করোনাভাইরাস মহামারির বিরুদ্ধে যুদ্ধ পাল্টে যাচ্ছে। ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের হাতিয়ার থাকা ও না থাকা দেশগুলোর বিভাজন আরও গভীর হচ্ছে। বিশেষ করে অতি সংক্রামক ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ার কারণে ধনী দেশগুলো নিজেদের কাছে থাকা টিকা আরও আঁকড়ে ধরছে। এমন সময় তারা এই পদক্ষেপ নিচ্ছে যখন টিকার অভাবে বিশ্বের অনেক স্থানে মানুষের মৃত্যু হচ্ছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, নতুন করে সংক্রমণ বাড়তে থাকায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ বুস্টার ডোজের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছে। ঝুঁকিপূর্ণ শ্রেণির মানুষকে বুস্টার ডোজ দিয়ে সুরক্ষিত রাখার উদ্যোগ নেওয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে অনেক দেশ।
মার্কিন ও ইউরোপীয় কর্মকর্তারা যুক্তরাজ্যের লকডাউন ও বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করছেন। সমালোচকরা এই সিদ্ধান্তকে বিপজ্জনক ও অনৈতিক পরীক্ষা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু এখন দেশটিতে সংক্রমণ কমে আসায় বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন উচ্চ হারে টিকা দেওয়ার ফলে হয়ত কিছু মাত্রায় হার্ড ইমিউনিটি অর্জিত হয়েছে। কিন্তু এপিডেমিওলজিস্টরা বলছেন, এমনটি বলার মতো সময় এখনও আসেনি।
এদিকে, বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে লাখো মানুষ করোনাভাইরাসের টিকার অপেক্ষায় আছেন। আর এসব দেশে ব্যাপক অর্থে হার্ড ইমিউনিটি এখনও কল্পনাতীত। টিকাদানের হার মন্থর আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ায়। মহামারিতে সবচেয়ে বিপর্যস্ত দেশগুলো এখন এই দুটি এলাকায়। কর্তৃপক্ষ পড়েছেন দ্বিমুখী সংকটে। টিকাদান ছাড়া কীভাবে মৃত্যু কমানো যাবে এবং মানুষকে আর ঘরে রাখা যাচ্ছে না।
আন্তর্জাতিক সংস্থা, মানবিক ত্রাণ সংস্থা, সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ সবাই সতর্ক করে বলছেন, আরও বেশি তথ্য পাওয়ার আগে বুস্টার ডোজের বিষয়ে সিদ্ধান্ত না নিতে। বরং উদ্ধৃত টিকাগুলো যেখানে সংক্রমণ বেশি সেখানে দান করার জন্য। কিন্তু ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট মার্কিন ও ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের হিসেব-নিকেশ পাল্টে দিয়েছে। কর্মকর্তারা মনে প্রাণে সংক্রমণের আরেকটি ঢেউ ও লকডাউন এড়াতে মরিয়া।
বুধবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক টেড্রোস আডানম গেব্রিয়াসিস সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বুস্টার ডোজ প্রয়োগ না করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, ততদিনে প্রতি দেশের অন্তত ১০ শতাংশ মানুষকে টিকাদানের লক্ষ্য অর্জিত হয়ে যাবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মে মাসে বিশ্বের ধনী দেশগুলো প্রতি ১০০ জন মানুষের জন্য প্রায় ৫০ ডোজ টিকা প্রয়োগ করেছে। এরপর এই সংখ্যা আরও বেড়েছে। কিন্তু নিম্ন আয়ের দেশগুলো সরবরাহ ঘাটতির কারণে প্রতি ১০০ জনের জন্য মাত্র ১.৫ ডোজ টিকা দিতে সক্ষম হয়েছে।
জার্মানি ও ফ্রান্স এই আহ্বান উপেক্ষা করে বুস্টার ডোজ প্রয়োগের কথা জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও একই পথে হাঁটতে পারে বলে কর্মকর্তাদের কথায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
ডিউক ইউনিভার্সিটির গ্লোবাল হেলথ ইনোভেশন সেন্টারের সহকারী পরিচালক অ্যান্ড্রিয়া টেইলর জানান, বৈশ্বিক সংক্রমণ ঠেকাতে বুস্টার ডোজকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ফলে উচ্চ আয়ের দেশসহ সবাইকে আরও বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে ফেলা হবে।
তিনি বলেন, যদি জার্মানি, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশ বিশ্বের সবার জন্য দুটি ডোজ নিশ্চিত করার আগে বুস্টার ডোজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে আমরা সত্যিকার অর্থে কোনও সমস্যার সমাধান করছি না। এটি বড় একটি ক্ষতে ব্যান্ড অ্যাইড লাগানোর মতো।
