বিবিসির বিশ্লেষণ

যুক্তরাজ্য-ইসরায়েল মুখোমুখি, সম্পর্ক কয়েক দশকের মধ্যে তলানিতে

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতিতে উৎপাদিত পণ্যের সঙ্গে বাণিজ্য নিষিদ্ধ করার ব্রিটিশ সরকারের সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইসরায়েল। এ ঘটনায় ব্রিটেনের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় পৌঁছেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

মঙ্গলবার যুক্তরাজ্যসহ ১২টি দেশ ইসরায়েলি বসতি নিয়ে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার পর ইসরায়েলের ক্ষোভ আরও তীব্র হয়। ওই দেশগুলোর মধ্যে ফ্রান্স, স্পেন ও কানাডাও রয়েছে। লন্ডন আগে থেকেই জানত, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন নীতিতে এমন বড় পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়া কঠোর হতে পারে। তবে ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়ার গতি ও তীব্রতা ব্রিটিশ কর্মকর্তাদেরও বিস্মিত করেছে।

ব্রিটিশ সিদ্ধান্তের পর পূর্ব জেরুজালেমে অবস্থিত যুক্তরাজ্যের কনস্যুলেট বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইসরায়েল। ওই কনস্যুলেট পশ্চিম তীরের কার্যক্রম এবং রামাল্লায় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পাশাপাশি গাজায় স্থিতিশীলতা ও ত্রাণ কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য গঠিত ইন্টারন্যাশনাল গাজা সাপোর্ট সেন্টার থেকেও ব্রিটিশ প্রতিনিধিদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ব্রিটিশ সরকারের নতুন পদক্ষেপের আওতায় শুধু বসতিতে উৎপাদিত পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞাই নয়, বসতিগুলোর নির্মাণ, অবকাঠামো উন্নয়ন কিংবা অর্থায়নে যুক্ত কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া এমন অস্ত্র বিক্রিতেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে, যেগুলো ইসরায়েলের দখলদারিত্বে সরাসরি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে।

ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড বলেছেন, ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের দেওয়া রায়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্রিটেন তার অর্থনৈতিক সম্পর্ক পুনর্বিন্যাস করছে। ওই রায়ে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের দখলদারিত্বকে বেআইনি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।

মিলিব্যান্ডের বক্তব্যের ভাষাও বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। নিজেকে ‘গর্বিত ব্রিটিশ ইহুদি’ এবং ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতি অবিচল সমর্থক হিসেবে উল্লেখ করেও তিনি পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার তীব্র সমালোচনা করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু এলাকায় বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে এবং এর ফলে ফিলিস্তিনিদের ‘জাতিগত নিধন’ ঘটছে, আর ইসরায়েলি সরকার বিষয়টি উপেক্ষা করছে।

মিলিব্যান্ড ব্রিটিশ নীতির এই পরিবর্তনকে ‘রিসেট’ বা নতুনভাবে সাজানোর উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষকদের কাছে এটি কেবল নীতির সামান্য পরিবর্তন নয়, বরং ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে ব্রিটেনের অবস্থানের বড় ধরনের পুনর্বিবেচনা বলেই মনে হচ্ছে।

ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সারের তীব্র প্রতিক্রিয়ার পেছনে দেশটির আসন্ন নির্বাচন ঘিরে উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিবেশের প্রভাব থাকতে পারে। তবে অধিকাংশ ইসরায়েলি নাগরিকও ব্রিটিশ পদক্ষেপে ক্ষুব্ধ হয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে।

ইসরায়েলের অনেক নাগরিক পশ্চিম তীরে কিছু বসতি স্থাপনকারীর সহিংস ও উগ্র কর্মকাণ্ডকে সমস্যাজনক মনে করেন। কেউ কেউ তাদের দেশের জন্য বিব্রতকর বলেও মনে করেন। তবে এর অর্থ এই নয় যে তারা ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধে দখল করা ভূমিতে গড়ে ওঠা ইসরায়েলি বসতিগুলোকে অবৈধ বলে মনে করেন।

এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের ওপর চাপ বাড়ছে। ইউরোভিশন ও বিভিন্ন ক্রীড়া ইভেন্টে ইসরায়েলবিরোধী প্রতিবাদ, দেশটির নেতাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং এখন বসতিতে উৎপাদিত পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা—সব মিলিয়ে অনেক ইসরায়েলির মধ্যে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ফিলিস্তিনিদের কাছে অবশ্য ব্রিটিশ সিদ্ধান্তকে অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফিলিস্তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিষেধাজ্ঞা আরোপকারী দেশগুলোর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে ইসরায়েলের ‘অবৈধ বসতি স্থাপন কার্যক্রম’ বন্ধে আরও জরুরি ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

লন্ডনে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রদূত হুসাম জোমলট ব্রিটিশ সরকারের সিদ্ধান্তকে যুক্তরাজ্য-ফিলিস্তিন সম্পর্কের ‘একটি মোড় পরিবর্তনের ঘটনা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, ব্রিটেনের এই পদক্ষেপ ১৯৬৭ সালের সীমান্তের ভিত্তিতে পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথকে এগিয়ে নিতে পারে।

তবে বাস্তব পরিস্থিতি এখনও জটিল। ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের দখলদারিত্ব শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। একটি কার্যকর ও স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাও খুবই ক্ষীণ। ১২টি দেশের সম্মিলিত পদক্ষেপ পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের বসতি সম্প্রসারণের ধারাও এখনই থামিয়ে দেবে—এমন নিশ্চয়তাও নেই।

ইসরায়েলের ওপর এমন চাপ প্রয়োগের মতো বড় প্রভাব একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রেরই রয়েছে বলে মনে করা হয়। ১৯৯১ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেমস বেকার ইসরায়েলের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী আইজ্যাক শামিরকে অধিকৃত এলাকায় বসতি স্থাপনে অর্থায়ন না করার নিশ্চয়তা দিতে চাপ দিয়েছিলেন। এমনকি তা না করলে ১০ বিলিয়ন ডলারের ঋণ নিশ্চয়তা আটকে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন পর্যন্ত বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর বসতি সম্প্রসারণ পরিকল্পনা নিয়ন্ত্রণে আনার কোনো আগ্রহ দেখাননি। ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ বা ‘মাগা’ আন্দোলনের কিছু অংশ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েলের সমালোচনা করলেও ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি একজন কট্টর খ্রিস্টান জায়নবাদী হিসেবে পরিচিত। তিনি পশ্চিম তীরকে ইহুদিদের জন্য ঈশ্বরের প্রতিশ্রুত ভূমি হিসেবে দেখার ইসরায়েলি অবস্থানের সঙ্গে একমত।

ফলে ইসরায়েলি বসতি নিয়ে ব্রিটেন ও তার মিত্রদের মঙ্গলবারের পদক্ষেপ শুধু ইসরায়েলের বিরুদ্ধেই নয়, বরং ওয়াশিংটনে ইসরায়েলের প্রধান সমর্থক যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের সঙ্গেও তাদের মতপার্থক্যকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।