বিশ্ব রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলাচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা শক্তিগুলোর অর্থনৈতিক, সামরিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্বের ওপর গড়ে উঠেছিল, একবিংশ শতাব্দীতে এসে সেই ব্যবস্থার একচ্ছত্রতা ক্রমেই প্রশ্নের মুখে পড়ছে। চীন, ভারত, রাশিয়া, ব্রাজিলসহ এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার একাধিক রাষ্ট্র অর্থনৈতিক ও কৌশলগতভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠছে। এই পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রকাশ হলো ব্রিকস।
ব্রিকসের জন্ম অবশ্য কোনও রাজনৈতিক বিপ্লব থেকে হয়নি। ২০০১ সালে গোল্ডম্যান স্যাকসের অর্থনীতিবিদ জিম ও’নিল ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনের দ্রুত অর্থনৈতিক উত্থান বিশ্লেষণ করতে প্রথম ‘ব্রিক’ শব্দটি ব্যবহার করেন। তখন এটি ছিল নিছক একটি অর্থনৈতিক ধারণা। কিন্তু ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর মধ্যে সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়ে দেয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানে তাদের অর্থনৈতিক ওজনের তুলনায় প্রতিনিধিত্ব কম থাকার প্রশ্নও সামনে আসে। ফলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সংস্কার ও বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার দাবি জোরালো হতে থাকে।
২০০৯ সালে রাশিয়ার ইয়েকাতেরিনবার্গে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনের নেতাদের প্রথম সম্মেলনের মাধ্যমে ‘ব্রিক’ আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক রূপ পায়। ২০১১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা যুক্ত হলে ‘ব্রিকস’-এর জন্ম হয়। এর ফলে সংগঠনটি এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকাকে একই কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসে। পরবর্তী কয়েকটি সম্মেলনে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার সংস্কার, সন্ত্রাসবাদ, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বহুপাক্ষিকতার প্রশ্ন গুরুত্ব পায়।
ব্রিকসের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাঁক আসে ২০১৪ সালে। ব্রাজিলের ফোর্তালেজা সম্মেলনে সদস্য রাষ্ট্রগুলো নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এনডিবি) প্রতিষ্ঠা এবং জরুরি আর্থিক সহায়তার জন্য একটি রিজার্ভ ব্যবস্থা গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। এর মাধ্যমে ব্রিকস পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের দাবি জানানো থেকে বেরিয়ে নিজস্ব বিকল্প প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা তৈরির পথে এগিয়ে যায়। ২০১৭ সালে চীনের শিয়ামেন সম্মেলনে বৃহত্তর উন্নয়নশীল বিশ্বকে সঙ্গে নেওয়ার ধারণা আরও শক্তিশালী হয়। এরপর ব্রিকসের সম্প্রসারণের প্রশ্ন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
২০২৩ সালের জোহানেসবার্গ সম্মেলন ছিল সেই ধারাবাহিকতার সবচেয়ে বড় ঘটনা। সেখানে মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও আর্জেন্টিনাকে নতুন সদস্য হওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়। পরে অবশ্য আর্জেন্টিনা সদস্যপদ গ্রহণ করেনি। মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত যুক্ত হয় এবং ইন্দোনেশিয়াও পরবর্তীতে পূর্ণ সদস্য হয়। সৌদি আরবের অবস্থান নিয়ে কিছু প্রাতিষ্ঠানিক অস্পষ্টতা রয়েছে। ফলে বর্তমান ব্রিকস আর পাঁচ দেশের পুরোনো সংগঠন নেই। এটি এখন বৃহত্তর দক্ষিণের রাষ্ট্রগুলোর একটি বিস্তৃত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমন্বয় প্ল্যাটফর্ম।
২০১৪ সালের কাজান সম্মেলনে সম্প্রসারিত ব্রিকস কাঠামোকে কার্যকর করার পাশাপাশি স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য, আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থার সংস্কার এবং সদস্যদের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়। ২০১৫ সালের রিও ডি জেনেইরো সম্মেলনে গ্লোবাল সাউথের সহযোগিতা, জলবায়ু পরিবর্তন, স্বাস্থ্য, উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থার সংস্কার গুরুত্ব পায়। অর্থাৎ ব্রিকসের বিবর্তনকে মোটামুটি তিনটি পর্যায়ে দেখা যায়। প্রথমে এটি ছিল উদীয়মান অর্থনীতির ধারণা, পরে পাঁচ দেশের রাজনৈতিক সমন্বয়, আর বর্তমানে এটি বৃহত্তর গ্লোবাল সাউথের একটি প্রভাবশালী মঞ্চে পরিণত হওয়ার চেষ্টা করছে।
