ভারত স্বাধীন হওয়ার পরও দেশটিতে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, উদ্বাস্তু সংকট ও ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল। এমন পরিস্থিতিতে ১৯৪৮ সালের জানুয়ারিতে মহাত্মা গান্ধী জীবনের শেষ অনশন শুরু করেন। অনশনের অন্যতম আলোচিত পরিণতি ছিল পাকিস্তানকে বকেয়া ৫৫ কোটি রুপি দেওয়ার সিদ্ধান্ত। তবে শুধু এই অর্থ পরিশোধ করানোই গান্ধীর অনশনের উদ্দেশ্য ছিল না; মূল লক্ষ্য ছিল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
ভারতের স্বাধীনতার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই দেশভাগের ক্ষত আরও গভীর হয়ে ওঠে। ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান ভাগের ফলে লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হন এবং দুই দেশে ব্যাপক সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। দিল্লিতেও তখন উদ্বাস্তুদের ঢল নামে এবং হিন্দু-মুসলিম উত্তেজনা তীব্র হয়ে ওঠে। গান্ধী মনে করতেন, শুধু পুলিশ ও সেনা মোতায়েন করে এই সহিংসতা থামানো সম্ভব হলেও মানুষের মধ্যে প্রকৃত সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করা যাবে না।
এই পরিস্থিতিতে ১৯৪৮ সালের ১৩ জানুয়ারি নয়াদিল্লির বিড়লা হাউসে অনশন শুরু করেন ৭৮ বছর বয়সী গান্ধী। এর আগে কলকাতায় আরেক দফা অনশনের কারণে তার শারীরিক অবস্থাও দুর্বল ছিল। তিনি ঘোষণা করেন, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রকৃত পুনর্মিলন ও শান্তি প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি খাবার গ্রহণ করবেন না।
গান্ধীর কাছে ভারতের মুসলিমদের অধিকার ও নিরাপত্তা যেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তেমনি পাকিস্তানে থাকা হিন্দু ও শিখ সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাও ছিল সমান গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মনে করতেন, ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কারও অধিকার নির্ধারিত হতে পারে না। সে সময় তিনি অতীতের সহিংসতা ভুলে ভবিষ্যতের দিকে তাকানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন।
কীভাবে সামনে আসে ৫৫ কোটি রুপির বিষয়টি
দেশভাগের সময় অবিভক্ত ভারতের সম্পদ ভাগের অংশ হিসেবে পাকিস্তানের পাওনা নির্ধারিত হয়েছিল ৭৫ কোটি রুপি। এর মধ্যে ২০ কোটি রুপি ইতোমধ্যে পাকিস্তানকে দেওয়া হয়েছিল। বাকি ছিল ৫৫ কোটি রুপি।
কিন্তু কাশ্মীর নিয়ে ভারত-পাকিস্তানের সংঘাত তীব্র হওয়ার পর ভারত সরকার ওই অর্থ ছাড়তে বিলম্ব করে। সরকারের দৃষ্টিতে নিরাপত্তাজনিত কারণেই অর্থ আটকে রাখা হয়েছিল। গান্ধীর অবস্থান ছিল ভিন্ন। তার যুক্তি ছিল, দুই দেশের সম্পর্ক খারাপ হলেও পাকিস্তানের আইনগত পাওনা পরিশোধের দায়িত্ব ভারতের রয়েছে।
গান্ধীর শেষ অনশন নিয়ে ঐতিহাসিক রামচন্দ্র গুহর গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে ইন্ডিয়া টুডে জানিয়েছে, অনশনের ঘোষিত কারণ ছিল সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতির অবনতি। তবে পাকিস্তানের প্রাপ্য অর্থ আটকে রাখার সরকারি সিদ্ধান্তেও গান্ধী অসন্তুষ্ট ছিলেন। অর্থাৎ ৫৫ কোটি রুপি ছিল তার বৃহত্তর নৈতিক অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, কিন্তু অনশনের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল না।
অনশনের সঙ্গে ছিল আরও কয়েকটি শর্ত
গান্ধীর শারীরিক অবস্থা দ্রুত অবনতির দিকে গেলে ১৭ জানুয়ারি তিনি অনশন ভাঙার জন্য কয়েকটি শর্ত সামনে আনেন। এর মধ্যে ছিল দখল হয়ে যাওয়া মসজিদ ফিরিয়ে দেওয়া, দিল্লিতে মুসলিমদের অবাধ চলাচল ও নিজেদের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা, মুসলিমদের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক বয়কট বন্ধ করা এবং মেহরৌলির উরস শান্তিপূর্ণভাবে আয়োজনের সুযোগ দেওয়া।
তার আহ্বানে দিল্লিতে বিপুলসংখ্যক মানুষ শান্তির অঙ্গীকারে স্বাক্ষর করেন। একই সময়ে পাকিস্তানেও গান্ধীর জীবন রক্ষায় উদ্বেগ দেখা দেয়। ভারত ও পাকিস্তানের হিন্দু, মুসলিম ও শিখ নেতারা শেষ পর্যন্ত গান্ধীর শর্ত পূরণের প্রতিশ্রুতি দিলে ১৮ জানুয়ারি তিনি লেবুর শরবত পান করে অনশন ভাঙেন।
এরপর ভারত সরকার পাকিস্তানের বাকি ৫৫ কোটি রুপি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। বিষয়টি সে সময় ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। দেশভাগের ভয়াবহতায় স্বজন হারানো এবং পাকিস্তান থেকে ভারতে পালিয়ে আসা বহু হিন্দু ও শিখ উদ্বাস্তু গান্ধীর অবস্থানে ক্ষুব্ধ ছিলেন। তাদের কেউ কেউ মনে করতেন, গান্ধী মুসলিমদের স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
তবে গান্ধীর নিজের অবস্থান ছিল, এটি কোনো রাজনৈতিক দর-কষাকষি নয়; বরং বিবেক ও কর্তব্যের তাগিদে করা অনশন। তার কাছে ভারতের নৈতিক দায়িত্ব ছিল সব নাগরিকের অধিকার রক্ষা করা এবং পাকিস্তানের বৈধ পাওনা পরিশোধ করা।
গান্ধীর এই শেষ অনশন শেষ হওয়ার মাত্র ১২ দিন পর, ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি নয়াদিল্লির বিড়লা হাউসে নাথুরাম গডসের গুলিতে তিনি নিহত হন।
ইন্ডিয়া টুডের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গান্ধীর শেষ অনশনকে শুধু পাকিস্তানকে ৫৫ কোটি রুপি দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত করলে ঘটনাটির বৃহত্তর প্রেক্ষাপট বাদ পড়ে যায়। দেশভাগের পর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এবং ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে ন্যায্য আর্থিক দায়বদ্ধতা—এই তিনটি বিষয়ই তার শেষ অনশনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল।
সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে