ফিলিপাইনের সেই ব্যাংকের সিইও নিজেই সাইবার ডাকাতিতে জড়িত!

বাংলাদেশ ব্যাংকের ৮১ মিলিয়ন ডলার পাচার হওয়ার বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ছিল ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং কর্পোরেশনের (আরসিবিসি)আরসিবিসি প্রেসিডেন্ট এবং সিইও লরেঞ্জো তান। ব্যাংকের জুপিটার স্ট্রিট শাখার ব্রাঞ্চ ম্যানেজার মাইয়া সান্তোস দিগুইতো পরোক্ষভাবে এই দাবি করেছেন। ফিলিপাইনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইনকোয়ারার খবরটি নিশ্চিত করেছে।

তান এই অর্থপাচারের বিষয়ে অবগত ছিলেন কিনা, জিজ্ঞেস করা হলে দিগুইতো জানান, তিনি এ সম্পর্কে অবগত থাকতে পারেন। তিনি আরও বলেন, ‘আমি তাকে দোষারোপ করছি না। আমি শুধু ধারণা করছি, কারণ অর্থের পরিমাণটা বিশাল। আর এই অর্থ ব্যাংক থেকে তুলে নেওয়ার পূর্বে ব্যাংকের কোষাগারে জমা করা হয়েছে। আর এ সম্পর্কে তার অবগত না থাকার কথা না।’

লরেঞ্জো তান

দিগুইতো আরও বলেন, ‘ওই ৮১ মিলিয়ন ডলারের সাথে আরও পেমেন্ট এসেছিল, যা জমা না দিয়ে ফেরত নিয়ে নেওয়া হয় বলে ব্যাংকের সেটলমেন্ট বিভাগ থেকে আমাকে ফোন করা হয়েছিল। তবে তার পরিমাণটা কতো, এ সম্পর্কে আমি জানি না।’ অর্থ স্থানান্তরের বিষয়ে জড়িত থাকার প্রশ্নে দুগুইতো বলেন, ‘তারা আমাকে ফোন করেনি। কেবল ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অর্থ স্থানান্তর করা হয়। এখানে আমার কি অপরাধ!’

এদিকে আরসিবিসি প্রেসিডেন্ট এবং সিইও লরেঞ্জো তানের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে ফিলিপাইনের সংবাদমাধ্যম ইনকোয়ারার। এ সম্পর্কে তিনি ইনকোয়ারারকে বলেছেন, ‘ব্যাংকের উচ্চস্তরের কর্মকর্তারা ওই বিশাল অংকের অর্থপাচারের সাথে যুক্ত রয়েছে বলে যে বিদ্বেষপূর্ণ এবং মামলাযোগ্য অভিযোগ আনা হয়েছে, আমি তার বিরোধিতা করছি।’ তান আরও বলেন, ‘আমি চলমান তদন্তের সাথে সম্পূর্ণভাবে সহযোগিতা করবো এবং আমি বিশ্বাস করি যে, আমি সহ ব্যাংকের পরিচালকরা নির্দোষ প্রমাণিত হবো।’

rcbc-1

শুক্রবার তানের আইনজীবী ফ্রান্সিস লিম জানিয়েছেন, তান তদন্তের স্বার্থে অফিস থেকে ছুটিতে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘ব্যাংকের পরিচালকরা তানের ভদ্র আচরণের প্রশংসা করেন, কিন্তু তার ওপর তাদের আস্থা অটুট রয়েছে।’ অর্থপাচারের অভিযোগে তদন্তের আওতায় থাকা ছয় সন্দেহভাজনের একজন ব্যবসায়ী উইলিয়াম এস. গো তদন্তকারী সংস্থা এনবিআই-এর কাছে এক অ্যাফিডেভিটে জানিয়েছেন, অর্থপাচারের উদ্দেশে আরবিসিবি-র ওই ব্রাঞ্চে তার নামে দুটি ভুয়া অ্যাকাউন্ট খোলা হয়। যেখানে আরসিবিসি প্রধান দফতরেরও অনুমোদন রয়েছে।

দেগুইতো জানিয়েছেন, তিনি গো কোম্পানিকে চেনেন। কিন্তু এর আগে গো কোম্পানির আইনজীবী র‍্যামন এসগোয়েরার মাধ্যম করা ভুয়া অ্যাকাউন্টের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। গো কোম্পানি অভিযোগ করেছিল, দেগুইতো ভুয়া স্বাক্ষর এবং দলিলের মাধ্যমে গো কোম্পানির নামে অ্যাকাউন্ট খুলেছিল। দেগুইতো গো কোম্পানিকে ১০ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বলে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, সেটিকেও তিনি অস্বীকার করেন। দিগুইতো এ সম্পর্কে বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে সিনেটকে উত্তর দিব।’

উল্লেখ্য, সিনেট কমিটির শুনানি সামনে রেখেই দিগুইতো দেশের বাইরে চলে যাচ্ছিলেন। শুক্রবার বিকেলে সন্দেহভাজন ব্যাংক ম্যানেজার মাইয়া সান্তোস দিগুইতোকে ম্যানিলার নিনয় আকিনো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আটকে দেয়া হয়। জাপানের নারিতায় যাওয়ার উদ্দেশে যাচ্ছিলেন তিনি। দিগুইতো বলেন, ‘ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা আমাকে অ্যান্টি মানিলন্ডারিং কাউন্সিলের একটি চিঠি দেখান। ওই চিঠিতে বলা হয়, অর্থপাচারের সঙ্গে আমার যোগসাজশ রয়েছে। যদিও আমাকে অভিযুক্ত করে কোনো মামলা হয়নি।’

বিমানবন্দরে আটক মাইয়া সান্তোস দিগুইতো

ফিলিপাইনের অভিবাসন ব্যুরোর মুখপাত্র নিকি রেয়েস জানান, বিচার বিভাগের নির্দেশিত তালিকায় দিগুইতোর নাম রয়েছে। এজন্যই তাকে দেশের বাইরে যেতে দেওয়া হয়নি। এক সূত্রের বরাতে ইনকোয়ারার জানিয়েছে, সিনেট তদন্ত দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সিনেটর সার্জ ওসমেনা, তিনি দিগুইতোকে দেশের বাইরে যেতে না দেওয়ার অনুরোধ জানান বিচার বিভাগের কাছে। আরসিবিসি আইনজীবীরাও ওসমেনাকে একই অনুরোধ করেন।

দিগুইতো বলেন, ‘আমি শুধুমাত্র একজন সাধারণ কর্মী। আমি শুধু জানি, আমি কোনও ভুল কাজ করিনি। আমি কোনও চুরি করিনি। এসবের মধ্যে আমি নেই। তিনি দাবি করেন, তাকে ফাঁসানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘আমার মনে হচ্ছে, আমি এখন জেলখানাতেই আছি।’ দিগুইতো অর্থপাচারের অভিযোগ থাকা মাইকেল ফ্রান্সিসকো ক্রুজ, জেসি ক্রিস্টোফার লাগরোসাস, এনরিকো তেওদোরো ভাসকুয়েজ এবং আলফ্রেড সান্তোস ভারগারাকেও সনাক্ত করেন। যারা তার ব্রাঞ্চে অ্যাকাউন্ট খুলেছিলেন। যার মাধ্যমে ওই অর্থপাচারের ঘটনা ঘটে।

উল্লেখ্য, হ্যাকাররা বাংলাদেশ ব্যাংকের পুরো সিস্টেম নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কের বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ অ্যাকাউন্ট থেকে ৮১ মিলিয়ন ডলার ফিলিপাইনের আরসিবিসি ব্যাংকের জুপিটার স্ট্রিট শাখার ৪টি অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করেন। সেখান থেকে ওই অর্থ ফিলিপিনো পেসোতে রূপান্তরের পর দুটি ক্যাসিনোতে পাঠানো হয়। সূত্র: ইনকোয়ারার। 

/এসএ/বিএ/