থাইল্যান্ডে চার রোহিঙ্গার মরদেহ উদ্ধার, এইচআরডব্লিউ-এর উদ্বেগ

থাইল্যান্ডে বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গা আশ্রয়প্রার্থীকে মৃত ও বাকিদেরকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৭ অক্টোবর) দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে একটি মঠের বাইরে তাদেরকে দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থায় দেখতে পান সন্ন্যাসীরা। পরে পুলিশকে খবর দেন তারা। এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। তাদের ওয়েভসাইটে এই খবর জানানো হয়েছে।

উদ্ধারকৃতদের মধ্যে অনেকেই অচেতন অবস্থায় ছিলেন। তাদের মধ্যে ১০ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। ইতোমধ্যেই দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। জীবিতদের ব্যাংকক থেকে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার দূরের একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেখানে অপর একজনের মৃত্যুর হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া ডিরেক্টর ইলেইন পিয়ারসন বলেছেন, ‘থাই সরকারের উচিত এই ভয়াবহ মৃত্যুর যথাযথ তদন্ত করে দায়ীদের বিচারের সম্মুখীন করা। অপরাধীরা যে ই হোক না কেন, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। আর জীবিতদের চিকিৎসাসহ প্রয়োজনীয় সব সহায়তা প্রদান করতে হবে।’

জীবিতদের প্রাথমিক বয়ান অনুযায়ী, রাখাইন রাজ্য থেকে প্রায় ৭০ জন রোহিঙ্গার একটি দল বুধবার থাইল্যান্ড পৌঁছায়। সেখান থেকে মালয়েশিয়া সীমান্তে এক হাজার পাঁচশ কিলোমিটারের যাত্রার জন্য তাদেরকে গাদাগাদি করে মালবাহী ফ্রিজিং ট্রাকে ওঠানো হয়। প্রায় হাজারখানেক কিলোমিটার যাওয়ার পর ট্রাক থামিয়ে চালকরা বেশ কয়েকজনকে নামিয়ে দেয়। তাদের মধ্যে কেউ ট্রাকের ভেতরে পিষ্ট হয়ে মারা গেছে বা জ্ঞান হারিয়েছে, অথবা যাত্রা সম্পন্ন করার জন্য শারীরিকভাবে যথেষ্ট সক্ষম ছিলেন না।

মানবাধিকার সংস্থা ও গণমাধ্যমগুলো বহু বছর ধরেই থাইল্যান্ডে মানব পাচার চক্র নিয়ে সতর্ক করে আসছে। মিয়ানমার থেকে প্রাণভয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা মালয়েশিয়া পৌঁছাতে প্রায়ই থাইল্যান্ডকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। মালয়েশিয়াতে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ বাস করছে।

রাখাইন রাজ্যে নিজেদের ঘরবাড়ি ও বাংলাদেশের আশ্রয়শিবির থেকে পালিয়ে যাওয়া রোহিঙ্গারা থাই সরকারের কাছে খুবই কম সুরক্ষা পেয়ে থাকে বলে অভিযোগ করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।  
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা, অগ্নিসংযোগসহ বিভিন্ন রকম অমানবিক আচরণের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মি। প্রায় ৬ লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গা বৈষম্যবাদী এক শাসন ব্যবস্থার অধীনে মানবেতর অবস্থায় রয়েছে। আর গত নভেম্বরে পুনরায় শুরু হওয়া সংঘাতে উদ্বাস্তু হয়েছে প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার মানুষ।

২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের আট হাজারের বেশি রোহিঙ্গা ঝুঁকিপূর্ণ নৌপথ ব্যবহার করে অন্যত্র আশ্রয় খোঁজার চেষ্টা করেছেন। তাদের মধ্যে অন্তত ছয়শ’ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন বা নিখোঁজ রয়েছেন।

থাইল্যান্ডে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ‘শরণার্থী’ অবস্থা যাচাই করতে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থাকে (ইউএনএইচসিআর) অনুমতি দেয় না থাই সরকার। থাইল্যান্ড ১৯৫১ সালের ‘রিফিউজি কনভেনশনের’ স্বাক্ষরকারী নয়। এছাড়া, তাদের আইনে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত শরণার্থীর সংজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত করেনি।

জীবন বাঁচাতে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদেরও অবৈধ অভিবাসী হিসেবে গণ্য করে থাই সরকার। সেখানকার অভিবাসন বিষয়ক কর্মকর্তারা রোহিঙ্গা পুরুষদের দেশের বিভিন্ন কারাগারে আটকে রাখার ব্যবস্থা করেছে। এসব ‘ডিটেনশন সেলে’ বায়ু চলাচল, খাদ্য, পানি, চিকিৎসা সবই অত্যন্ত অপ্রতুল। আটক থাকা অবস্থায় বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গার মৃত্যু হওয়ার রেকর্ডও রয়েছে।

রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদের সামাজিক উন্নয়ন ও মানব নিরাপত্তা মন্ত্রণালয় পরিচালিত আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠিয়েছে থাই সরকার। আশ্রয়প্রার্থীদের দীর্ঘদিন আটকে রেখে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের লঙ্ঘন করছে দেশটি। এছাড়া, জীবন বাঁচাতে বা নির্যাতন থেকে রক্ষা পেতে পালিয়ে আসা কাউকে জোরপূর্বক ফেরত পাঠানোও আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থি।

পিয়ারসন বলেছেন, ‘থাই সরকারের উচিত শোষণের হাত থেকে পালিয়ে আসা মানুষগুলোর ভোগান্তি আরও না বাড়িয়ে বরং তাদের পাশে দাঁড়ানো।’