বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক বাড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে তার আগে শ্রমিকদের অধিকারের সুরক্ষা ও বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নতি চায় ওয়াশিংটন। বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা ফোরাম চুক্তির (টিকফা) পঞ্চম সভায় এসব কথা উঠে আসে।
টিকফা নিয়ে অনুষ্ঠিত সভায় বাংলাদেশের পক্ষে ২৫ সদস্যের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. জাফর উদ্দীন। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ১৮ সদস্যের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন ইউনাইটেড স্টেটস ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ'র (ইউএসটিআর) দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ ক্রিস্টোফার উইলসন ও ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত আর্ল মিলার। সভা শেষে এক বিবৃতিতে তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি কার্যালয় (ইউএসটিআর)। এতে বলা হয়েছে, শ্রমিকদের অধিকার ও নিরাপত্তা মান নিশ্চিত করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের বিষয়টি বাংলাদেশকে জানানো হয়েছে। তৈরি পোশাক শিল্পে বেসরকারি ও ব্যক্তিগত খাতের অংশীদারদের সহায়তা বাড়াতে বাংলাদেশের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি পোশাকের প্রধান রফতানিকারক দেশ বাংলাদেশ। ২০১৯ সালে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক মোট বাণিজ্যের পরিমাণ মোট ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১৩ সালে উভয় দেশ দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগ চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। আর একারণে এ জাতীয় দ্বিপাক্ষিক আলোচনার সময় প্রায় শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও অধিকারের বিষয়টি উত্থাপিত হয়।
২০১৩ সালে রানা প্লাজা ধসের পর স্থগিত হয়ে যাওয়া জেনারালাইজড সিস্টেম অব প্রেফারেন্স (জিএসপি) সুবিধা পুনরায় চালু করার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ। তবে বিবৃতিতে জিএসপি সুবিধা দাবির বিষয়ে কোনও অগ্রগতির কথা জানায়নি ইউএসটিআর।
আরও পড়ুন: বাণিজ্য সক্ষমতা বাড়াতে বাংলাদেশকে সহায়তার আশ্বাস যুক্তরাষ্ট্রের
ইউএসটিআর’র বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ‘বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সুযোগ বাড়াতে এবং পণ্য ও পরিষেবার বিদ্যমান প্রবাহকে সহজ করার জন্য নিজেদের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশ।’ বৈঠকে ফার্মাসিউটিক্যালস ও চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ব্যবসার সুস্পষ্ট নিয়ন্ত্রণ ও নিরীক্ষণ, মেধাস্বত্ব’র (আইপিআর) কার্যকরী সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা এবং ডিজিটাল অর্থনীতি কার্যকর করতে নেওয়া প্রতিশ্রুতি নিয়েও আলোচনা করেছেন কর্মকর্তারা।
গত কয়েক বছরে শ্রমিকদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাপক সংস্কার-কাজ করেছে বাংলাদেশ সরকার। তা সত্ত্বেও এটার মান নিয়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ মার্কিন ব্যবসায়ী সংস্থাগুলোর। ২০১৮ সালের মে মাস পর্যন্ত কারখানাগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করেছে পোশাক ব্র্যান্ডের অর্থায়নে পরিচালিত আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলো। সে সময় সংস্থাগুলো জানায়, কারখানায় শ্রমিকদের নিরাপত্তায় ‘অভূতপূর্ব উন্নতি’ হয়েছে। এতসব কিছুর পর আবারও নিরাপত্তা উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এবং এটা নিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে।
গত সপ্তাহে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ চুক্তি শিথিল হওয়ায় পোশাক কারখানার মালিকরা, যাদের অনেকে আইণপ্রণেতা, সংবাদপত্র ও টেলিভিশন চ্যানেলের মালিক, তারা শ্রমিকদের নিরাপত্তার দায়-দায়িত্ব নেওয়া থেকে সরে যেতে চান।’
নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টার্ন স্কুল অব বিজনেসের নীতিশাস্ত্র ও অর্থ বিভাগের অধ্যাপক মাইকেল পোসনারকে উদ্ধৃত করে সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, ‘এই প্রক্রিয়াটি (শ্রমিকদের নিরাপত্তা) এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীকে দায়িত্ব দিতে প্রস্তুত নয় বাংলাদেশ সরকার। তাহলে এখন প্রশ্ন হচ্ছে, স্থানীয়দের হাতে এই প্রক্রিয়ার নেতৃত্ব দিলে নিরাপত্তা অগ্রগতি কেমন হবে।’
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচও জানিয়েছে, বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকরা এখনও কম মজুরি ও শোষণের শিকার হচ্ছেন। কারণ ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো কারখানার নিরাপত্তা উন্নতির জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে ব্যর্থ হয়েছে এবং পোশাক সরবরাহকারীদের ওপর দাম কম রাখার ও পোশাক আরও দ্রুত তৈরির জন্য চাপ দিচ্ছেন।