ইতোমধ্যে বার্নি স্যান্ডার্স ও হিলারি ক্লিনটনের নির্বাচনি প্রচারণায় তারা একে অপরকে আক্রমণ করে বিতর্ক তৈরি করেছেন। এ চলমান বিবাদ ও বিতর্ক ধারাবাহিক রূপ নিয়েছে। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার রাতে ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল বিষয়ে তাদের মধ্যকার বিতর্ক ঐতিহাসিক রূপ নিয়েছে। ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের ভাগ্য নিয়েই ওই বিতর্কের সূত্রপাত।
বার্নি স্যান্ডার্স যেভাবে ফিলিস্তিনিদের বিষয়ে নিজের বক্তব্য দিয়েছেন এবং ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট বেনইয়ামিন নেতানিয়াহুর সমালোচনা করেছেন তাতে নিউ ইয়র্ক নগরীর ইহুদিরা বিস্মিত হয়েছেন। এমন স্পষ্টভাবে ফিলিস্তিনের পক্ষে মন্তব্য এর আগে কোনও প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীকে করতে দেখা যায়নি।
এ সংক্রান্ত আরও খবর: ডেমোক্র্যাটিক বিতর্ক: পরস্পরের বিবেচনাবোধ নিয়ে হিলারি-স্যান্ডার্সের প্রশ্ন
বিতর্কের সময় বার্নি স্যান্ডার্স নিজেকে ‘ধর্ম নিরপেক্ষ ইহুদি’ বলে দাবি করেননি। কিন্তু ‘ব্যক্তি জীবনে ইসরায়েলের প্রভাবে’র কথা তিনি জানিয়েছেন। স্যান্ডার্স বলেছেন, ‘আমি শৈশবে বেশ কয়েক মাস ইসরায়েলে কাটিয়েছি।’ নিজেকে ১০০ ভাগ ইসরায়েলের পক্ষে বলেও তিনি দাবি করেন।
কিন্তু তার বক্তব্যের মধ্যে অভুতপূর্ব যে বিষয়টি ছিল তা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটি অলিখিত নিয়ম ভেঙে ফেলেছেন। আর তা হচ্ছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনি প্রচারণার ইতিহাসে সব সময় প্রার্থীরা ইসরায়েলের প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ থাকেন এবং মধ্যপ্রাচ্য প্রসঙ্গে ফিলিস্তিন প্রশ্নে নীরবতা বজায় রাখেন।
বার্নি স্যান্ডার্স এই অলিখিত প্রথা ভেঙে গাজায় ফিলিস্তিনিদের প্রতি অঙ্গীকার নিয়ে কথা বলেছেন। ফিলিস্তিনে বেকারত্বের হার ৪০ শতাংশ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ধসে পড়া বাড়িঘর, ধ্বংস হয়ে যাওয়া স্বাস্থ্যসেবা খাত, ধ্বংসপ্রাপ্ত বিদ্যালয় ভবনই এখন ফিলিস্তিন। আমি বিশ্বাস করি যুক্তরাষ্ট্র ও অন্য দেশের মানুষ ফিলিস্তিনের মানুষকে সাহায্য করতে পারে।’
আরও পড়ুন: হিলারি-স্যান্ডার্স বাকযুদ্ধে উদ্বেগ ডেমোক্রেট শিবিরে
হারেৎজ পত্রিকার যুক্তরাষ্ট্রের সম্পাদক শেমি শালেভ বিষয়টিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ক্ষেত্রে ‘এক অসাধারণ মুহূর্ত’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বীদের ক্ষেত্রে ফিলিস্তিনের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করা অত্যন্ত দুর্লভ ঘটনা। ১৯৭৬ সালে জিমি কার্টার ও ২০০৮ সালে বারাক ওবামার অবস্থানও স্যান্ডার্সের অবস্থান থেকে অনেক দূরে ছিল।
