ভারতে অবৈধভাবে বসবাসের অভিযোগে বাংলাভাষী মুসলিমদের হেনস্তার একাধিক অভিযোগ উঠেছে। কিছু ঘটনায় বাঙালি মুসলিমদের অনুপ্রবেশের অভিযোগে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনার প্রতিবাদ করে ব্যাপক সমালোচনার শিকার হচ্ছেন ভারতীয় সমাজকর্মী সৈয়দা সায়িদিন হামিদ।
রবিবার (২৪ আগস্ট) আসাম সফরে গিয়ে তিনি বাংলাদেশিদের সমর্থনে বলেন, আল্লাহ এই দুনিয়াটাকে অনেক বড় করে বানিয়েছেন, আর মানুষের থাকার জন্যই বানিয়েছেন। আমি মনে করি এত বড় ভারতবর্ষে বাংলাদেশিদেরও থাকার অধিকার আছে, তাদের উচ্ছেদ করাটা মানবতার অপমান।
তার বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় আসাম ও কেন্দ্রীয় বিজেপি মন্ত্রীরা তো বটেই, বহু দক্ষিণপন্থি পর্যবেক্ষকও মুখ খুলেছেন। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রোলিং, এমনকি ‘দেশদ্রোহী’ বলেও তাকে তকমা দিয়েছেন অনেকে।
কাশ্মীরি এই বর্ষীয়ান নারী দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং সরকারের আমলে ভারতের সর্বোচ্চ পরিকল্পনা নির্ধারণী সংস্থা ‘যোজনা কমিশন’-এর সদস্য ছিলেন।
ঘটনার সূত্রপাত আসামে বন বিভাগের জমিতে কথিত জবরদখল উচ্ছেদের নামে রাজ্য সরকার বিশেষ করে বাংলাভাষী মুসলিমদের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানকে কেন্দ্র করে। এই অভিযানের সঠিক ঘটনা অনুসন্ধানে এবং উচ্ছেদ হওয়া গরিব মানুষের পাশে দাঁড়াতে দিল্লি থেকে একটি প্রতিনিধিদল গত সপ্তাহান্তে আসাম গিয়েছিলেন। ওই দলে সমাজকর্মী সৈয়দা হামিদ ছাড়াও ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ ও সমাজকর্মী হর্ষ মান্দের।
আসামের গোয়ালপাড়া জেলায় উচ্ছেদ হওয়া বাঙালি মুসলিমদের সঙ্গে কথা বলে সৈয়দা হামিদ পরে সংবাদমাধ্যমে ওই মন্তব্য করেন, যা ঘিরেই এখন তোলপাড় চলছে।
তিনি বলেছিলেন, এত বড় দেশ আমাদের, আমি মনে করি বাংলাদেশিরাও এখানে অনায়াসে থাকতে পারেন। তাদেরও থাকার অধিকার আছে। বলা হচ্ছে তারা নাকি স্থানীয়দের অধিকার ছিনিয়ে নিচ্ছেন, সেটা কিন্তু মোটেও ঠিক না।
অবৈধ বাংলাদেশি তাড়ানোর নামে যেভাবে বাঙালি মুসলিমদের ওপর নির্যাতন চলছে, সেটাকে ‘অত্যন্ত দুরভিসন্ধিমূলক’ এবং ‘মানবতার জন্য চরম অবমাননাকর’ বলেও বর্ণনা করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, আল্লাহতায়ালা এই ধরণী বানিয়েছেন ইনসান বা মানুষের জন্যই, অন্য কারও জন্য নয়। তো এখানে এই মানুষগুলো থাকলে অসুবিধা কীসের?
ভারতজুড়ে এই মুহূর্তে যে অবৈধ বাংলাদেশিবিরোধী অভিযান চলছে, সে প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আমি নিজে থাকি দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া এলাকায়। আসামের গোয়ালপাড়ায় যা ঘটছে, দিল্লির জামিয়াতেও ঠিক একই জিনিস ঘটছে–বাংলাদেশি তকমা দিয়ে গরিব বাঙালি মুসলিমদের ঘরদোর ভেঙে দেওয়া হচ্ছে। মুসলমানদের ওপর যেন কেয়ামত নেমে এসেছে।
এদিকে, ভারত সরকার সৈয়দা হামিদের এই মন্তব্যের কঠোর নিন্দা করেছে।
বিজেপি নেতা কিরেন রিজিজু এই বক্তব্যকে অনভিপ্রেত দাবি করে বলেছেন, মানবতার নামে সৈয়দা হামিদ আসলে মানুষকে বিভ্রান্ত করতে চাইছেন।
এরকম সংবেদনশীল ইস্যুতে ‘হাঙ্গামা বাঁধানো উচিত নয়’ মন্তব্য করে তিনি আরও বলেন, এখানকার জমি ও পরিচয় শুধু ভারতীয়দের জন্যই! মুসলিমরা এ দেশে সম্পূর্ণ নিরাপদ, বরং আমি তো বলবো পাকিস্তান-বাংলাদেশ-আফগানিস্তানে হিন্দু-বৌদ্ধ-শিখ-খ্রিষ্টানরা অত্যাচারিত হচ্ছেন।
দিল্লিতে জেএনইউ-এর সাবেক অধ্যাপক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশেষজ্ঞ বলদাস ঘোষাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, সমাজকর্মী মুখোশের আড়ালে জনৈকা সৈয়দা হামিদ হঠাৎ আবিষ্কার করেছেন এই পৃথিবী না কি সকলের– আর তাই বাংলাদেশের সঙ্গে সীমান্ত খুলে দিয়ে সে দেশের সব মুসলিমকে ভারতে এসে বাস করতে দেওয়া উচিত। এটা একটা জঘন্য প্রস্তাব।
ভারতের সব সংবাদমাধ্যমের কাছে সৈয়দা হামিদকে বয়কটের আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।