এই ধারাবাহিকতার পর চলতি বছরের নয়াদিল্লি সম্মেলনের ছিল বিশেষ তাৎপর্য। প্রথম সম্মেলনের দুই দশক পূর্ণ হওয়ার বছরে ভারত ব্রিকসের সভাপতিত্ব করেছে। নয়াদিল্লির সামনে প্রধান প্রশ্ন ছিল, সম্প্রসারণের পর ব্রিকসকে কীভাবে আরও কার্যকর করা যায়। অর্থনৈতিক সহযোগিতা, স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন, ডিজিটাল অর্থনীতি, বিনিয়োগ, সরবরাহব্যবস্থা, প্রযুক্তি ও টেকসই উন্নয়ন ছিল গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার অংশ। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় ডলারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।
তবে ব্রিকসের একটি একক মুদ্রা খুব দ্রুত ডলারের বিকল্প হয়ে যাবে, এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। অভিন্ন মুদ্রার জন্য যে ধরনের আর্থিক প্রতিষ্ঠান, সমন্বিত মুদ্রানীতি, রাজনৈতিক আস্থা ও অর্থনৈতিক সংহতি প্রয়োজন, ব্রিকস সদস্যদের মধ্যে তা নেই। বরং স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য, বিকল্প লেনদেন ব্যবস্থা এবং উন্নয়ন ব্যাংকের সক্ষমতা বাড়ানোই বেশি বাস্তবসম্মত পথ।
ব্রিকসের শক্তি তার ব্যাপক অর্থনৈতিক ও জনমিতিক ভিত্তিতে। এর সদস্যদের মধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল রাষ্ট্র রয়েছে, রয়েছে বৃহৎ শিল্পশক্তি, বিপুল জ্বালানি সম্পদ, কৃষি উৎপাদন, খনিজ সম্পদ ও বিশাল বাজার। চীন বৈশ্বিক উৎপাদনের অন্যতম কেন্দ্র, ভারত দ্রুতবর্ধনশীল অর্থনীতি, রাশিয়া জ্বালানি ও কাঁচামালের গুরুত্বপূর্ণ উৎস, ব্রাজিল কৃষি ও প্রাকৃতিক সম্পদে শক্তিশালী এবং মধ্যপ্রাচ্যের সদস্যরা জ্বালানি ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে সম্মিলিতভাবে ব্রিকসের বস্তুগত শক্তি অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
কিন্তু শক্তির পাশাপাশি সীমাবদ্ধতাও গভীর। চীন ও ভারতের মধ্যে সীমান্ত বিরোধ ও কৌশলগত প্রতিযোগিতা রয়েছে। ভারত আবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখে। রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধ নিয়ে সদস্যদের অবস্থান এক নয়। ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্য সদস্যদের মধ্যেও আঞ্চলিক স্বার্থের পার্থক্য রয়েছে। সদস্যদের রাজনৈতিক ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক কাঠামো ও বৈদেশিক নীতিও একরকম নয়। ফলে ব্রিকসকে কোনও ঐক্যবদ্ধ পশ্চিমবিরোধী জোট হিসেবে দেখা ভুল।
বরং ব্রিকসের সবচেয়ে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ হলো একটি নমনীয় বহুমেরু সহযোগিতা কাঠামো হিসেবে টিকে থাকা। যেখানে সদস্যরা সব বিষয়ে একমত হবে না, কিন্তু বাণিজ্য, উন্নয়ন, অর্থনীতি, প্রযুক্তি, জ্বালানি ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান সংস্কারের মতো অভিন্ন স্বার্থের ক্ষেত্রে একসঙ্গে কাজ করবে। এই নমনীয়তাই তার দুর্বলতা এবং শক্তিও।
শেষ পর্যন্ত ব্রিকস পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থাকে রাতারাতি প্রতিস্থাপন করবে না। কিন্তু এটি আন্তর্জাতিক ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। ২০০১ সালে একটি অর্থনৈতিক পূর্বাভাস হিসেবে যার জন্ম, দুই দশকের মধ্যে সেটি বিশ্বের বৃহৎ জনসংখ্যা, অর্থনীতি, জ্বালানি ও সম্পদের প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক মঞ্চে পরিণত হয়েছে। তাই ব্রিকসকে নতুন বিশ্বব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ বিকল্প বলা যেমন অতিরঞ্জন, তেমনি একে নিছক কাগুজে সংগঠন ভাবাও ভুল। এর প্রকৃত গুরুত্ব হলো, বিশ্ব অর্থনীতির বাস্তবতা যখন বদলে যাচ্ছে, তখন সেই পরিবর্তনের সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্ষমতার কাঠামোকেও বদলানোর দাবি এটি ক্রমেই জোরালো করে তুলছে।
বিশ্ব রাজনীতিতে স্থায়ী বন্ধু বলে কিছু নেই, আছে স্থায়ী স্বার্থ। ব্রিকসের ভবিষ্যতও সেই বাস্তবতার ওপরই নির্ভর করবে।
লেখক: শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়