সেনেগালের বিখ্যাত গ্র্যান্ড থিয়েটার দে ডাকারে পরচুলা এবং ত্বক উজ্জ্বলকারী পণ্য ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে কর্তৃপক্ষ। মাত্র একদিন পর সোমবারই (২১ জুলাই) অবশ্য ওই আদেশ প্রত্যাহার করা হয়। তবে, স্বল্পস্থায়ী এই নিষেধাজ্ঞা নিয়ে দেশটির বিভিন্ন মহলে শুরু হওয়া পাল্টাপাল্টি যুক্তি শিগগিরই থামার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এ খবর জানিয়েছে।
পশ্চিম আফ্রিকার দেশটির সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের ইস্যুকৃত এবং বিখ্যাত ওই থিয়েটারের পরিচালক সেরিন ফল গুইয়েইর স্বাক্ষরিত স্মারকটিতে সোমবার ওই আদেশ প্রত্যাহার করার ঘোষণা দেওয়া হয়। নিষেধাজ্ঞার কারণে সমালোচকদের বাক্যবাণের প্রতিক্রিয়ায় পরিচালক বলেছেন, তার প্রতিষ্ঠানের মান ধরে রাখা এবং প্যান-আফ্রিকান মূল্যবোধ প্রচারের উদ্দেশ্যেই তারা ওই পদক্ষেপ নিয়েছিল।
তবে ওই নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটিতে আত্মপরিচয়, লিঙ্গভিত্তিক রাজনীতি এবং সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ নিয়ে চলছে তুমুল বিতর্ক। পরিচালক গুইয়েইকে ধুয়ে দিয়ে সমালোচকরা বলছেন, সাংস্কৃতিক গৌরবের নামে মূলত নারীদের দমনের চেষ্টা করেছে কর্তৃপক্ষ।
দেশটির বুদ্ধিজীবী মহল এবং নারীবাদী অধিকারকর্মীরা বলছেন, সেনেগালে ব্যাপকভাবে চর্চিত লৈঙ্গিক অসমতার প্রতিফলন ঘটেছে সরকারের ওই আদেশে। তাদের যুক্তি, প্রেসিডেন্ট বাসিরাউ দিওমায়ে ফায়ের প্রশাসনই খুব একটা নারীবান্ধব নয়, কেননা তার প্রশাসনে ২৫ সদস্যের মাত্র চারজন নারী এবং নারী মন্ত্রণালয় তারা বাতিল করে দিয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে নিষেধাজ্ঞাকে নারীবিদ্বেষী, হস্তক্ষেপমূলক ও অভিভাবকসুলভ পদক্ষেপ বলে সমালোচনা করেন।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ ফাতুউমাতা বা বিবিসিকে বলেছেন, সরকারের নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে মূলত পরচুলা বা গায়ের রঙের সম্পর্ক নেই। এটা আসলে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে বৃহত্তর ক্ষমতা প্রদর্শনের একটা নমুনা, যেখানে নির্দিষ্ট একটি ধাঁচের আত্মপরিচয় চাপিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা নেওয়া হয়েছে। যারা এতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন না, তাদের কণ্ঠ ধীরে ধীরে চাপা পড়ে যাবে।
তবে সবচেয়ে কড়া সমালোচনা করেছেন দেশটির নারীবাদী বিশ্লেষক এবং বুদ্ধিজীবী হেনরিয়েতে নিয়াং কানদে। তিনি বলেছেন, কর্তৃপক্ষকে আমরা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, পরচুলার মূলত সৌন্দর্য বর্ধক অনুষঙ্গ, যা কোনও ক্ষেত্রে আর্থিক এবং অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত প্রয়োজনীয়তা। এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা কি কখনও পুরুষদের ওপর জারি করা হয়েছে? টাক লুকানোর জন্য ন্যাড়া করা বা ঘাড়ের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য শার্টে নকল কলার ব্যবহারকে কখনও নিরুৎসাহিত করা হয়েছে?
এদিকে, ওই নিষেধাজ্ঞার গুটিকয়েক সমর্থকদের দাবি, কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের নেপথ্যে ছিল সাংস্কৃতিক গৌরব প্রচার করা। এর সঙ্গে শোষণের কোনও সম্পর্ক নেই।
তবে, এসব অনুষঙ্গ নিয়ে মাথা ঘামানোর বদলে আসল সমস্যার দিকে মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন অনেকে। সমাজবিজ্ঞানী মামে দিয়ারা থিয়াম বলেছেন, আফ্রিকান পরিচয় প্রতিষ্ঠাই যদি মূল উদ্দেশ্য হয়, তবে ভাষা, শিক্ষা, আর্থিক সমতা নিশ্চিতে মনোযোগী হওয়া উচিত।