টেইলর আরও বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় যেমন আমরা দেখেছি যখন অনিয়ন্ত্রিত সংক্রমণ ও ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট ছড়িয়েছে তা ঠেকানোর মতো কিছুই ছিল না। এখন এমন পরিস্থিতি আফ্রিকাতেও। ফলে যখন আরও বিপজ্জনক ও আরও বেশি সংক্রামক ভ্যারিয়েন্ট ছড়াচ্ছে তখন আমরা আরও খারাপ পরিস্থিতিতে পড়তে পারি।
ব্যাপক আকারে টিকা উৎপাদনকারী চারটি দেশের মধ্যে ভারত ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট ছড়ানোর পর রফতানি বন্ধ করে। ভারত বন্ধ করার পরও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) রফতানি করেছে খুব সামান্য। যদিও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বড় প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু তা বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
ইউরোপীয় কমিশনের এক মুখপাত্র জানান, ইইউ ৭.১ মিলিয়ন ডোজ অংশীদার দেশগুলোকে দান করেছে। এর মধ্যে কোভ্যাক্স উদ্যোগে দেওয়া হয়েছে ১.৫৯ মিলিয়ন ডোজ। তিনি বলেন, আমরা আশাবাদী সদস্য দেশগুলোকে ২০০ মিলিয়ন ডোজ প্রতিশ্রুতির লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে।
গত সপ্তাহে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডমিনিক রাব ঘোষণা দিয়েছেন, তার দেশ বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে ৯০ লাখ ডোজ টিকা প্রদান করবে। গত মাসে জি-৭ সম্মেলনে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের ১০০ মিলিয়ন ডোজ প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে এগুলো দেওয়া হবে।
যুক্তরাষ্ট্র এখনো্ বুস্টার ডোজ প্রয়োগের ঘোষণা না দিলেও হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব জেন সাকি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছেন। বুধবার তিনি বলেছেন, আমরা দৃঢ়ভাবে মনে করি এটি ভুল পছন্দ। আমরা দুটোই করতে পারি।
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশকে ১১০ মিলিয়ন ডোজ টিকা দেওয়ার বিষয়টি উদযাপন করেছে। এরপরও পুরো পরিস্থিতি যেন একটি বালতিতে এক ফোঁটার মতো। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, মহামারি ঠেকাতে ১১ বিলিয়ন ডোজ টিকার প্রয়োজন। এখন পর্যন্ত কোভ্যাক্স উদ্যোগের মাধ্যমে ১৩৮টি দেশে ১৮৮.১ মিলিয়ন ডোজ সরবরাহ করা হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্তি তুলে ধরে বলছে, সবাই নিরাপদ না হলে কেউই সুরক্ষিত নয়। কারণ যতক্ষণ করোনার সংক্রমণ অনিয়ন্ত্রিত থাকবে ততই নতুন ভ্যারিয়েন্ট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকবে। এমনকি টিকা প্রতিরোধী ভ্যারিয়েন্টও দেখা দিতে পারে। যার ফলে বিশ্বের হুমকি আরও দীর্ঘায়িত হবে।
ডিউক গবেষক টেইলর বলেন, মহামারির এই মুহূর্তে ধনী দেশগুলোর টিকাদানের হার উদযাপন করা একেবারে বেমানান। এই মুহূর্তে যদি আফ্রিকা টিকা ভর্তি একটি বিমান পাঠানো হয় সেটিই খবর।
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসি’র একটি অভ্যন্তরীণ ফাঁস হওয়া নথিতে করোনাবিরোধী যুদ্ধ বদলে যাওয়ার ইঙ্গিত উঠে এসেছে। ওই নথি অনুসারে, ধনী দেশগুলো নিজেদের জনগণকে সুরক্ষার দিকে মনোযোগী হয়ে উঠছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে বেশি মানুষকে টিকা দেওয়ার যে পদক্ষেপের কথা বলা হচ্ছে তাতে বিশ্বের অন্যত্র সংক্রমণ কমবে না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এথিকস কমিটির সদস্য মৌরিন কেলি বলেন, ভ্যাকসিন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে দ্বিধা ও সংশয় অথচ অনেক স্থানে স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রথম ডোজ টিকা পাচ্ছে না। অথচ দরিদ্র দেশে এই স্বাস্থ্যকর্মীরাই করোনা রোগীদের সেবা করছেন। যদি ধনী দেশগুলো নৈতিকতার খাতিরেই আরও বেশি ডোজ শেয়ার না করে তাহলে ভবিষ্যতে হয়ত সীমান্তের ওপারে দেখা দেওয়া নতুন ভ্যারিয়েন্ট তাদের দেশেই ভয়াবহতা চালাবে।