সাবেক রুশ ভূখণ্ড আলাস্কায় কেন ট্রাম্প-পুতিন বৈঠক?

ইউক্রেনে যুদ্ধ অবসান নিয়ে শুক্রবার (১৫ আগস্ট) বৈঠক করবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। এই বৈঠকের স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে আলাস্কা। স্থান নির্বাচনের বিষয়টি কোনও কাকতালীয় বা খেয়ালি ঘটনা নয়। কেননা, এটা অনেকটা হিরোশিমায় বসে জাপানকে পারমাণবিক অস্ত্রের ভয়াবহতা বোঝানোর মতো বিষয় হতে চলেছে।

১৮৬৭ সালের আগ পর্যন্ত আলাস্কা ছিল মস্কোর জারের শাসনাধীন রুশ কলোনি। সে সময় জার দ্বিতীয় আলেক্সান্ডার মাত্র ৭২ লাখ ডলারের বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এটি বিক্রি করে দেন। প্রত্যন্ত ওই অঞ্চল থেকে সে সময় সম্পদ আরোহণের জটিলতা এবং অর্থনৈতিক চাপের কারণে আলাস্কা বিক্রি করাকে সঠিক একটি সিদ্ধান্ত বলেই বিবেচনা করেছিল রুশ শাসকগোষ্ঠী।

তবে সম্প্রতি নামমাত্র মূল্যে আলাস্কা বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়ে আবারও আলোচনা শুরু হয়েছে। পাশাপাশি, লেনদেনের বৈধতা নিয়ে রাশিয়ায় বিতর্ক উঠেছে বারবার—বিশেষত যখন পশম বাণিজ্যের সাবেক কেন্দ্র আলাস্কা পরবর্তীতে সোনা ও তেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদের ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত হয়।

২০২২ সালের জুলাইয়ে ইউক্রেন আক্রমণের পর মার্কিন-রুশ উত্তেজনা যখন তুঙ্গে, তখন ক্রেমলিনে আবারও ইস্যুটি সামনে আসে। রুশ পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ দুমার স্পিকার ভিয়াচেস্লাভ ভলোদিন এটিকে বিতর্কিত ভূখণ্ড উল্লেখ করে রুশ নিয়ন্ত্রণে ফেরত আনার কথা বলেন। তবে রুশ কর্তৃপক্ষ তা পুনরুদ্ধারে তোড়জোড় করার আগ্রহ দেখায়নি।

২০১৪ সালে এক অবসরপ্রাপ্ত নাগরিক এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে পুতিন উল্টো রসিকতাচ্ছলে বলেন, আলাস্কা দিয়ে আপনার কী দরকার? ওখানে খুব ঠান্ডা।

ইউক্রেনের ভূমি দখলের বৈধতা নিয়ে আলোচনা করতে আলাস্কাকে বেছে নিয়ে তাই একরকম মানসিক খেলা শুরু করেছেন ট্রাম্প। তবে এর সঙ্গে আইনি ও কৌশলগত কিছু বিষয়ও জড়িত।

ইউক্রেনে যুদ্ধপরাধের অভিযোগে ২০২৩ সালে পুতিনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি), যা বিশ্বের ১২৫টি দেশে কার্যকর। ফলে বিশ্বের বহু দেশেই স্বচ্ছন্দে ভ্রমণ করতে পারবেন না রুশ প্রেসিডেন্ট। তবে আইসিসির কর্তৃত্ব স্বীকার করে না বলে, মার্কিন শাসনাধীন কোনও অঞ্চলে পুতিনের ভ্রমণে কোনও আইনি জটিলতা নেই।

এছাড়া, ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রতীকী কৌশলগত ভূখণ্ড হিসেবে আলোচনায় ভিন্ন মাত্রা যোগ করবে আলাস্কা। মাত্র চার কিলোমিটার দীর্ঘ বেরিং প্রণালি রুশ ভূখণ্ড থেকে আলাস্কাকে পৃথক করেছে। এই নৈকট্য দুই দেশের ইতিহাসের প্রতীক ও সম্ভাব্য নতুন কূটনৈতিক অধ্যায়ের ইঙ্গিত বহন করে। সাবেক রুশ ভূখণ্ড আলাস্কা হয়ে উঠতে পারে ভূরাজনৈতিক ও যৌথ ঐতিহ্যের প্রতীক।

নিরাপত্তার দিক থেকে বিবেচনা করলেও আলাস্কা একটি যুক্তিযুক্ত পছন্দ হতে পারে। কারণ দুই নেতা সাক্ষাৎ করবেন সেখানকার বৃহত্তম সামরিক ঘাঁটি জয়েন্ট বেস অ্যালমেনডর্ফ-রিচার্ডসনে। সেখানে বিমানবাহিনীর অ্যালমেনডর্ফ ঘাঁটি ও সেনাবাহিনীর ফোর্ট রিচার্ডসন একত্রে রয়েছে। স্নায়ুযুদ্ধের স্মৃতিবহনকারী এই ঘাঁটি মার্কিন উত্তরাঞ্চলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা নিশ্চিত করতে সক্ষম।

এছাড়া,আর্কটিক নিয়ে রুশ-মার্কিন স্বার্থের সংযোগস্থলে অবস্থিত আলাস্কা। সেখানে শিপিং রুট থেকে শুরু করে প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের বিষয় জড়িত। এখানে বৈঠক আয়োজন আর্কটিক অঞ্চলের বৃহত্তর কৌশলগত গুরুত্বের প্রতিও দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।

তথ্যসূত্র: এনডিটিভি