ভারতের উগ্র ডানপন্থি ও আধাসামরিক সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) প্রধান মোহন ভাগবতের যুক্তরাষ্ট্র সফরকে কেন্দ্র করে তীব্র বিতর্ক ও প্রবাসীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। নিউ ইয়র্ক সিটির ঐতিহাসিক ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে তার উপস্থিতি ঘিরে প্রবাসী ভারতীয়দের একাংশ এবং একাধিক মানবাধিকার সংস্থা বিক্ষোভ শুরু করেছে। খবর আল জাজিরার।
‘ওয়ার্ল্ড ইজ ওয়ান ফ্যামিলি’ স্লোগান ও বিতর্ক
‘আমেরিকান হিন্দুস ফর এনগেজমেন্ট অ্যান্ড ডায়ালগ’ (এএইচইএডি) নামক একটি অলাভজনক সংস্থার উদ্যোগে ‘ইউনিভার্সাল ওয়াননেস সেলিব্রেশন’ শিরোনামে এই সমাবেশের আয়োজন করা হয়, যার মূল সুর প্রচার করা হয়েছিল— ‘বিশ্বই একটি পরিবার’।
তবে নিউ ইয়র্কের মানবাধিকার সংস্থা ও বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠনগুলো এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা অভিযোগ করেছে যে, ভারতে ধর্মীয় সংখ্যালঘু, বিশেষ করে মুসলিম, খ্রিস্টান ও শিখ সম্প্রদায়ের ওপর চলা নির্যাতন এবং বৈষম্যের ইতিহাসকে ঢাকতেই এই তথাকথিত ‘গুডউইল ট্যুর’ বা সদভাব প্রচারের আয়োজন করা হয়েছে।
মানবাধিকার গোষ্ঠী ও প্রবাসীদের প্রতিক্রিয়া
মানবাধিকার সংস্থা ‘হিন্দুস ফর হিউম্যান রাইটস’-এর উপ-নির্বাহী পরিচালক শ্রাব্যা তাদেপল্লি আল জাজিরাকে বলেন, “এটি মূলত আরএসএস-এর মতো একটি ফ্যাসিবাদী ও আধাসামরিক সংগঠনের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার কৌশল। তারা অন্তর্ভুক্তিমূলক ও শান্তিবাদী ইতিহাস তুলে ধরার ভান করছে, অথচ বাস্তবে আরএসএস দক্ষিণ এশিয়ায় ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতাকে উসকে দিয়ে আসছে।”
উত্তর ক্যারোলিনা থেকে আসা মুসলিম অ্যাক্টিভিস্ট সাফা আহমেদ বলেন, “যে সংগঠন ভারতে মুসলিমদের ঘরবাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং গণপিটুনিকে স্বাভাবিক করে তুলেছে, তারা যখন ‘বিশ্ব এক পরিবার’ বলে কথা বলে, তখন তা এক চরম উপহাস মাত্র।”
ভিসা বাতিলের তাগিদ ও মেয়রের প্রতিক্রিয়া
ঘটনার জল গড়ায় মার্কিন সরকারের ভেতরেও। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ক কমিশন’ (ইউএসসিআইআরএফ)-এর প্রধান আসিফ মাহমুদ আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতের ভিসা বাতিলের আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, “ভারতে ধর্মীয় স্বাধীনতার পরিস্থিতি ক্রমাগত অবনতি ঘটছে এবং মোহন ভাগবতসহ আরএসএস-এর একাধিক নেতা এতে সরাসরি ইন্ধন জুগিয়েছেন।”
অন্যদিকে নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি এই ধরনের বিভাজনমূলক ও বর্জনমুখী ভাবধারার প্রতি গভীর অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, “রাজনৈতিকভাবে যেকোনও দেশকে বর্জনমুখী করার এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির তীব্র বিরোধিতা করি আমি।”
বিভক্ত প্রবাসী সমাজ
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির অভিভাবক হিসেবে পরিচিত আরএসএস আন্তর্জাতিক স্তরে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে নানা প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবাসী ভারতীয় সমাজের মধ্যে এই সফর কেন্দ্র করে স্পষ্ট বিভাজন দেখা গেছে।
সমাবেশস্থলের বাইরে একত্রিত হয়ে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা, অনগ্রসর জাতি এবং মুসলিম, খ্রিস্টান ও শিখ সংগঠনগুলো আরএসএস এবং ভারতের ক্ষমতাসীন দলের নীতির বিরুদ্ধে স্লোগান দেয়।