহিনীর পক্ষে সোলায়মানির তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তার দূরদর্শিতায় নিশ্চিত পরাজয় থেকে বেঁচে যান সিরীয় একনায়ক আসাদ। ইরানি কমান্ডার নিহতের খবর তাই রীতিমতো উদযাপন করেছেন সিরিয়ার ইদলিবের বাসিন্দারা। মিষ্টি ও কেক বিতরণ করে সোলাইমানি হত্যাকাণ্ড উদযাপন করে তারা।
ইদলিবে আশ্রয় নেওয়া কয়েকজন সিরীয় নাগরিক মিডল ইস্ট আই-কে বলেছেন, সোলাইমানির নির্দেশে আসাদ বাহিনী বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত অনেক শহর ও নগর অবরোধ করে। এতে বহু মানুষ ভয়াবহ খাদ্য সংকটের মুখে পড়ে।
দামেস্ক থেকে ইদবিলে পালিয়ে আসা বুরহান বলেন, অবরুদ্ধ অবস্থায় আমরা বিড়াল খেয়ে বেঁচে ছিলাম। অনেকে নিজেদের প্রাইভেট কারের বদলে সামান্য চাল কিনতে বাধ্য হয়েছে। সোলাইমানি ও তার যোদ্ধাদের কারণে আমাদের অনেককেই না খেয়ে মরতে হয়েছে। তাই আমরা তার মৃত্যুতে খুশি।
ইদলিবের বাসিন্দাদের এই উচ্ছ্বাস অবশ্য স্থায়ী হয়নি। শুক্রবার সোলাইমানি হত্যাকাণ্ডের দুই দিনের মাথায় ৫ ডিসেম্বর রবিবার সেখানে ফের হামলা চালায় আসাদ বাহিনী। এতে অন্তত ১০ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়। আহত হয়েছে আরও ২০ জন। বরাবরের মতোই হামলায় আসাদ বাহিনীকে সহায়তা দেয় সিরিয়ার ইরান সমর্থিত শিয়াপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো।
ইদলিবের মারাত আল নুমানের বাসিন্দা ছবিই মুস্তাফা-র ভাষায়, ‘এই জেনারেল নিজেই একটা শয়তান ছিল। তার ইতিহাস রক্তে লেখা থাকবে।’ এই রক্ত যেন এখন পুরো অঞ্চলকে ছেয়ে না যায় সেটাই এখন প্রত্যাশা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের। তাদের প্রত্যাশা, সোলাইমানি হত্যাকাণ্ডের পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা যেন শেষ পর্যন্ত এ অঞ্চলকে আরেকটি যুদ্ধের দিকে ঠেলে না দেয়। তথ্য: দ্য গার্ডিয়ান