আসামে বন্দিশিবির নিয়ে সমালোচনার মুখে ভারত

আসামের বন্দিশিবিরকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন নাৎসি কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের সঙ্গে তুলনা করেছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত সাবেক একজন কানাডিয়ান মন্ত্রী। উজ্জল দেব সিং দোসানজি নামের ওই রাজনীতিকের বক্তব্যে কিছুটা ধাক্কা খেয়েছেন ভারতীয় রাজনীতিকরা। কারণ খ্যাতনামা এ রাজনীতিক ভারতপন্থী হিসেবে পরিচিত।noname
দোসানজি বলেন, দার্শনিক ও সমাজ সংস্কারক গুরু নানক আধুনিক বিশ্বের জন্য রোল মডেল। তিনি শিখিয়েছিলেন মানবজাতির জন্য বাতাস হচ্ছে শিক্ষক, পানি হচ্ছে বাবা এবং মাটি হচ্ছে মা। তিনি কখনও পাঞ্জাবি বা আমি বলেননি। একটি বৈশ্বিক ভাতৃত্ব গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন তিনি।

ভারত সরকারের কাছ থেকে ‘প্রবাসী ভারতীয় সম্মান’ পাওয়া দোসানজি বলেন, গুরু নানক এখন বেঁচে থাকলে কখনোই হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকতেন না। তবে রাজনৈতিক কারণে ভারতীয় নীতিনির্ধারকরা এমনকি মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোও এই কথাগুলো নিয়ে কোনও সংবাদ প্রকাশ করেনি।

আসামর ১৯ লাখ মানুষের ভাগ্য এখনও ঝুলে রয়েছে। ২০১৯ সালের ৩১ আগস্ট প্রকাশিত জাতীয় নাগরিকপঞ্জিতে তাদের নাম নেই। আসামের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, কর্তৃপক্ষ এখনও এর বাস্তবায়ন করতে পারেননি। যাদের নাম তালিকায় নেই তাদের ৯০ শতাংশকেই স্পষ্ট কারণ জানাতে পারেননি তারা।

আগেই ঠিক করা হয়েছিলো বাদ পড়াদের আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হবে। যারা মনে করবে এটা ঠিক হয়নি তারা ফরেনার্স ট্রাইবুন্যাল নামে গঠিত হতে যাওয়া বিশেষ একটি বেঞ্চে আবেদন করতে পারবে।

এখন এনআরসি ধসে পড়ায় রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকার দ্বিধায় পড়ে গেছে যে, পরবর্তী ধাপ কী হবে। এনআরসির সাবেক প্রধান সমন্বয়ক প্রতিক হাজেলা আসাম থেকে চলে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে গেছে।

এনআরসি-র প্রত্যেক ধাপেই এখন কাজ ধীরগতির হয়ে গেছে। ভারতজুড়ে তীব্র বিক্ষোভ ও জনরোষের মুখে পড়া ছাড়াও বিদেশ থেকেও চাপ রয়েছে সরকারের ওপর। শিলচরের প্রাত্যাহিক এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, পাঁচ মাস আগে ২২১ জন কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। আসামের বিভিন্ন অঞ্চলে ২০০ ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালও গঠন করা হয়। অনেক টাকা ভাড়া দিয়ে অফিসও নেওয়া হয়েছে। তবে এখনও স্পষ্ট কোনও নির্দেশনা আসেনি।

বর্তমানে আসামে এমন ১০০ ট্রাইব্যুনাল তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। আবেদন পড়েছে ২ লাখেরও বেশি। তাই তালিকার বাইরে থাকা ১৯ লাখ মানুষের আবেদনগুলো নতুন ট্রাইব্যুনালেই জমা হবে কি না সেটাই এখন দেখার বিষয়। 

বিতর্কিত এই আইনের জন্য ইতোমধ্যে এক হাজার ২৮০ কোটি রুপি ব্যয় হয়েছে। ভুলে ভরা এই তালিকা গ্রহণ করেনি আসামের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দল ও সংস্থাগুলো। আর ট্রাইব্যুনালের কর্মকর্তাদের মোটা অঙ্কের বেতন দেওয়া তো এখনও শুরুই হয়নি।

আসাম ও দিল্লিতে রাজনৈতিক দল ও সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে দ্বিধার কারণে এই প্রক্রিয়া আরও ধীরগতির হয়ে গেছে। এক পক্ষ পুরাতন কাজের প্রক্রিয়া রেখে দেওয়ার পক্ষে। তারা মনে করে বাকি থাকা কাজগুলো শেষ করা দরকার। আবার অনেকে মনে করছেন, পুরো তালিকারই পর্যালোচনা করা দরকার। হাজেজা নিজেও মনে করেন, এই তালিকায় অনেক অভিযোগ রয়েছে।

হয়রানির বিষয়টা বাদ দিলেও বেশিরভাগ দলই অভিযোগ করেছে যে, তালিকায় সন্দেহজনক ব্যক্তিদের যুক্ত করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত নাগরিকরাও বাদ পড়েছে। আর এই অভিযোগের পেছনে শক্ত ভিত্তিও রয়েছে।

হাজেজা নিজেও চূড়ান্ত তালিকার অন্তত ২৫ শতাংশ সংশোধন করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তবে সুপ্রিম কোর্ট তার দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। আদালতের নির্দেশ, ৩১ আগস্টের মধ্যে মূল তালিকা প্রকাশ হতেই হবে। কিছু সংখ্যক কর্মকর্তারা মনে করেন, সত্য উদঘাটনে পুরো তালিকা যাচাই জরুরি। অন্যথায় অভিযোগ আসতেই থাকবে। ভুলে ভরা তালিকা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হলে এর গ্রহণযোগ্যতা হারাবে। তার চেয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ-র প্রস্তাব অনুযায়ী, দেশজুড়ে যে তালিকা করা হচ্ছে সেটা বাস্তবায়ন করাই ভালো।

সমালোচনার ঝড় উঠার পর অমিত শাহও বলেছিলেন, আসামের এনআরসি পুনরায় পর্যালোচনা করা হতে পারে। তবে বিজেপির এক পক্ষ তা চায় না। তাদের দাবি, মানুষের ক্ষোভ, বিতর্ক, পরিশ্রম ও অর্থ ব্যয়ে এই তালিকা করা হয়েছে। এটা আর দরকার নেই। ২০২১ সালে আদমশুমারি হবে। সেটার পরিধি বাড়িয়ে এনআরসি-র জন্য প্রয়োজনী তথ্য সম্পর্কে ধারণা নেওয়া যেতে পারে।