যুক্তরাজ্যের ক্যামব্রিজ শহরে ঘটা কথিত হামলার ঘটনায় এনসিপি নেতা ও বাংলাদেশের সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহর নাম উঠে এসেছে একজন সাক্ষীর হাতে লেখা বিবৃতিতে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, পুলিশ তার সঙ্গে যোগাযোগ করে ঘটনার বিষয়ে বক্তব্য দিতে অনুরোধ করেছে। হাসনাত শনিবার রাতে একজন আইনজীবীসহ উপস্থিত হয়ে বক্তব্য দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
প্রাপ্ত নথি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি ঘটে গত শুক্রবার ক্যামব্রিজ শহরে। এফএক্স১৬ এইচএমডি রেজিস্ট্রেশন নম্বরের একটি সাদা রঙের গাড়িতে থাকা যাত্রীদের মধ্যে একজনকে তিনি হাসনাত আব্দুল্লাহ হিসেবে শনাক্ত করেছেন বলে একজন সাক্ষী উল্লেখ করেছেন।
জানা গেছে, ঘটনাস্থলে প্রথমে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। পরে গাড়ি থেকে কয়েকজন ব্যক্তি নেমে এক ব্যক্তিকে ঘিরে ধরেন। অভিযোগ করা হয়েছে, একপর্যায়ে তাকে ধাক্কাধাক্কি ও টানাহেঁচড়া করা হয়। ঘটনাস্থলে উপস্থিত কয়েকজন ব্যক্তি তাকে শারীরিকভাবে হেনস্তা করেন।
এক প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণে বলা হয়েছে, তিনি কাছাকাছি একটি বাসা থেকে উচ্চস্বরে চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে জানালা দিয়ে বাইরে তাকান। তিনি কয়েকজন মিলে এক ব্যক্তিকে টানাহেঁচড়া করতে দেখেছেন বলে দাবি করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি বিকাল ৪টা ১৯ মিনিটের কিছু আগে ঘটে। পরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা গাড়িতে উঠে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। সাক্ষী দাবি করেছেন, গাড়িটি চলে যাওয়ার আগে তিনি এর রেজিস্ট্রেশন নম্বরের ছবি তুলতে সক্ষম হন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একটি চলন্ত গাড়ি থেকে মোটরসাইকেল আরোহী ওই ব্যক্তির ভিডিও ধারণ করা হচ্ছে। ভিডিওতে তাকে গাড়ির পেছনে অনুসরণ করতে দেখা যায়।
অভিযোগ রয়েছে, পরে একটি পর্যায়ে গাড়ি থামিয়ে হাসনাত আব্দুল্লাহর সঙ্গে থাকা কয়েকজন ব্যক্তি মোটরসাইকেল আরোহী ওই ব্যক্তির সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। ভুক্তভোগী জুবায়ের আহমেদের অভিযোগ, এসময় তাকে মারধর করা হয়। পরে পুলিশ তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। চিকিৎসা শেষে তিনি পুলিশের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেন। হাসনাতকে তিনি এই ঘটনায় দায়ী করেছেন। জুবায়ের ছাত্রলীগ ও আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলে জানা গেছে।
এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসনাত আব্দুল্লাহকে আইনি সহায়তা দেওয়া একজন আইনজীবী বলেন, “পুলিশ তার মক্কেলের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এবং ঘটনার বিষয়ে তথ্য ও বক্তব্য চেয়েছে। তিনি তার বক্তব্য দিয়ে পুলিশকে সহযোগিতা করেছেন।”
এই বিষয়ে এনসিপি অ্যালায়েন্স এক বিবৃতিতে অভিযোগ করেছে যে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও মামলা দিয়ে হয়রানির চেষ্টা করা হচ্ছে। সংগঠনটি এই ধরনের কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছে।
ঘটনার বিষয়ে ক্যামব্রিজ পুলিশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
লন্ডনের বাংলাদেশ হাইকমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে হাইকমিশনের একজন কর্মকর্তা বলেন, “তারা এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত নন। পুলিশ তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। কমিউনিটির মানুষের কাছ থেকে শনিবার তারা ঘটনাটি জেনেছেন।”
এদিকে এই ঘটনার ব্যাপারে যুক্তরাজ্যের স্বনামখ্যাত ব্যারিষ্টার নাশিদ রহমান রবিবার ভোররাতে বাংলা ট্রিবিউনের এই প্রতিবেদককে বলেন, “শেখ হাসিনা যতবার এসেছেন প্রায় প্রতিবারই রাজনৈতিক প্রতিবাদের সঙ্গে অসদাচারণ বা ফৌজদারি অপরাধের জন্য মামলা হয়েছে। তবে আদালত মামলার পর খুব কম এইসব ঘটনায় কারও সাজা হয়েছে। হাসনাতের এই ঘটনায় দুই পক্ষই অভিযোগ করেছে। এই ঘটনায় এবিএস অভিযোগ হতে পারে। শারীরিক আঘাতের সাক্ষ্য-প্রমাণ আছে কিনা— সেটা দেখা হবে। তারপর ক্রাউন প্রসিকিউশন সার্ভিসে সাক্ষ্য-প্রমাণসহ রিপোর্ট দেওয়ার পর তারা মামলার উপযোগিতা আছে কিনা তা যাচাই করবে। সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শী, রাস্তায় কোনও পথচারী বা গাড়ির চালকের সাক্ষ্য নেওয়া হবে।”
হাসনাত আবদুল্লাহর শান্তি হতে পারে কিনা বা কী ধরনের শাস্তি হতে পারে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “প্রথমত তাকে গ্রেফতার করা হয়নি। ঘটনা যতটুকু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখেছি, তাতে মনে হয়নি এটি কোনও পরিকল্পিত ঘটনা। রাস্তায় কাকতালীয়ভাবে যদি সংঘাত থেকে কোনও ঘটনা ঘটে থাকে তাহলে পুলিশ কতৃক চার্জ বা আদালতে মামলা হওয়ার পরে সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে শাস্তি হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম।” আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “হাসনাত যদি আঘাত করেও থাকেন— তবুও আঘাত করার আদৌ কোনও পরিকল্পনা তার ছিল কিনা, নাকি ঘটনার আকস্মিকতায় ঘটেছে সেটি দেখা হবে।”
তিনি আরও বলেন, “হাসনাত আবদুল্লাহ নন, যে কেউ ভিজিট ভিসায় ব্রিটেনে এসে যদি কোনও ফৌজদারি অপরাধ করেছেন বলে প্রমাণ হয়, তাহলে পরবর্তী সময়ে তার ভিসা পাওয়ার সম্ভাবনা শূন্যের কোটায় নেমে আসবে।”
নাশিদ রহমান বলেন, “এই ঘটনা বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য নেতিবাচক বিষয়। বেলফাস্টের বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতদের বাড়িতে বর্ণবাদী হামলার পরিপ্রেক্ষিতে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কমিউনিটিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, এই ঘটনা তার বিপরীত।” এমন ঘটনা কমিউনিটিতে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলেও মনে করেন তিনি।