যখন কোনও যান্ত্রিক বা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং বড় কোনও ট্র্যাজেডি আঘাত হানে, তখন প্রায়শই সাধারণ মানুষেরাই অসাধারণ সব কাজ করতে এগিয়ে আসেন। বুধবার সকালে দক্ষিণ দিল্লির মালভিয়া নগরের হাউজ খাস এলাকার ‘ফ্লরিশ স্টে বিঅ্যান্ডবি’ নামের একটি পাঁচ তলা হোটেলে যখন ভয়াবহ আগুন লেগে অন্তত ২১ জন প্রাণ হারান, তখন কোনও পেশাদার সরঞ্জাম ছাড়াই বাস্তবের ‘সুপারহিরো’ হিসেবে আবির্ভূত হন স্থানীয় বাসিন্দারা।
হুড়োহুড়ি, আতঙ্ক আর চরম হতাশার মাঝেও ধোঁয়া ও আগুনে ঘেরা ভবনটি থেকে আটকে পড়া মানুষদের বাঁচাতে তারা নিজেদের জীবন বাজি ধরেন। ফায়ার সার্ভিস বা জরুরি উদ্ধারকর্মীরা আসার আগেই ঘটনাস্থলে ছুটে যান প্রতিবেশীরা।
দিল্লির সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডে বিপুল প্রাণহানি হয়তো ঠেকানো যায়নি, তবে এই সাধারণ নাগরিকদের সাহসিকতা ও মানবিকতা প্রমাণ করেছে যে চরম বিপদের দিনে সাধারণ মানুষেরাই হয়ে উঠতে পারেন অনন্য রক্ষাকর্তা।
আগুন লাগার পর হোটেলের জানালা দিয়ে যখন মানুষ বাঁচার জন্য মরিয়া হয়ে নিচে লাফ দিচ্ছিলেন, তখন এক অনন্য মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন রিয়াজুদ্দিন মনসুরি এবং তার ছেলে আরমান মনসুরি। আগুনের খবর পেয়েই তারা নিজেদের তোশকের দোকান পুরো খালি করে ফেলেন এবং জ্বলন্ত ভবনের নিচের রাস্তায় সব তোশক বিছিয়ে দেন। জানালা দিয়ে মানুষের নিচে লাফিয়ে পড়ার যে রোমহর্ষক দৃশ্য মানুষ দেখেছে, এই বাবা-ছেলের তাৎক্ষণিক বুদ্ধির কারণেই মূলত সেই মরণঝাঁপ থেকে মানুষের জীবন রক্ষা পায়। ব্যবসায়ে লোকসানের কথা চিন্তা না করে তারা আহতদের বহনের জন্য দোকান থেকে চাদরও দিয়ে দেন।
উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া মোহাম্মদ আফজাল নামের এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, আমি ও আমার ভাইয়েরা যখন সকালে এখানে পৌঁছাই, ততক্ষণে বিশাল আগুন লেগে গেছে। আমরা দ্রুত রাস্তার ওপারের দোকান থেকে তোশক এনে নিচে বিছিয়ে দিই এবং মানুষকে লাফ দিতে বলি। কেউ কেউ সফলভাবে লাফ দিতে পেরেছেন, আবার অনেকে সাহস পাননি। তোশকগুলোর কারণে অনেকের জীবন বেঁচেছে।
তিনি আরও জানান, আগুন তীব্র হলে হাজি সাহেব পুলিশ ও ফায়ার ব্রিগেডে ফোন করেন। ফায়ার সার্ভিস এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পর তারা ভেতরে ঢুকে আটকে পড়াদের বের করে আনেন। আফজাল বলেন, আমরা আরমান’স নামের দোকান থেকে তোশক ও চাদর আনি। দোকানের মালিক নিজের মালের ক্ষয়ক্ষতির পরোয়া না করে আমাদের সাহায্য করেন। আমাদের কাছে কোনও পেশাদার সরঞ্জাম না থাকায় ওই চাদরগুলো দিয়েই আমরা আহতদের ওপর তলা থেকে নামিয়ে এনেছি।
উদ্ধারকাজে যুক্ত আরেক নায়ক ওয়াসিম রাজা পেশায় ম্যাক্স হাসপাতালের কর্মী। তিনি জানান, তার হাসপাতালের প্রশিক্ষণই এই জরুরি অবস্থায় মানুষের প্রাণ বাঁচাতে সবচেয়ে বেশি কাজে লেগেছে। ওয়াসিম বলেন, আমাদের প্রশিক্ষণে শেখানো হয় কীভাবে একসঙ্গে অনেক মানুষ হতাহত হলে সামাল দিতে হয় এবং কীভাবে সিপিআর দিতে হয়। আমি জ্বলন্ত ভবনের ভেতরে এবং পরে অ্যাম্বুলেন্সে রোগীদের এই সেবা দিয়েছি।
উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের অবস্থা বর্ণনা করে তিনি বলেন, সান্ত্বনার বিষয় হলো ভেতরের মানুষগুলো আগুনে পোড়েননি, তারা মূলত ধোঁয়ার কারণে জ্ঞান হারিয়েছিলেন। ধোঁয়ায় তাদের মুখ পুরো কালো হয়ে গিয়েছিল। কোনও রকম স্বাস্থ্যবিধি বা অনুমতির তোয়াক্কা না করে আমরা সরাসরি মুখে মুখ লাগিয়ে তাদের কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস দিয়েছি। এই প্রচেষ্টার কারণেই বেশ কিছু জীবন বাঁচানো সম্ভব হয়েছে।
ম্যাক্স হাসপাতালের আরেক কর্মী অগ্নিকাণ্ড ও উদ্ধারকাজের ওপর বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত, তিনিও সকাল পৌনে নয়টায় ঘটনাস্থলে এসে উদ্ধারকাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তিনি বলেন, আমরা ফায়ার ব্রিগেডের সঙ্গে ভেতরে ঢুকে মানুষদের টেনে বের করি। নিহত ও জীবিতদের মধ্যে বেশির ভাগই বিদেশি নাগরিক।
সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে









