শুধু জলপথ নয়, প্রযুক্তিতেও ‘চোক পয়েন্ট’; বদলে যাচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতির মানচিত্র

বিশ্ব অর্থনীতিতে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে চোক পয়েন্ট বা কৌশলগত বাধা। বিশ্বব্যাপী তেলের বাজার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের সম্প্রসারণে তৈরি হওয়া প্রতিবন্ধকতা বোঝাতে ‘চোকপয়েন্ট’ শব্দটি এখন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। মূলত পুরনো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পতন ঘটিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতা ও সংঘাতের মুখে পুরো বিশ্ব অর্থনীতিতেই এই সংকট দৃশ্যমান হচ্ছে।

সম্প্রতি সবচেয়ে বড় ‘চোক পয়েন্ট’ তৈরি হয়েছে লোহিত সাগরে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে বিকল্প পথ হিসেবে সৌদি আরব পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগরে আরও বেশি তেল পাঠাচ্ছিলো।

কিন্তু এখন ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি জাহাজগুলোকে নিশানা বানাতে শুরু করেছে। এতে বাব এল-মান্দেব প্রণালির আন্তর্জাতিক নৌপথ এখন হুমকির মুখে পড়েছে। ইআইএ ডেটার হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে বিশ্বের প্রায় ৫.৭ শতাংশ তেল এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৩.৫ শতাংশ।

স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের পণ্য গবেষণা বিশেষজ্ঞরা চলতি সপ্তাহে লিখেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহের ঝুঁকি এখন দুটি চোক পয়েন্ট সমস্যায় পরিণত হয়েছে। সংঘাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানির দাম অস্বাভাবিক বেড়ে বৃহস্পতিবার ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

সাবেক বারাক ওবামা প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা নীতি সংক্রান্ত সাবেক কর্মকর্তা ও বর্তমানে কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস-এর জ্যেষ্ঠ ফেলো এডি ফিশম্যান আগেই এই পরিস্থিতির আশঙ্কা করেছিলেন। গত বছর তিনি ‘চোকপয়েন্টস: আমেরিকান পাওয়ার ইন দ্য এজ অব ইকোনমিক ওয়ারফেয়ার’ নামে একটি বই প্রকাশ করেন। ফিশম্যান বলেন, এর পর থেকে একের পর এক চোক পয়েন্ট দেখা দিচ্ছে। ধারণাটি এখন কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নেই, বাস্তবে রূপান্তরিত হয়েছে।

ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের ‘বুক অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কারের আয়োজনকারী অ্যান্ড্রু হিল জানান, গত বছর থেকেই এই শব্দের ব্যবহার লক্ষণীয়ভাবে বাড়তে দেখা গেছে। অন্যদিকে, অ্যাপোলোর প্রধান অর্থনীতিবিদ টরস্টেন স্লক চলতি সপ্তাহে জ্বালানি সরবরাহ ও চাহিদার গতিপ্রকৃতি নিয়ে ‘দ্য চোকপয়েন্ট রিস্ক’ শিরোনামে একটি গবেষণা প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, ভূ-রাজনৈতিক সক্ষমতা তেলের মজুতে নির্ভর করে না, বরং এটি নির্ভর করে সেই সংকীর্ণ জলপথগুলোর ওপর যেখান দিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রকৃত তেল পরিবাহিত হয়।’

তবে এই চোক পয়েন্ট কেবল ভৌগোলিক বা জলপথের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি অর্থনৈতিকও হতে পারে। কোনও বিশেষ খনিজ বা প্রযুক্তির ওপর একক আধিপত্য (যেমন বিরল উপাদানে চীনের আধিপত্য), প্রযুক্তি (উন্নত এআই চিপ) কিংবা বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা (মার্কিন ডলার); যার বিকল্প দ্রুত তৈরি সম্ভব নয়, সেগুলোকে অর্থনীতিবিদরা চোক পয়েন্ট বলছেন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের চাহিদা অনুযায়ী নির্দিষ্ট উপকরণের যোগান না থাকায় বাজারে যে সংকট ও উচ্চমূল্য তৈরি হয়েছে, তা বোঝাতেও বিশ্লেষকরা এই শব্দটি ব্যবহার করছেন। গত মে মাসে গোল্ডম্যান স্যাকস-এর বিশ্লেষকরা লিখেছেন, সংশ্লিষ্ট খাতের মারাত্মক সব চোক পয়েন্ট-এর কারণে বর্তমানে এআই প্রযুক্তির কাঙ্ক্ষিত বিস্তার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

তারা মূলত ডাটা সেন্টারের সীমাবদ্ধ ক্ষমতা এবং যুক্তরাষ্ট্রে বিদ্যুৎ ঘাটতির মতো বিষয়গুলোকে নির্দেশ করেছেন।

মুক্ত বাণিজ্য যুগে নির্দিষ্ট শিল্প বা পণ্যে বিশেষায়িত উৎপাদন খরচ কমিয়ে এনেছিল এবং যার যা সেরা তা নিয়ে কাজ করার সুযোগ দিয়েছিল। কিন্তু এটি একটি ভঙ্গুর আন্তঃনির্ভরশীল ব্যবস্থাও তৈরি করেছিল, যা শুল্ক আরোপ ও রফতানি নিয়ন্ত্রণের মতো পদক্ষেপের কারণে এখন ভেঙে পড়ছে।

ব্যবসায়িক পরিভাষায় এই শব্দটির ব্যবহার এতটাই বেড়েছে যে, বৈশ্বিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ম্যাকিঞ্জি চলতি সপ্তাহে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে। প্রতিষ্ঠানটি চোক পয়েন্ট-এর সংজ্ঞায় বলেছে: সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে বিকল্পহীন এমন কিছু অর্থনৈতিক নির্ভরতা, যেখানে একক কোনও পক্ষ, ছোট জোট কিংবা প্রাকৃতিক শক্তি পুরো বাণিজ্য ব্যবস্থার প্রবাহ আটকে দিতে বা পরিবর্তিত করতে পারে।

তবে ভৌগোলিক চোক পয়েন্ট ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করছে বহু শতাব্দী ধরে। ফিশম্যান খ্রিস্টপূর্ব ৪০০ অব্দের পেলোপনেশিয়ান যুদ্ধের উদাহরণ দিয়ে জানান, কৃষ্ণসাগর দিয়ে অ্যাথেন্সে খাদ্যশস্য পৌঁছানোর পথ স্পার্টা বন্ধ করে দেওয়ার পরই অ্যাথেন্স পরাজিত হয়েছিল।

তবে করপোরেট আলোচনায় শব্দটির ব্যবহার এখনও কিছুটা পিছিয়ে। আলফাসেন্সের তথ্য অনুযায়ী, বিগত প্রান্তিকের আয় সংক্রান্ত বিভিন্ন আলোচনায় ‘বটলনেক’ শব্দটির উল্লেখ এসেছে ৯০৪ বার, যেখানে চোক পয়েন্ট শব্দটি উচ্চারিত হয়েছে ৯ বার।

সূত্র: অ্যাক্সিওস