হিজবুল্লাহর হামলায় প্রকাশ পেলো ড্রোনের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের দুর্বলতা

চলতি সপ্তাহে উত্তর ইসরায়েলের একটি সামরিক ঘাঁটিতে হিজবুল্লাহর ড্রোন হামলার কিছুক্ষণ আগে সন্দেহজনক একটি এয়ারক্র্যাফটের উপস্থিতি নিয়ে বিমানবাহিনীকে দেশটির পুলিশ সংস্থার পক্ষ থেকে সতর্ক করা হয়। তবে এ বিষয়ে পুলিশকে মাথা ঘামাতে নিষেধ করে বিমানবাহিনী। কেননা ওই বাহনটি ছিল ইসরায়েলি।  আশ্বাস পেয়ে বিষয়টি নিয়ে পুলিশও আর খুব একটা গা করেনি। তবে বিমানবাহিনীর মূল্যায়নকে ভুল প্রমাণ করে কিছুক্ষণ পরেই ড্রোন হামলা চালায় হিজবুল্লাহ। হামলায় চার সেনা নিহত ও অনেক মানুষ আহত হয়। এই হামলাসহ শেষ কয়েকটি ঘটনায় মনুষ্যবিহীন এয়ারক্র্যাফটের ঝুঁকি মূল্যায়নে ইসরায়েলের দুর্বলতা প্রকাশ্যে চলে এলো। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস এ খবর জানিয়েছে।

জুলাই মাসে, তেল আবিবের একটি আবাসিক ভবনে ইয়েমেনি হুথি গোষ্ঠীর আক্রমণে এক বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। গত সপ্তাহে তেল আবিবের একটি নার্সিং হোমে হামলা চালায় হিজবুল্লাহ। এই হামলায় কেউ হতাহত হননি।

বছরের শুরুর দিকে হাইফার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর একটি ড্রোন ভিডিও প্রচার করে হিজবুল্লাহ। ভিডিও ধারণের জন্য ইসরায়েলি ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে উড়ে গেলেও দেশটির সেনাবাহিনী তা শনাক্ত করতে পারেনি।

সর্বশেষ হামলার মধ্য দিয়ে হিজবুল্লাহ নিজেদের সক্ষমতার আবারও প্রমাণ দিলো। ইসরায়েলি হামলায় দলটির নেতৃত্ব প্রায় ধসে পড়ার পরও তাদের আক্রমণে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র গত রবিবার বলেছেন, ‘আমাদের আরও ভালো প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার।’

সামরিক বাহিনী পরিচালিত রেডিও চ্যানেল গ্যালেই তেযাহালের সঙ্গে সাক্ষাৎকারকালে নিজের ক্ষোভ ঝাড়েন ভিকি কাদোস। তিনি বলেছেন, ‘হামলার মিনিট দশেক আগে আমরা ফোন দিয়ে কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করার চেষ্টা করি। এয়ারক্র্যাফটি বেশ নিচু দিয়ে উড়ছিল। আমরা এর শব্দ শুনেই বুঝেছিলাম, কোনও একটা গন্ডগোল আছে।’

ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে কোনও বিবৃতি দেওয়া হয়নি।

ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত ও বিধ্বস্ত করার বিশ্বমানের প্রযুক্তি রয়েছে ইসরায়েলের। কিন্তু মনুষ্যবিহীন এয়ারক্র্যাফট চিহ্নিত করতে তাদের রাডার ব্যবস্থা বেশ হিমশিম খাচ্ছে।

উচ্চ গতিসম্পন্ন ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় ড্রোনে ধাতব পদার্থের পরিমাণ অনেক সময় কম থাকে বলে সেগুলো অনেক সময় রাডারে হুমকি হিসেবে ধরা পড়ে না। আবার ধরা পড়লেও বেশ নিচু দিয়ে ওড়ার কারণে এগুলোকে অনেক সময় ইসরায়েলি এয়ারক্র্যাফট ও ব্যক্তিগত বিমান মনে করে অপারেটররা।

ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর ড্রোন বিভাগের সাবেক প্রধান ওফের হারুভি বলেছেন, ‘ইসরায়েলসহ পশ্চিমা বিশ্বের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উচ্চ গতির ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলা ঠেকানোর জন্য গড়ে তোলা। এসব ধীরগতির শত্রু এয়ারক্র্যাফট শনাক্ত ও ধ্বংস করার জন্য আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সংশোধন করা দরকার।’

গাজা ও লেবানন থেকে নিক্ষিপ্ত বেশিরভাগ রকেটই ইসরায়েলের ‘আয়রন ডোম’ ব্যবস্থা প্রতিহত করে থাকে। আর তাদের ‘অ্যারো থ্রি’ প্রযুক্তি ইরানের দুটি ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার অনেকটাই ঠেকিয়ে দিয়েছে। দেশটির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে তাদের আরেকটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী প্রযুক্তি দিতে যাচ্ছে মার্কিন প্রশাসন। এই প্রযুক্তির নাম টার্মিনাল হাই অল্টিচিউড এরিয়া ডিফেন্স সিস্টেম বা থাড।

তবে ইসরায়েলের ড্রোন প্রতিরোধী ব্যবস্থার পুনর্গঠন আগে প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

সামরিক বাহিনীর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ ও ড্রোন শনাক্তকারী প্রযুক্তি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান আরটু ওয়্যারলেসের প্রধান অন ফেনিগ বলেছেন, ইসরায়েলের ড্রোন প্রতিরোধ ব্যবস্থা মূলত রাডারভিত্তিক। বিমানের মতো বৃহৎ আকারের ধাতব বস্তু থেকে প্রতিফলিত তরঙ্গ শনাক্তের মাধ্যমে এটি কাজ করে।

ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে তিনটি বিকল্পের ধারণা দেন তিনি। ড্রোন থেকে নির্গত তরঙ্গ শনাক্তকরণে সক্ষম রিসেপটর যন্ত্র, ড্রোনের উপস্থিতির দৃষ্টিগ্রাহ্য লক্ষণ শনাক্ত করতে সক্ষম অপটিক্যাল সেন্সর ও ড্রোনের ইঞ্জিনের শব্দ শনাক্তে সক্ষম অ্যাকুয়াস্টিক সেন্সর।

প্রতিটি পদ্ধতিতেই সুবিধা ও অসুবিধা রয়েছে। তাই সব পদ্ধতি যাচাই করেই একটি সমন্বিত ড্রোন শনাক্তকরণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে বলে মত দেন ফেনিগ। 

তিনি বলেছেন, ‘আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনতে হবে। কারণ সব সমস্যা সমাধান করবে, এমন কোনও একক ব্যবস্থা নেই।’