শালেভ বলেন, ‘কার্টার ও ওবামা দুজনেই খুবই সাবধানী ছিলেন। তারা ইসরায়েলের নিরাপত্তা প্রশ্নে শান্তির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা বলেছেন, ফিলিস্তিনের মানুষের প্রতি সুবিচারের প্রশ্নে নয়।’
বিপরীতে, স্যান্ডার্সের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিলারি ক্লিনটন অতীত ইতিহাসের গতানুগতিক পথেই হেঁটেছেন। ফিলিস্তিন প্রশ্নে নীরবতা বজায় রেখে বরং ইসরায়েলের ওপর হামাস সন্ত্রাসবাদীদের চাপ নিয়েই তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। হিলারি বলেন, ‘আমি জানি না অবিরাম হুমকির মধ্যে কী করে একটি রাষ্ট্র পরিচালনা সম্ভব, সন্ত্রাসী হামলার মধ্যে নিজেকে নিরাপদ রাখাই প্রধান কাজ হয়ে ওঠে।’
ফিলিস্তিনের প্রতি নীরবতা বজায় রেখে হিলারির প্রচারণা স্পষ্টতই স্যান্ডার্সের এই ফিলিস্তিনের পক্ষে অবস্থানকে একটি বোনাস হিসেবে দেখছে। বিশেষত ১৯ এপ্রিল অনুষ্ঠিতব্য নিউ ইয়র্ক প্রাইমারির ৫ দিন আগে প্রতিপক্ষ স্যান্ডার্সের প্রশ্নাতীত এই প্রচারণার আগে হিলারিই এগিয়ে ছিলেন। ব্রুকলিনে একটি সাবেক নৌঘাঁটিতে অনুষ্ঠিত ওই বিতর্কের আগে হিলারির প্রেস টিম একটি মেমো প্রচার করে যার শিরোনাম ছিল, ‘হিলারি ক্লিনটন ও ইসরায়ে: ৩০ বছরের বন্ধুত্ব, নেতৃত্ব ও শক্তির ইতিহাস’।
আরও খবর: ট্রাম্প আর ক্রুজ ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে কাজ করছেন!
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্যান্ডার্সের এই অবস্থানকে অন্য খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টাও চলছে। ইসরায়েলপন্থী শান্তিকামী দল জে স্ট্রিটের প্রেসিডেন্ট জেরেমি বেন-আমি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির জন্য এই মুহূর্তটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে প্রথমবারের মতো জাতীয় রাজনীতির মঞ্চে সততার সঙ্গে বিতর্ক হচ্ছে; যা যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতি ও ইসরায়েল রাষ্ট্রের ওপরও প্রভাব রাখবে।’
ফিলিস্তিনের প্রতি স্যান্ডার্সের এই ঐতিহাসিক অবস্থানের ফলে প্রথমেই যে প্রশ্ন আসে তা হচ্ছে এ মন্তব্য কিভাবে মঙ্গলবারের প্রাইমারিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নিউ ইয়র্কের রাজনীতিতে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন প্রশ্নে ইহুদিদের ভূমিকা রয়েছে। তেল আবিবের পর নিউ ইয়র্কই সবচেয়ে বড় নগর যেখানে বিপুল পরিমাণ ইহুদি বসবাস করেন। যদিও ১৯৬০ সালের পর থেকে এই সংখ্যা অন্তত ২ মিলিয়ন কমে গিয়েছে। বর্তমানে নিউ ইয়র্কে ইহুদির সংখ্যা ১২ লাখ।
অন্যদিকে, গত কয়েক দশক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ইহুদি সম্প্রদায় মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নে আন্দোলন করে যাচ্ছেন। ইসরায়েলের ক্রমাগত আধিপত্যের ফলে নেতানিয়াহু সরকারের প্রতি মোহমুক্তিও ঘটেছে। এর আগে ২০১৪ সালে জে স্ট্রিট নির্বাচনে ৬৯ শতাংশ ইহুদি গণতান্ত্রিক দলের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন।
নিউ ইয়র্কবাসী ইহুদিদের নতুন প্রজন্মের মধ্যেও মধ্যপ্রাচ্য প্রশ্নে সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ প্রজন্মের অনেকেই মনে করেন এটি একটি দ্বিমুখী সংঘাত। ফিলিস্তিনকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, স্যান্ডার্স সম্ভবত ইহুদিদের এই অংশকে সামনে রেখেই ডেমোক্রেটিক পার্টির মধ্যে বামপন্থী ও ফিলিস্তিনপন্থীদের সমর্থন প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছেন।
নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির প্রফেসর মিশেল মস নগরীর রাজনীতিতে ইহুদিদের ভূমিকা নিয়ে এক প্রবন্ধ লিখেছেন। তাতে তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘নিউ ইয়র্ক প্রাইমারিতে শুধু নিবন্ধিত ডেমোক্রেটরাই অংশ নিতে পারবেন। অনেক ইহুদি নিউ ইয়র্কবাসী তরুণ এখনও নিবন্ধন করেননি। ফলে স্যান্ডার্সের এই মন্তব্য আত্মঘাতী হতে পারে। কেননা বয়স্ক ইহুদিরা হয়তো হিলারির পক্ষেই যাবেন।’
এ ছাড়াও ক্রমবর্ধমান মুসলিম জনগোষ্ঠীকে মাথায় রেখেও স্যান্ডার্স এই মন্তব্য করে থাকতে পারেন বলেও মনে করেন কেউ কেউ। এ প্রসঙ্গে নিউ ইয়র্কের মুসলিম ডেমোক্রেটিক ক্লাবের সহ-প্রতিষ্ঠাতা লিন্ডা সারসোর বলেন, ‘আমার জীবনে দেখা সবচেয়ে সবচেয়ে দীর্ঘ প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আলোচনাটি হয়েছে বৃহস্পতিবারে। ব্রুকলিনের এই বিতর্ক থেকে মনে হচ্ছে এবার হয়তো যুক্তরাষ্ট্র উপলব্ধি করবে যে ফিলিস্তিনিদে আরও সম্মানের সঙ্গে দেখা উচিত।’
এবারের নির্বাচনের প্রার্থিতা বাছাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ডেমোক্র্যাটদের ডেলিগেট সংখ্যা ৪,৭৬৩ জন। এদের মধ্যে প্রাইমারি আর ককাস থেকে নির্বাচিত ডেলিগেটের সংখ্যা হবে ৪২৫১ জন। আর সুপার ডেলিগেটের সংখ্যা ৭১২ জন। মোট ৪৭৬৩ জন সাধারণ ও সুপার ডেলিগেটের মধ্যে অর্ধেকের বেশি সংখ্যক ডেলিগেট যাকে ভোট দেবেন তিনিই প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়বেন ডেমোক্র্যাটদের হয়ে। সে হিসেবে প্রার্থিতা নিশ্চিত করতে একজন ডেমোক্র্যাট মনোনয়ন প্রত্যাশীকে পেতে হবে ২৩৮৩ জন ডেলিগেটের সমর্থন। জুলাইয়ে ফিলাডেলফিয়ায় প্রার্থী বাছাইয়ে অনুষ্ঠিত হবে ডেমোক্র্যাটিক ন্যাশনাল কনভেনশন। সেই সম্মেলনেই ডেলিগেট আর সুপার ডেলিগেটদের ভোটে নির্ধারিত হবেন ডেমোক্র্যাটদের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী।
বার্তা সংস্থা এপির সবশেষ তথ্য অনুযায়ী হিলারি এ পর্যন্ত পেয়েছেন ১৭৫৮ জন ডেলিগেটের সমর্থন। আর স্যান্ডার্স নিশ্চিত করতে পেরেছেন ১০৬৯ জনের সমর্থন। এখনও সমর্থন দেওয়ার বাকি ১৯৩৮ জন ডেলিগেট। প্রার্থিতা নিশ্চিত করতে গেলে হিলারিকে এর মধ্যে পেতে হবে ৬২৫ জনের সমর্থন। আর স্যান্ডার্সকে পেতে হবে আরও ১৩১৪ জনের সমর্থন। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান।
/ইউআর/ এএ/