পৃথক পৃথক বিস্ফোরণে দেশটির কর্তৃপক্ষের তরফে এ পর্যন্ত ২৬ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হলেও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ৩৪ জনের প্রাণহানির খবর জানানো হয়েছে। মঙ্গলবার বিমানবন্দরে বিস্ফোরণের ঘটনায় ১১ জন নিহত এবং ৮১ জন আহত হয়েছেন বলে বেলজিয়ামের স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিশ্চিত করেছেন। আর মালবিক স্টেশনে বিস্ফোরণের ঘটনায় ১৫ জন নিহত ও ৫৫ জন আহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছেন ব্রাসেলসের পরিবহন কর্মকর্তারা। তবে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের বরাতে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান প্রাণহানির সংখ্যা ৩৪ বলে জানিয়েছে। এর মধ্যে ২০ জন মেট্রো স্টেশনের হামলায় এবং ১৪ জন বিমানবন্দরে হামলার ঘটনায় নিহত হন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিস্ফোরণের পর দেশটিতে সর্বোচ্চ সন্ত্রাসী সতর্কতা জারি করা হয়েছে। হামলার পর বিমান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে গোটা মেট্রো ব্যবস্থাও।
বিস্ফোরণের ঘটনাকে সন্ত্রাসী হামলা উল্লেখ করে বহু মানুষের প্রাণহানি হয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী চার্লস মাইকেল। তবে হতাহতের সংখ্যা জানাননি তিনি। বিস্ফোরণের পর বেলজিয়ামসহ ইউরোপের বিভিন্ন স্থানে নিরাপত্তা জোরদার হয়েছে। হামলাকে ঘৃণা ও সহিংসতার আরেক নজির বলে উল্লেখ করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
বোমা হামলার জন্য ব্রাসেলসের দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানকে বেছে নেওয়া হয়েছে। ব্রাসেলসের জাভেনতেম বিমানবন্দর এবং ইইউ ইন্সটিটিউশনের কাছের মালবিক মেট্রো স্টেশনে পৃথক বোমা হামলা চালানো হয়। এখনও পর্যন্ত মঙ্গলবার সকালে চালানো ওই সন্ত্রাসী হামলার খুব সামান্য তথ্যই সামনে এসেছে। তবে গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, শুক্রবার জ্যেষ্ঠ নীতিনির্ধারকরা বলেছিলেন, আব্দেসলামের গ্রেফতার আইএসের জন্য এক ‘বড় আঘাত’, তবে এখন মনে হচ্ছে, সেই আঘাত এতোটা বড়ও ছিল না। ব্রাসেলসে চালানো হামলা নিশ্চিতভাবেই এর চেয়ে কম বড় নয়।
গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সন্ত্রাসীদের ক্ষেত্রে এটা দেখানো জরুরি যে, এতো চাপের মধ্যেও তারা জনগণের মাঝে সহিংসতার মাধ্যমে সন্ত্রাসপ্রবণ, সামরিকীকরণ এবং মেরূকরণ করতে সক্ষম। এখানে প্রতিশোধের বিষয়টি মুখ্য নয়। বরং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে তাদের সক্ষমতা প্রদর্শনটাই এখানে মূল বিষয়। তারা হয়তো আঘাতপ্রাপ্ত, কিন্তু বিলুপ্ত নয়! গার্ডিয়ানের আশঙ্কা, এই বিবেচনায় আব্দেসলামের গ্রেফতারের সঙ্গে এই হামলার যোগাযোগ থাকতে পারে।
রবিবার বেলজিয়ামের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিদিয়ের রেইনডারস দাবি করেন, আব্দেসলাম রাজধানী ব্রাসেলসে একটি নতুন সন্ত্রসী হামলার পরিকল্পনা করছিলেন বলে তদন্ত কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন। রেইনডারস বলেছিলেন, ‘তিনি ব্রাসেলসে আবারও কিছু করতে চেয়েছিলেন। আর সম্ভবত এটা বাস্তব। কারণ আমরা প্রাথমিক অনুসন্ধানে অনেক অস্ত্রের সন্ধান পেয়েছি, যার মধ্যে রয়েছে ভারী আগ্নেয়াস্ত্র। আমরা ব্রাসেলসে তাকে ঘিরে একটি নেটওয়ার্কের সন্ধানও পেয়েছি।’ গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, তবে কি সেই নেটওয়ার্কই এই হামলা চালালো?
গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, তদন্ত সংস্থা এখনও ওই নেটওয়ার্কের সব তথ্য বের করতে পারেনি। গত বছর নভেম্বরে প্যারিস হামলার পর থেকে দুই সন্দেহভাজন ব্যক্তি পলাতক রয়েছেন। আব্দেসলামের বাল্যবন্ধু মোহামেদ আবরিনি, নভেম্বরে ওই হামলার পর থেকেই তিনি নিখোঁজ রয়েছেন। মরোক্কান বংশোদ্ভূত আবরিনিকে প্যারিস হামলার অন্যতম প্রধান সন্দেহভাজন বলে মনে করা হয়। তার বিরুদ্ধে চার মাস আগে আন্তর্জাতিক গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়।
পুলিশ সুফিয়ান কায়াল নামক অপর এক সন্দেহভাজনেরও খোঁজ করছে। ওই ব্যক্তি ৯ সেপ্টেম্বর অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সীমান্ত পার হওয়ার সময় ভুয়া কাগজপত্র প্রদর্শন করেন। তিনি আব্দেসলাম এবং মোহামেদ বেলকাইদের সঙ্গে ছিলেন বলে জানা গেছে। তারা নিজেদের ভিয়েনায় ছুটি কাটাতে যাওয়া পর্যটক হিসেবে উল্লেখ করেন। উল্লেখ্য, মোহামেদ বেলকাইদ ব্রাসেলসে চালানো নিরাপত্তা বাহিনীর এক অভিযানে গত মঙ্গলবার নিহত হন।
তবে আব্দেসলামের ওই নেটওয়ার্ক কেবল উল্লিখিত তিন জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আরও অনেকেই সেই নেটওয়ার্কে যুক্ত। গুটিকয়েক ব্যক্তি নয়, বিভিন্ন স্তরে অনেক ব্যক্তি ওই নেটওয়ার্কে যুক্ত থাকতে পারে। কেউ কেউ হয়তো জানেনও না যে, তিনি একটি সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের অংশ।
উল্লেখ্য, স্থানীয় সময় মঙ্গলবার সকাল ৮টার কিছু আগে ব্রাসেলসে জাভেনতেম বিমানবন্দরে জোড়া বিস্ফোরণ ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে সংবাদমাধ্যমগুলো জানায়, হামলার সময় লোকজন টার্মিনাল ছেড়ে আতঙ্কে চারদিকে ছোটাছুটি করতে থাকে। তাৎক্ষণিকভাবে বিস্ফোরণের কারণ জানা যায়নি। তবে একজন লোক হামলার আগে আরবিতে চিৎকার করে সবাইকে বিমান বন্দরে আসতে নিষেধ করছিলেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করা বিভিন্ন ছবিতে বিমানবন্দরের টার্মিনাল ভবন থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখা গেছে। বিমান বন্দরের কয়েকটি এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
এদিকে বিমানবন্দরের হামলার এক ঘণ্টার মধ্যেই ইইউ ইন্সটিটিউশনের কাছের মালবিক মেট্রো স্টেশনে আরেকটি বিস্ফোরণ হয়েছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো। ঘটনার পর ইইউ ইন্সটিটিউশনের সব বৈঠক বাতিল করা হয়েছে।
এদিকে বেলজিয়ামের স্থানীয় এক সংবাদমাধ্যমের বরাতে বিবিসি জানিয়েছে, আরও বেশ কয়েকটি বোমা উদ্ধার করা হয়েছে। বিমানবন্দরে জোড়া হামলার একটি আমেরিকান এয়ারলাইন্সের চেক ইন এলাকাতে হয়েছে। তবে এর সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, বিবিসি।
/এফইউ/বিএ/