জিকার সংক্রমণজনিত রোগ নিয়েও ২৪ বছর বেঁচে আছেন যে সাংবাদিক

মাইক্রোসেফালিতে ভোগা অ্যানা ক্যারোলিনাজিকা ভাইরাসের কারণে ল্যাটিন আমেরিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়া যে রোগটি নিয়ে গোটা বিশ্ব উদ্বেগে আছে, ২৪ বছর আগে সেই মাইক্রোসেফালি নিয়ে জন্ম নেন অ্যানা ক্যারোলিনা সেসেরেস। অর্থাৎ জন্মের সময় তার মাথা ছিল অস্বাভাবিক আকৃতির এবং ছোট। জন্মের পর চিকিৎসকরা বলেছিলেন, তার বেশিদিন বেঁচে থাকার সম্ভাবনা নেই। ক্যারোলিনা স্বাভাবিক চলাচল করতে পারবেন না বলেও আশঙ্কা জানিয়েছিলেন তারা। তবে তাদের সেইসব আশঙ্কাকে মিথ্যে প্রমাণ করে দিয়েছেন সেইদিনের সে ছোট্ট ক্যারোলিনা। মাইক্রোসেফালিতে আক্রান্ত হয়ে জন্ম নেওয়া এ ব্রাজিলীয় নাগরিক এখন পেশায় সাংবাদিক।
মাইক্রোসেফালিতে আক্রান্ত শিশুদের ভবিষ্যৎ কী হবে তা নিয়ে বাবা-মায়েরা যখন উদ্বেগে রয়েছেন সেসময় নিজের জীবনের গল্প বললেন ক্যারোলিনা। জানালেন, মাইক্রোসেফালিতে আক্রান্ত শিশুর পক্ষেও স্বাভাবিক জীবন-যাপন সম্ভব।
ক্যারোলিনা বলেন, ‘যেদিন আমার জন্ম হলো, চিকিৎসকরা বললেন যে আমার বাঁচার কোনও সম্ভাবনা নেই। আমি হাঁটাচলা করতে পারব না এবং আমার স্বাভাবিক বৃদ্ধি হবে না। তবে অনেকের মতোই তিনি ভুল ছিলেন। আমি বড় হলাম, স্কুলে গেলাম, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লাম। আর এখন আমি একজন সাংবাদিক। আমি ব্লগ লিখি।’

অ্যানা ক্যারোলিনার ছোটবেলার ছবি

যে কারণে সাংবাদিকতায় আসা
সাংবাদিক হওয়ার কারণ বলতে গিয়ে ক্যারোলিনা বলেন, ‘আমার মতো যেসব মানুষের কথা উঠে আসে না তাদের হয়ে কণ্ঠ জোরালো করতেই আমি সাংবাদিকতা বেছে নিয়েছি। আমি মাইক্রোসেফালির জন্য একজন মুখপাত্র হতে চেয়েছিলাম। আমি একটি বইও লিখেছি। সেখানে উঠে এসেছে আমার এবং মাইক্রোসেফালিতে ভোগা অন্যদের জীবনের গল্প। এখন আমি বলতে পারি যে আমি এক পরিপূর্ণ ও সাহসী নারী।’

ব্রাজিলে মাইক্রোসেফালি ঠেকাতে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না বলে হতাশা প্রকাশ করেন ক্যারোলিনা। জনগণকে তথ্য জানানোর ওপর জোর দেন তিনি।

ক্যারোলিনা বলেন, ‘জনগণের উচিত কুসংস্কারকে এক পাশে ঠেলে দিয়ে রোগের লক্ষণগুলো সম্পর্কে জানার চেষ্টা করা। এমনকি স্বাস্থ্যমন্ত্রী এর থেকে বাদ পড়বেন না। তিনি বলেছেন, মাইক্রোসেফালির কারণে ব্রাজিলকে একটি ‘বিকল প্রজন্ম’ বয়ে নিয়ে যেতে হবে। আমি যদি তার সঙ্গে কথা বলতে পারতাম তাহলে বলতাম, স্যার, আপনার এ বিবৃতিই বিকল।’

বেহালা বাজাচ্ছেন মাইক্রোসেফালিতে আক্রান্ত ক্যারোলিনা

সহজ ছিল না জীবন চলার পথ
তবে জীবন চলার পথ অতটা সহজও ছিল না বলে জানান ক্যারোলিনা। তিনি জানান, জন্মের সময় তার ল্যাব টেকনিশিয়ান বাবা বেকার ছিলেন। মা নার্সিং সহকারী ছিলেন। স্বাস্থ্যবীমার আওতায় প্রসবকালীন খরচসহ হাতেগোনা কয়েকটি খরচ বিনামূল্যে পাওয়া গেলেও অন্য পরীক্ষাগুলো করা হয় না এবং তা খুব ব্যয়সাধ্য।  তবে সে সময় যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী আত্মীয়রা সহায়তা করেছেন বলে জানান ক্যারোলিনা। তিনি বলেন, ‘আমার ৫টি অপারেশন হয়েছিল। এরমধ্যে জন্মের ৯ দিনের মাথায় প্রথম অপারেশন হয় কারণ আমি ঠিকমতো শ্বাস নিতে পারছিলাম না। কিন্তু এগুলো তেমন কিছু নয়। এর জন্য ওষুধ আছে যা দিয়ে রোগটি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। ১২ বছর বয়স পর্যন্ত আমি ওষুধ সেবন করেছি। এরপর আর তার প্রয়োজন পড়েনি। এখন আমি বেহালাও বাজাতে পারি।'

গর্ভপাত না করানোর আহ্বান

মাইক্রোসেফালিতে আক্রান্ত শিশু জন্ম দেওয়ার ভয়ে গর্ভপাতেরও বিরোধিতা করেন ক্যারোলিনা। তিনি বলেন, ‘মাইক্রোসেফালির ব্যাপারগুলো খুব অনিশ্চিত। আপনি খুব জটিলতায় ভুগতে পারেন, আবার নাও ভুগতে পারেন। আর তাই যারা গর্ভপাত করছেন, আমি বলব তারা তাদের সন্তানদের সফল হওয়ার সুযোগ নষ্ট করছেন। মাইক্রোসেফালিতে আক্রান্ত অন্য অনেক শিশুর মত আমিও বেঁচে আছি কারণ আমাদের মায়েরা গর্ভপাত করাননি।’

সবাই তার মতো ভাগ্যবান নন বলে স্বীকার করেন ক্যারোলিনা। তবে এ ব্যাপারে মাইক্রোসেফালি আক্রান্ত শিশুর মা ও গর্ভবতী নারীদের উদ্বিগ্ন না হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। এছাড়া শিশুর জন্মের আগেই স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেয়ারও তাগিদ দেন ক্যারোলিনা। সূত্র: বিবিসি

/এফইউ/