কেমন আছে ইউক্রেনে যুদ্ধের মধ্যে জন্ম নেওয়া শিশুরা?

ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে আড়াই বছরের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধের প্রভাব ভূরাজনীতির গণ্ডি ছাড়িয়ে পরবর্তী প্রজন্মের মনস্তত্বেও মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। যুদ্ধকালীন সময়ে জন্ম নেওয়া শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য ভয়াবহ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা তাদের ভবিষ্যৎ জীবন ও পর্যায়ক্রমে পুরো সমাজে গভীর প্রভাব ফেলবে। ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা রয়টার্সের শনিবার (১৬ নভেম্বর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এক মায়ের বয়ানে সমগ্র পরিস্থিতি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়।

প্রায় তিন বছর আগে চতুর্থ সন্তানের জন্ম দিতে হাসপাতালে যাওয়ার পথে ইউক্রেনের রাস্তায় লাশ পড়ে থাকতে দেখেন ৪২ বছর বয়সী লিউডমিলা রোডচেংকো। সেগুলো কম্বল দিয়ে ঢেকে রাখা ছিল। তার সন্তান ইয়েভহেন স্টেপানেংকোর জন্মের পরদিন একটি রুশ ট্যাংক হাসপাতালের সামনে এসে অবস্থান নেয়। তখন ডিজেল জেনারেটরের সাহায্যে হাসপাতালের কার্যক্রম চালু রাখা হয়েছিল। রুশ বাহিনী তাদের আগ্রাসন শুরু করলে রোডচেংকো সদ্যজাতসহ বাকি তিন সন্তান নিয়ে জন্মস্থান বুচা শহর ছেড়ে কেন্দ্রীয় পোলটাভা এলাকায় আশ্রয় নেন।

সেই দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে রোডচেংকো বলেন, 'আমরা জানতাম না এরপর কী ঘটতে পারে। জন্মের তিন দিন পরেই আমার সন্তান ভয়াবহ এক অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে গেছে।'

বাচ্চার জন্য দুধ তৈরি করতে তল্লাশি চৌকিতে থাকা সেনাদের কাছ থেকে গরম পানি সংগ্রহ করতেন তিনি।

যুদ্ধকালীন সময়ে হাজার হাজার জন্ম নেওয়া শিশুদের একজন রোডচেংকোর চতুর্থ সন্তান। প্রায় একহাজার দিন ধরে চলছে এই যুদ্ধ।

যুদ্ধের শুরুতে রোডচেংকো বুচা থেকে পালাতে সক্ষম হন। পরে এই শহরটি রুশ নির্যাতনের প্রতীক হয়ে ওঠে। সেখানে সড়কের পাশে কয়েক ডজন নাগরিকের মৃতদেহ পাওয়া যায়। মস্কো অবশ্য হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

যুদ্ধের বাস্তবতা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন রোডচেংকো। এখন তিনি সন্তানদের জন্য যথাসম্ভব স্বাভাবিক একটি জীবন নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছেন। তার আশঙ্কা, যুদ্ধ আরও অনেক বছর চলতে পারে। ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে গ্রামের পর গ্রাম দখল করে চলেছে রাশিয়া। আর হোয়াইট হাউজে ডোনাল্ড ট্রাম্প ফিরে আসবার পর ইউক্রেন তাদের গুরুত্বপূর্ণ মিত্রকেও হারাতে পারে।

সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন রোডচেংকো মনেপ্রাণে যুদ্ধের অবসান চান। তিনি বলেছেন, 'আমি চাই আমার সন্তানদের একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ থাকুক। স্কুল থেকে ফিরে তারা সরাসরি বেসমেন্টে চলে যায়। এই অবস্থা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে।'

যুদ্ধের কারণে ইউক্রেনের লাখ লাখ মানুষ বাড়িঘর হারিয়েছেন। অনেক নারী শিশু সন্তান নিয়ে দেশ ছেড়েছেন। রোডচেংকো নিজেও দেশ ছাড়ার কথা ভেবেছিলেন, কিন্তু তার জন্য সেটা অনেক ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে।

বুচা শহরের একটি নার্সারি স্কুলের শিক্ষক নাটালিয়া তাতুশেংকো বলেছেন, যুদ্ধের সময় জন্মানো শিশুদের মধ্যে অতিরিক্ত সংবেদনশীলতার প্রবণতা রয়েছে। তারা মায়ের কাছ থেকে আলাদা হতে খুব ভয় পায়। তারা এখনও ছোট ও স্বাভাবিক শিশুদের মতোই আচরণ করছে। তবে বড় হওয়ার পর অন্যদের থেকে তাদের আচরণে পার্থক্য দেখা দিতে পারে।